এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭ বিমানের সিনিয়র কম্যান্ডার অর্চনা কাপুরছবি: লিঙ্কডইন এবং X
Published on
:
3 min read
‘না’ শুনতে শুনতেই কেটে গিয়েছে আস্ত কিশোরীবেলা। তার পরেও স্বপ্ন দেখার অভ্যাসটা ছাড়েননি। বাবার মুখে শুনেছিলেন, চশমা পরলে পাইলট হওয়া যায় না। আর মহিলা হয়ে বায়ুসেনায় তো নৈব নৈব চ। চ্যালেঞ্জটা নিয়েছিলেন অর্চনা কাপুর। আজ তিনি এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭ ফ্লাইটের সিনিয়র কম্যান্ডার।
কিছু স্বপ্নের জন্ম হয় ছেলেবেলায়। কিন্তু পৃথিবীর নিয়মকানুন, সমাজের চোখরাঙানি দেওয়াল তুলে দেয় মাঝপথে। নিজের জীবন দিয়ে সেই দেওয়াল ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার গল্প লিখেছেন অর্চনা। আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসে দেশের মেয়েদের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন তিনি। অর্চনার স্পষ্ট বার্তা—‘স্বপ্ন দেখো, নিজের উপর বিশ্বাস রাখো, আর অসম্ভবের সামনে মাথা ঝুঁকিও না কখনও।’
ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় অর্চনা বাবাকে জানিয়েছিলেন নিজের স্বপ্নের কথা। সে-ও ভারতীয় বায়ুসেনার পাইলট হতে চায়। বাবার মতো। অর্চনার বাবা ছিলেন হেলিকপ্টার পাইলট। তাঁর ইউনিফর্ম, কাজের প্রতি নিষ্ঠা আর দায়িত্ববোধ কিশোরীর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। বাবার মতো আকাশে উড়বেন, দেশের সেবা করবেন— স্বপ্নের মায়াকাজল ছিল ছোট্ট মেয়েটার দু’চোখে।
কিন্তু বাবার উত্তর শুনে সব স্বপ্ন ভেঙে খানখান। বাবা বলেছিলেন, ‘পাইলটরা তো চশমা পরেন না।’ অর্চনার চোখে তখন মোটা ফ্রেম। পরে আরও একটি কথা শুনতে হয়েছিল তাঁকে। বায়ুসেনায় মহিলাদের পাইলট হওয়ার সুযোগ নেই। ইউনিফর্ম পরতে চাইলে বরং চিকিৎসক বা অন্য কোনও পেশা...।
অর্চনা তখন বিভ্রান্ত। কখনও ইঞ্জিনিয়ার, কখনও মহাকাশচারী, কখনও পুলিশ অফিসার হওয়ার কথা ভাবছেন। কিন্তু মনের মধ্যে উড়ে যাওয়ার স্বপ্নটা লালন করে গিয়েছেন বরাবর। বন্ধুদের সঙ্গে মিলে মন্ত্রী, সেনাকর্তাদের একের পর এক পত্রাঘাত করতেও ছাড়েননি। প্রশ্নটা সহজ—‘মহিলারা কেন বায়ুসেনার পাইলট হতে পারবেন না?’ উত্তরটাও হয়তো জানা ছিল তাঁর।
১৯৯২-য় খুলে গেল দরজা। ভারতীয় বায়ুসেনা ঘোষণা করল, পাইলট হিসেবে নিয়োগ করা হবে মহিলাদেরও। দু’বছর পরে, ১৯৯৪-এ বায়ুসেনা অ্যাকাডেমিতে যোগ দেওয়ার জন্য নির্বাচিত প্রথম ১৪ জন মহিলার মধ্যে জায়গা করে নিলেন অর্চনা। এটা নিছক স্বপ্নপূরণের গল্প ছিল না। ছিল সমাজের ধারণা বদলে দেওয়ার লড়াই। তবে সেই পথেও কাঁটা ছিল বিস্তর।
খোলা চিঠিতে সেই গল্পই শুনিয়েছেন অর্চনা। এক বার খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে কঠিন অভিযানের দায়িত্ব পড়ল তাঁর উপরে। সঙ্গে এক সিনিয়র নেভিগেটর। প্রথমে তিনি কিছুটা ইতস্তত করেছিলেন। পরে স্বীকারও করেন, আসলে মহিলা পাইলটের সঙ্গে উড়তে তাঁর ভয় করছিল। কিন্তু কঠিন পরিস্থিতিতেও নিরাপদে অভিযান শেষ করেছিলেন অর্চনা।
তাঁর দৃঢ়তা, সাহস আর অনমনীয় মনোভাবে মুগ্ধ সেই আধিকারিক অভিযান শেষে অর্চনার পা ছুয়ে প্রণাম করেছিলেন। জানিয়েছিলেন, তাঁর সদ্যোজাত মেয়েকেও অর্চনার মতো করে বড় করবেন তিনি। চেয়েছিলেন আশীর্বাদ। এই ঘটনাটা আজও তাঁর কাছে স্পেশাল। অর্চনা নিজের কাজের মধ্য দিয়ে বুঝিয়ে দিতে পেরেছিলেন, যোগ্যতার লিঙ্গ পরিচয় হয় না।
বায়ুসেনায় এক দশক কাজ করার পরে বাণিজ্যিক বিমান পরিষেবায় যোগ দেন তিনি। এয়ারবাস এ৩২০ বিমানের প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব সামলেছেন। পরে কাজ করেছেন ডিজিসিএ-র সিনিয়র ফ্লাইট অপারেশনস ইন্সপেক্টর হিসেবেও। শিখেছেন নিখুঁত হতে, ধৈর্য ধরতে। বুঝেছেন জবাবদিহির গুরুত্ব।
এর পর এসেছে বোয়িং ৭৮৭ চালানোর সুযোগ। যে মেয়েটি একসময় এয়ার ইন্ডিয়ার কার্গো বিভাগে কাজ করতে করতে ককপিটে যাওয়ার সুযোগের অপেক্ষা করতেন, আজ তিনিই মহাদেশ পেরিয়ে উড়ে যান আধুনিক ফ্লাইটে। সময়ের সঙ্গে বদলেছে বিমান, বদলেছে দায়িত্ব। কিন্তু বদলায়নি শেখার আগ্রহ।
এয়ার ইন্ডিয়ায় কাজের সময়ে অভিজ্ঞদের পরামর্শ আর নতুনদের প্রশিক্ষণের উপর সবচেয়ে বেশি জোর দেন অর্চনা। তাঁর বিশ্বাস, সাফল্য কারও একার হয় না। পথ দেখানোর, উৎসাহ দেওয়ার, আত্মবিশ্বাস জোগানোর মতো কেউ কেউ থাকেন বলেই এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।
ককপিটে তরুণী পাইলটদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দায়িত্ব নিতে দেখলে নিজের শুরুর দিনগুলির কথা মনে পড়ে অর্চনার। নতুন প্রজন্ম নিজেদের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে আসছে। ভারী ভালো লাগে তাঁর। অর্চনার কথায়, ‘লিডার হওয়া মানে নির্দেশ দেওয়া নয়। বরং দলের প্রত্যেকের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করা, সবার ভিতর থেকে নিজের সেরাটা বের করে আনাই তার কাজ।’
আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসে তাই অর্চনার বার্তা সেই সব তরুণীদের জন্য, যাঁরা নিজের স্বপ্নের পথে বাধা দেখে থমকে গিয়েছেন। তাঁর পরামর্শ, ‘ধৈর্য ধরতে হবে, নিজের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে। সব কিছু একসঙ্গে ঘটে না।’ কখনও কখনও ঘুরপথই মানুষকে এমন গন্তব্যে পৌঁছে দেয়, যা কল্পনাতেও ছিল না।
