বাংলাদেশে টুজি মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বন্ধ হতে পারে টুজি সেবা। এর আগে ২০২৭ সালের জুনের পর টুজি ফোন বিক্রি বন্ধের পরিকল্পনাও রয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ছয় কোটি টুজি ফোন ব্যবহারকারীকে বিকল্প প্রযুক্তির ফোনের দিকে যেতে হবে। এতে বাড়তি খরচের চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি বিপাকে পড়তে পারেন নিম্নআয়ের মানুষ ও দেশীয় হ্যান্ডসেট উৎপাদকরা।
বিটিআরসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের পর নতুন কোনো টুজি ফোনের মডেলের অনুমোদন দেওয়া হবে না। ২০২৭ সালের ৩১ মার্চের পর দেশে টুজি ফোন উৎপাদন বন্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই বছরের জুনের পর বন্ধ করা হবে এসব ফোনের বিক্রি। এরপর ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে গ্রাহক পর্যায়ে টুজি সেবা বন্ধের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
মূলত, টুজি নেটওয়ার্কের পরিবর্তে ফোরজি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে মোবাইল যোগাযোগব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তরঙ্গের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাই এই পরিকল্পনার প্রধান উদ্দেশ্য। টুজি নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত তরঙ্গ ফোরজি সেবায় কাজে লাগানো গেলে মোবাইল অপারেটররা আরও দক্ষতার সঙ্গে ডেটা সেবা দিতে পারবে। একই সঙ্গে পুরোনো নেটওয়ার্ক পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচও কমতে পারে।
মোবাইল অপারেটরগুলোর পক্ষ থেকেও টুজি থেকে ফোরজিতে স্থানান্তরের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান দেখা যাচ্ছে। বাংলালিংক ও রবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন, পুরোনো নেটওয়ার্কের পরিবর্তে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে তরঙ্গের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এতে ডেটা সেবার মান ও সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
এ বিষয়ে বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তৈমুর রহমান বলেন, টুজি থেকে ফোরজিতে স্থানান্তর করা গেলে তরঙ্গ ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব হবে। যত দ্রুত টুজি নেটওয়ার্ক বন্ধ করা যাবে, ততই ভালো। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নেটওয়ার্ক অবকাঠামো মূলত ডেটা সেবাকে গুরুত্ব দিয়ে সাজানো হয়েছে, ফলে ভয়েস সেবার জন্য পুরোনো নেটওয়ার্ক ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তা কমছে।
তবে প্রযুক্তির উন্নয়নের এই পরিকল্পনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সাধারণ গ্রাহকদের সামর্থ্য নিয়ে। দেশে ফাইভজি প্রযুক্তির দিকে অগ্রযাত্রা চললেও এখনো ছয় কোটির বেশি গ্রাহক টুজি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের বড় একটি অংশের কাছে বাটন ফোন শুধু পছন্দের বিষয় নয়, বরং দৈনন্দিন যোগাযোগের সবচেয়ে সহজ ও সাশ্রয়ী মাধ্যম।
কম দাম, সহজ ব্যবহার এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারির কারণে বাটন ফোন এখনো বয়স্ক, স্বল্পশিক্ষিত ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে জনপ্রিয়। এসব ফোনে সাধারণত কথা বলা ও খুদে বার্তা পাঠানোর মতো প্রয়োজনীয় সুবিধা থাকে। জটিল প্রযুক্তিগত ফিচারের প্রয়োজন না হওয়ায় অনেকেই স্মার্টফোনের পরিবর্তে বাটন ফোন ব্যবহার করেন। এমনকি স্মার্টফোন থাকা সত্ত্বেও অনেকে সহজে কথা বলা ও দীর্ঘ সময় ব্যাটারি ব্যবহারের সুবিধার জন্য আলাদা বাটন ফোন রাখেন।
টুজি সেবা বন্ধ হয়ে গেলে এসব গ্রাহককে ফোরজি সমর্থিত ফোন কিনতে হবে। কিন্তু স্মার্টফোন ব্যবহারে অনভ্যস্ত অনেক মানুষের জন্য নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াও কঠিন হতে পারে। তার ওপর নতুন ফোন কেনার খরচ তাঁদের জন্য বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করবে। ফলে নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের যোগাযোগের অধিকার ও আর্থিক সক্ষমতা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বিকল্প হিসেবে পাঁচ হাজার টাকা দামের স্মার্টফোন বাজারে আনার উদ্যোগের কথাও জানা গেছে। শিগগিরই এ ধরনের ফোন বাজারে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে যাঁরা বর্তমানে এক হাজার টাকারও কম দামে বাটন ফোন ব্যবহার করছেন, তাঁদের জন্য পাঁচ হাজার টাকা খরচ করাও বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের ক্ষেত্রে এই ব্যয় সহজে বহন করা সম্ভব নাও হতে পারে।
শুধু গ্রাহক নয়, টুজি নেটওয়ার্ক বন্ধের পরিকল্পনায় দেশীয় মোবাইল ফোন উৎপাদনশিল্পও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। বর্তমানে দেশের বাজারে প্রায় ৯৫০ টাকায় ফিচার ফোন পাওয়া যায়। অন্যদিকে, সস্তা স্মার্টফোনের দামও প্রায় সাড়ে ৯ হাজার টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে দুই ধরনের ফোনের দামের ব্যবধান সাধারণ ক্রেতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে উৎপাদিত মোট হ্যান্ডসেটের প্রায় ৬৫ শতাংশ ছিল টুজি ফোন। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত হিসাবেও এ হার আগের বছরের তুলনায় এক শতাংশ বেশি ছিল। অর্থাৎ, আধুনিক প্রযুক্তির প্রসারের মধ্যেও দেশে টুজি ফোনের চাহিদা এখনো উল্লেখযোগ্য। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টুজি ফোনের উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধ হয়ে গেলে দেশীয় উৎপাদকদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, উৎপাদনব্যবস্থা এবং বাজার ধরে রাখার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে টুজি থেকে ফোরজিতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিম্নআয়ের মানুষের স্বার্থ বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি জাকারিয়া শহীদ। তাঁর মতে, প্রযুক্তির উন্নয়ন ও নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নের পাশাপাশি দরিদ্র গ্রাহকদের আর্থিক সক্ষমতা এবং প্রয়োজনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
সব মিলিয়ে, টুজি নেটওয়ার্ক বন্ধের পরিকল্পনা দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে আধুনিকায়নের নতুন পথ খুলে দিতে পারে। তবে ছয় কোটির বেশি গ্রাহকের বিকল্প ফোন কেনার সামর্থ্য, সহজে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ এবং দেশীয় উৎপাদনশিল্পের ভবিষ্যৎ—এই বিষয়গুলোর সমাধান নিশ্চিত করা না গেলে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে।
