ফুট ওভারব্রিজ বা আন্ডারপাস থাকা সত্ত্বেও সামান্য শারীরিক পরিশ্রম বা অলসতার অজুহাতে চলন্ত গাড়ির সামনে দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপার আমাদের নাগরিক সংস্কৃতির এক অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও আত্মঘাতী চিত্র। ঢাকা কিংবা অন্যান্য বিভাগীয় শহরের ব্যস্ত রাজপথগুলোয় প্রতিদিনের এই দৃশ্য যেন এক অবধারিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। একটুখানি পথ বা সময় বাঁচানোর তাগিদে মানুষ ট্রাফিক আইন ও নিজের সুরক্ষার কথা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে ডিভাইডার টপকে বা দ্রুতগতির গাড়ির সামনে দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন। এই অপরিপক্ব ও বেপরোয়া মানসিকতার কারণে প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা, ঝরে যাচ্ছে অসংখ্য তাজা প্রাণ আর পঙ্গুত্ববরণ করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন অনেকে। নগরবাসীর এ আত্মঘাতী প্রবণতা রোধে কেবল চালকদের দোষারোপ করলেই চলবে না; বরং পথচারীদের মানসিকতার আমূল পরিবর্তন এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
বলা বাহুল্য, প্রতিনিয়ত ঘটে চলা মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে মূলত নাগরিক অসচেতনতার পাশাপাশি নগর কাঠামোর কিছু বাস্তব ত্রুটি সমান্তরালভাবে দায়ী। অনেক ফুটওভার ব্রিজে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা যায়, এসকেলেটর বা লিফট বছরের পর বছর অচল থাকে, পর্যাপ্ত আলোর অভাব থাকে এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে সেগুলো ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়। এ ছাড়া হকারদের দৌরাত্ম্য, নিরাপত্তা ঘাটতি ও নারী পথচারীদের ক্ষেত্রে হয়রানির আশঙ্কার কারণে অনেকে ফুট ওভার ব্রিজ ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। অন্যদিকে জেব্রা ক্রসিং বা সিগন্যাল মেনে চলার দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের ‘শর্টকাট’ মানসিকতা জেঁকে বসেছে। তারা বুঝতে চান না যে, জীবনের চেয়ে কোনো গন্তব্য বা কাজের তাড়া কখনোই বেশি মূল্যবান হতে পারে না। এই খামখেয়ালি আচরণের ফলে একদিকে যেমন পথচারীর জীবন বিপন্ন হয়, অন্যদিকে চালকদের ওপরও মারাত্মক মানসিক চাপ তৈরি হয় এবং অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত আইনি জটিলতার সৃষ্টি হয়।
বলার অপেক্ষা রাখে না, একটি নিরাপদ সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হলে গাড়ির গতির পাশাপাশি পথচারীর শৃঙ্খলা ও সচেতনতাও সমানভাবে অপরিহার্য। খামখেয়ালি আচরণে আত্মঘাতী সংস্কৃতির স্থায়ী নিরসনে নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। এ জন্য সিটি কর্পোরেশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নগরীর সব ফুটওভার ব্রিজকে পথচারীবান্ধব করতে হবে। সচল রাখতে হবে এসকেলেটর ও লিফট এবং নিশ্চিত করতে হবে লাইটিং ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা। রাস্তার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোয় পর্যাপ্ত জেব্রা ক্রসিং, আন্ডারপাস ও আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যালের সুব্যবস্থা রাখতে হবে- যাতে মানুষ সহজেই নিয়ম মেনে পারাপার হতে পারে। আইন অমান্য করে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপারকারীদের বিরুদ্ধে ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে কঠোর জরিমানা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এর পাশাপাশি, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচার চালিয়ে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন আনতে হবে। তাই আমাদের প্রত্যাশা, ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে বাধ্য করতে আইনের কঠোর প্রয়োগে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে কর্তৃপক্ষ।
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬
