বাতিঘর আদর্শ পাঠাগারে পাঠকদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে মো. কামরুজ্জামান (বাঁ থেকে পাঁচ নম্বর)। সম্প্রতি টাঙ্গাইল সদর উপজেলার মগড়া ইউনিয়নের চৌরাকররা গ্রামে। ছবি: খবরের কাগজ
প্রত্যন্ত গ্রামে সহজে বই পাওয়ার সুযোগ কম। বই পড়তে হলে শিক্ষার্থীদের যেতে হতো প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের জেলা সরকারি গ্রন্থাগারে। অন্যদিকে তরুণদের মধ্যে বেড়েছে মোবাইল আসক্তি। এই বাস্তবতায় তাদের বইমুখী করতে এবং পড়ার সুযোগ তৈরি করতে নিজের ঘরেই পাঠাগার গড়েছেন মো. কামরুজ্জামান। ২০১০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মাত্র ১০০টি বই নিয়ে শুরু করেছিলেন যাত্রা। সেই পাঠাগারে এখন বইয়ের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। পাশাপাশি বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন ও সেলুনে চালু করেছেন অণুপাঠাগার। তার উদ্যোগে টাঙ্গাইলের প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে বই পড়ার অভ্যাস।
কামরুজ্জামানের বাড়ি টাঙ্গাইল সদর উপজেলার মগড়া ইউনিয়নের চৌরাকররা গ্রামে। মাধ্যমিক পাসের পর টাঙ্গাইল শহরে চলে যান তিনি। সেখান থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে ভর্তি হন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। অপরাধতত্ত্ব ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার সময় গড়ে তোলেন পাঠাগার। নাম দেন বাতিঘর আদর্শ পাঠাগার। পড়াশোনা শেষে বাংলাদেশ পুলিশে উপপরিদর্শক (এসআই) পদে যোগ দেন। বর্তমানে কর্মরত আছেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই)।
পাঠাগারটিতে এখন নিয়মিত সদস্য ২১৯ জন। এ ছাড়া অণুপাঠাগারগুলোর কয়েক হাজার পাঠক রয়েছেন। ধর্ম-বর্ণ ও বয়সের ভেদাভেদ ছাড়াই সবাই এখানে বই পড়তে পারেন। চাইলে সদস্য হয়ে বাড়িতেও বই নিয়ে যেতে পারেন।
আরও পড়ুন
পাঠাগারের কার্যক্রম পরিচালনা করেন গ্রামের কয়েকজন কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী। তাদের একজন সীমা আক্তার। তিনি লায়ন নজরুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজের স্নাতকের পরীক্ষার্থী। সীমা জানান, বৃহস্পতিবার ছাড়া প্রতিদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাঠাগার খোলা থাকে। একটি বই ১৫ দিনের জন্য দেওয়া হয়। কারও আসতে অসুবিধা হলে ফোন করলে বই পৌঁছে দেওয়া হয়।
মগড়া উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘পাঠাগার হওয়ায় আমাদের বই পড়তে সুবিধা হয়েছে।’ গ্রামের মধ্যবয়সী ব্যবসায়ী ছানোয়ার হোসেন জানান, অবসর সময়ে তার বই পড়ার অভ্যাস। তাই এই পাঠাগারের সদস্য হয়েছেন। এখান থেকে নিয়মিত বই নেন তিনি।
কামরুজ্জামানের বাবা মো. শাহজাহান জানান, প্রথমে ছেলের উদ্যোগকে পাগলামি মনে হয়েছিল। পরে বুঝেছেন, এটি ভালো উদ্যোগ। তাই বাড়ির একটি ঘর পাঠাগারের জন্য ব্যবহার করতে দিয়েছেন।
কামরুজ্জামান জানান, বই কিনে পড়ার সামর্থ্য নেই, এমন মানুষের জন্য সহজে বই পড়ার সুযোগ তৈরি করাই তার উদ্দেশ্য। পাঠাগারটি টিকিয়ে রাখতে গ্রামের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে সাত সদস্যের কমিটি করেছেন। এখন স্থায়ী জায়গা নিয়ে নিজস্ব ভবন করার চেষ্টা করছেন। তার স্বপ্ন, দেশ-বিদেশের বইয়ে সমৃদ্ধ হবে পাঠাগারটি।
বাতিঘর আদর্শ পাঠাগারের উদ্যোগে বই পড়ার সুযোগ বাড়াতে টাঙ্গাইল নতুন বাসস্ট্যান্ডের কয়েকটি বাস কাউন্টারে অণুপাঠাগার স্থাপন করা হয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দেয়ালে ছোট বুকসেলফে বিভিন্ন বই রাখা আছে। সেখানে অপেক্ষমাণ যাত্রীরা বই পড়ে আবার রেখে যাচ্ছেন।
এ ছাড়া টাঙ্গাইল সদর উপজেলার কুইজবাড়ী, আয়নাপুর, চৌরাকররা, নন্দবালা, মগড়া বাজার ও কালিহাতী উপজেলার পালিমা বাজারে ১০টি সেলুনে অণুপাঠাগার চালু করেছেন কামরুজ্জামান। টাঙ্গাইল রেলস্টেশনেও রয়েছে বই পড়ার ব্যবস্থা। প্ল্যাটফর্মে কাঠের সেলফে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বই। অপেক্ষার সময় বই পড়তে পেরে খুশি যাত্রীরা।
পাঠাগারের উদ্যোগে প্রতিবছর বৃক্ষরোপণ, শীতবস্ত্র বিতরণ, রক্তদান ও বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি চলে। সম্প্রতি ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের দুই পাশে প্রায় সাত শতাধিক তালবীজও বপন করেন পাঠাগারের সদস্যরা। পাঠক মেলা, বই বিনিময় উৎসব, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে শীতকালীন শাকসবজির বীজ ও চারা বিতরণ করা হয়েছে।
গ্রামে পাঠাগার প্রতিষ্ঠায় অবদানের জন্য কামরুজ্জামান পেয়েছেন প্রথম আলো বন্ধুসভা সম্মাননা-২০২১, পাঠশালা ইমার্জিং লিডার অ্যাওয়ার্ড-২০২২, ইস্টিশন পাঠাগার সম্মাননা-২০২৩ এবং বাংলাদেশ বুকওয়ার্মস অ্যাসোসিয়েশন বিশেষ সম্মাননা-২০২৪। এ ছাড়া পাঠাগারের সদস্য ফাওজিয়াহ হক জিনাত জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের জাতীয়ভিত্তিক গ্রন্থপাঠ প্রতিযোগিতায় স্কুল পর্যায়ে দেশসেরা নির্বাচিত হয়েছেন।
কামরুজ্জামান বলেন, প্রযুক্তির আসক্তি কাটিয়ে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মধ্যে পাঠাভ্যাস তৈরি তথা সামাজিক-মানবিক কাজে তাদেরকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে প্রতিনিয়ত আমাদের ছুটে চলা। আমাদের এ কার্যক্রম পুরো জেলায় ছড়িয়ে দিতে চাই। একদিন এমন কার্যক্রম সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে সেটাই প্রত্যাশা।
