আলবেনিয়ায় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ টানা তৃতীয় দিনে সহিংস রূপ নিয়েছে। রাজধানী তিরানায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে আহত হয়েছেন অন্তত ৮৯ জন। তাদের মধ্যে ৬১ জন পুলিশ সদস্য। এমন পরিস্থিতিতেও পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন প্রধানমন্ত্রী এদি রাম। তিনি বলেছেন, সরকার পরিবর্তন করতে হলে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়েই তা করতে হবে, বিপ্লবের মাধ্যমে নয়।
বিজ্ঞাপন
গতকাল বৃহস্পতিবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া বক্তব্যে রাম বলেন, ‘সরকার পরিবর্তন হয় গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে। গত বছর আমাদের নির্বাচন হয়েছে, বিপ্লব হয়নি।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাইরে নতুন করে সংঘর্ষ শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি এ কথা বলেন। সেখানে ইটপাটকেল নিক্ষেপকারী তরুণদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে দাঙ্গা পুলিশ। রাম বলেন, ‘আমার দায়িত্ব হলো মানুষের কথা শোনা, যৌক্তিক উদ্বেগের সমাধান করা এবং আলবেনিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।’
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্যপদ অর্জনের লক্ষ্য থেকে সরে আসবেন না বলেও জানান তিনি। রামের ভাষ্য, বিক্ষোভের সহিংসতা আলবেনিয়ার ইউরোপীয় ভবিষ্যৎ বাধাগ্রস্ত করতে দেওয়া হবে না। তাঁর মতে, তা হলে ইইউতে যোগদানের আলোচনা শেষ করার জন্য তাঁকে শক্তিশালী জনসমর্থন দেওয়া আলবেনীয় জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে।
গত বছর ঐতিহাসিকভাবে চতুর্থ মেয়াদে নির্বাচিত রাম একসময় ইউরোপের সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন স্তালিনবাদী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত আলবেনিয়াকে ২০৩০ সালের মধ্যে ইইউর ২৭ সদস্যের জোটে অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক সহিংসতা তাঁর দীর্ঘ শাসনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগে উত্তেজনা
বুধবার রাতভর বিক্ষোভকারী ও দাঙ্গা পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের পর বৃহস্পতিবার সকালে তিরানার বিভিন্ন এলাকায় দোকানের সামনের অংশ ভাঙচুর এবং ট্রাফিক সংকেত ধ্বংসের চিত্র দেখা যায়। সরকারি ভবন ও ব্যাংকে অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে। সংঘর্ষে আহত ৮৯ জনের মধ্যে ৬১ জনই পুলিশ সদস্য।
আলবেনিয়ার সমাজতান্ত্রিক সরকার টানা ১৩ বছর ক্ষমতায় রয়েছে। নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় জনসাধারণের ধৈর্য ফুরিয়ে আসছে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তিরানার আলবেনিয়ান ইনস্টিটিউট ফর পলিটিক্যাল স্টাডিজের পরিচালক আফ্রিম ক্রাসনিকি বলেন, ‘তরুণ আলবেনীয়রা দুর্নীতিতে ক্লান্ত, সরকারের ঔদ্ধত্যেও ক্লান্ত। তাঁরা আরও ভালো একটি দেশে বাস করতে চান এবং এ জন্য সহিংসতার পথ বেছে নিতেও ভয় পাচ্ছেন না।’
পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা অনুমান করা কঠিন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে বিক্ষোভকারীদের সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন রাম। বৃহস্পতিবার তিরানার ক্ষতিগ্রস্ত কলেজ অব ইউরোপ ভবন পরিদর্শনে গিয়ে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরাই ভবিষ্যৎ। তাঁরাই সামনে তাকান, আরও দূরে যেতে চান, দ্রুত এগোতে চান।’
অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘আজ এখানে এমন কিছু মানুষের হাতের কাজের ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে, যাঁরা শিক্ষার্থী নন, কখনো শিক্ষার্থীদের হাতও হতে পারেন না। আলবেনিয়া যখনই এগিয়ে যেতে চায়, তখনই এই হাতগুলো দেশটিকে পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।’
শিক্ষার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে তরুণদের সঙ্গে আলোচনা করতে রাজি আছেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। শিক্ষাব্যবস্থার খরচ বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ। তবে ভাঙচুর কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না বলে সতর্ক করেন তিনি।
রিসোর্ট প্রকল্প ঘিরে পাঁচ মাসের আন্দোলন
আলবেনিয়ার দক্ষিণ উপকূলে বিতর্কিত পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে প্রায় পাঁচ মাস ধরে প্রতিদিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করছেন আন্দোলনকারীরা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পে অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত উপকূলের পাশাপাশি জনবসতিহীন সাজান দ্বীপেও নির্মাণকাজের পরিকল্পনা রয়েছে। বন্য প্রাণী ও নাজুক বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতির আশঙ্কা থেকে আন্দোলনটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফ্লেমিঙ্গো বিপ্লব’। প্রকল্পের বিরোধিতার পাশাপাশি বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগও দাবি করে আসছেন।
বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রকল্প থেকে সরে আসেননি রাম। তাঁর দাবি, এটি আলবেনিয়ার জন্য একটি ‘উপহার’। এর মাধ্যমে অর্থনীতি চাঙা হবে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং দেশটি বিলাসবহুল পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ক্রাসনিকির মতে, আন্দোলন এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পৌঁছেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও আলবেনিয়ার তরুণদের বিক্ষোভে প্রভাব ফেলেছে।
ক্রাসনিকি বলেন, ‘আমার মনে হয়, এই সপ্তাহে আমরা একটি মোড়ের মুখে পৌঁছেছি। সরকার মানুষের সঙ্গে কথা বলার জন্য চার মাসের বেশি সময় পেয়েছে। মানুষ প্রতিদিন রাস্তায় নেমেছে। কিন্তু সরকার তাদের গুরুত্ব না দিয়ে বরং তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে। এখন শিক্ষার্থীরা যোগ দিয়েছে এবং মনে হচ্ছে, তারাই পরিস্থিতিতে এগিয়ে রয়েছে।’
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রথম তরুণদের বলতে শোনা যাচ্ছে, গণতন্ত্র রক্ষার জন্য প্রয়োজন হলে তাঁরা আহত হতে কিংবা কারাবরণ করতেও প্রস্তুত।
ক্রাসনিকি বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবি ‘ফ্লেমিঙ্গো বিপ্লব’-এর আন্দোলনকারীদের দাবির চেয়ে আলাদা। তাঁরা উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো ভবন এবং তরুণদের আশাবাদী করে এমন সমাজ চান। একই সঙ্গে আলবেনিয়াকে বিক্রির জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার বিরোধিতা করছেন তাঁরা।
৪০০ কোটি ইউরোর বিনিয়োগ
ট্রাম্প পরিবারের সমর্থিত প্রস্তাবিত রিসোর্ট প্রকল্পটির বিনিয়োগমূল্য ৪০০ কোটি ইউরো। এটি বাস্তবায়িত হলে আলবেনিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হবে।
গত সপ্তাহে প্রকল্পটি নিয়ে বিতর্কের মধ্যে কুশনার বলেন, তাঁর বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান অ্যাফিনিটি পার্টনার্স এমন একটি দেশে বিনিয়োগের ঝুঁকি নিচ্ছে, যেখানে আগে এ মাত্রার কোনো প্রকল্প হয়নি।
তিনি বলেন, ‘কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমরা এই ঝুঁকি নিচ্ছি, কারণ আমরা আলবেনিয়া ও আলবেনীয়দের ওপর বিশ্বাস রাখি। সফল হলে প্রকল্পটি প্রায় ৪০০ কোটি ইউরোর বিনিয়োগ, উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতি তৈরি করবে।’
তবে পরিবেশবাদীরা প্রকল্পটির সুফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। উন্নয়নবিরোধী আন্দোলনের শুরুতে নেতৃত্ব দেওয়া দেশটির অন্যতম প্রধান পরিবেশ সংরক্ষণ সংগঠন প্রোটেকশন অ্যান্ড প্রিজারভেশন অব ন্যাচারাল এনভায়রনমেন্ট ইন আলবেনিয়ার প্রধান আলেক্সান্দার ত্রাচে বলেন, কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটি নিয়ে মানুষের ক্ষোভ কমেনি। অনেকের ধারণা, এর সুবিধা মূলত অভিজাত শ্রেণিই পাবে।
ত্রাচের মতে, কুশনারের প্রকল্প নিয়ে জমে থাকা ক্ষোভই বর্তমান সহিংসতার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। দিনের পর দিন বিক্ষোভকারীরা এমন একটি সরকারের ঔদ্ধত্যের মুখোমুখি হয়েছেন, যারা তাঁদের কথা শুনতে বা সামান্য ছাড় দিতেও রাজি হয়নি।
এএম
