কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি (পদ স্থগিত) জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে গত ১৫ জুলাই রাতে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডে এ পর্যন্ত ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে সম্প্রতি প্রধান আসামি মো. হেলালের সঙ্গে জাহাঙ্গীরের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার চৌধুরীর ৯ মিনিট ১৮ সেকেন্ডের ফোনালাপ ঘিরে বিষয়টি ফের আলোচনায় এসেছে।
ফোনালাপে হত্যার সঙ্গে জাহাঙ্গীরের আপন ছোট ভাই কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা বিএনপির বৈদেশিক ও প্রবাসী কল্যাণ সম্পাদক আলমগীর শিকদারের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন হেলাল। তবে বিষয়টিকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন তিনি। হত্যাকাণ্ডের পর থেকে তিনি নিজেও বিচারের দাবিতে সরব ছিলেন।
হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে জনতার হাতে আটক হয়েছিলেন হেলাল। পরে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) জাহাঙ্গীরের স্ত্রী এনটিভি অনলাইনকে জানান, ১০-১১ দিন আগে হেলাল তাকে কল করেছিলেন এবং তাদের ফোনালাপে আলমগীর শিকদারের জড়িত থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে।
এ বিষয়ে অষ্টগ্রাম সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. দিদারুল ইসলাম বলেন, অন্য একজনের মাধ্যমে ফোনালাপ সম্পর্কে শুনেছি। কিন্তু এখনও রেকর্ড শুনিনি। আমি এই বিষয়ে ডিবির মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলব।
বিএনপিনেতা জাহাঙ্গীর হত্যা মামলার প্রধান আসামি মো. হেলালের সঙ্গে জাহাঙ্গীরের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার চৌধুরীর ফোনালাপ এনটিভি অনলাইনের হাতে এসেছে।
ফোনালাপে হেলালকে বলতে শোনা যায়, জাহাঙ্গীরকে হত্যার উদ্দেশ্যে নয় বরং তাঁর হাত কেটে ফেলার জন্য ভাড়া করা হয়েছিল। এ কাজের জন্য জাহাঙ্গীরের আপন ছোট ভাই আলমগীর শিকদার তাদেরকে ভাড়া করেছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
হেলালের ভাষ্য অনুযায়ী, যখন আলমগীর শিকদার ভাড়া করে তখন বলা হয়, যেভাবেই হোক তার (জাহাঙ্গীর) একটা হাত কেটে ফেলতে হবে, এতে যদি মারা যায়, তাহলে মারা যাক।
ফোনালাপে হেলালকে আরও বলতে শোনা যায়, তাঁরা পেশাদার খুনি নন। চুরি, ছিনতাই ও মাদক সেবনের সঙ্গে জড়িত। টাকার লোভে তাঁরা এ কাজে জড়িয়েছেন। কিন্তু জাহাঙ্গীর মারা যাবে, এটা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না।
হেলাল আরও বলেন, আমার একজন বন্ধু আছে রিয়াজ। তার সঙ্গে খোকা ভাইয়ের মাধ্যমে আলমগীর কথা বলে।
উল্লেখ্য, এই মামলায় গত ৯ অক্টোবর রাতে উপজেলা ছাত্রদলের বহিষ্কৃত আহ্বায়ক মোকাররম হোসেন খোকা ও তার ভাতিজা মো. রিয়াজকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
ফোনালাপে আরও শোনা যায়, পরশুদিন জেলে খোকা ভাই আসছিল। তখন আমাদেরকে খুব গালমন্দ করে। তিনি বলেন, তোরা আলমগীর ভাইয়ের নাম কেন বলতে গেলি? কে এখন তোদের বাঁচাবে? আমাদের নিষেধ ছিল তার (আলমগীর) নাম বলা যাবে না।
হেলাল বলেন, আমি বলেছি এই কাজ করিয়েছে আলমগীর। এই নাম (আলমগীর) বললে আমাদের বেশি বেশি মারে। আরেকটা কথা শোনেন, কয়েকদিনের মধ্যেই খোকাকে রিমান্ডে নেবে কিন্তু আলমগীরের নাম বলবে না। ওরা আর একটা গেম করতেছে। বিশ্বাস করেন আমি তার (খোকা) মাধ্যমে আসছি। খোকা আলমগীর ভাইয়ের জন্য আমাদের নিয়ে আসছে। আর একটা কথা অনেক মানুষ ফাও ফাও ফেসে গেছে, উনারা আমাদের চিনত না।
এই পাশ থেকে নিহত জাহাঙ্গীরের স্ত্রী প্রশ্ন করেন, তোমাকে কি জেল থেকে বের করে এনে হত্যাকাণ্ড করিয়েছে? উত্তরে হেলাল বলেন, না না জেল থেকে না। আমি ঢাকা থেকে এসেছিলাম। মিঠামইনে আমি ১৫-২০ দিন ছিলাম তারপর সব কিছু বুঝেছি কে করাচ্ছে, কে আনছে, কে টাকা দিয়েছে। আলমগীর ভাইয়ের একজন লোক ছিল সে আমাদের খাওয়া দাওয়ার টাকা দিত, লোকটার নাম মনে নেই; লম্বা, গায়ের রঙ কালো। সে অন্য এলাকার মেম্বার। রিয়াজের সঙ্গে আলমগীরের সরাসরি কথা হতো।
ফোনালাপের বিষয়ে তাসলিমা আক্তার চৌধুরী বলেন, আমাদের এলাকার একজনের মাধ্যমে আমার কাছে খবর আসে যে একজন আমার সঙ্গে জেল থেকে কথা বলবে। সে ভাড়াটে খুনি হেলাল। তারপরও কথা হয়, সে কীভাবে আসছে, কে আনছে সব কিছু বলে। আলমগীর ভাড়া করে এনেছে এটা বলেছে। এইসব শোনার পর তাদের পারিবারিক মতামত কী-এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আলমগীর যে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এটা আমরা সবাই আগে থেকেই সন্দেহ করেছি। সবাই এই হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার চাচ্ছে।
আলমগীর শিকদারের সঙ্গে কী আপনাদের যোগাযোগ আছে এই প্রশ্নের জবাবে জাহাঙ্গীরের স্ত্রী বলেন, না, আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই। কোথায় আছে জানি না।
তাসলিমা আক্তার চৌধুরী বলেন, আগামীকাল শনিবার (২৪ অক্টোবর) হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবার শাস্তি দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করবে মিঠামইনবাসী।
বিভিন্ন সূত্র এবং আলমগীর শিকদারের ফেসবুক আইডি থেকে জানা গেছে, কয়েক সপ্তাহ ধরে আলমগীর শিকদার দেশের বাইরে সুইজারল্যান্ডের আছেন।
মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এগুলো ভিত্তিহীন। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। যে ছেলে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে অনেকদিন আগে, তার বক্তব্য এখন কীভাবে আসে। আমি জড়িত থাকলে আইনে ধরলো না কেন? আমি এখন দেশের বাইরে আছি আবার দেশে আসব।
আলমগীর শিকদার বলেন, যে ছেলে কথা বলেছে সে তো আমার নাম বলে নাই, খোকার নাম বলেছে। তাহলে খোকা বলুক আমার নাম, আমি জড়িত। আমার ভাইয়ের বউ আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান। সে এখন আওয়ামী লীগের টান টানবেই। আমার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করবে, আমিও দেশে এসে সংবাদ সম্মেলন করব।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জাহাঙ্গীর ও তাঁর ছোট ভাই আলমগীর শিকদারের মধ্যে মতবিরোধ ছিল।
মামলায় এ পর্যন্ত তিনজন ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন উল্লেখ করে বাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম রতন বলেন, ফোনালাপের সম্পর্কে শুনেছি। কিন্তু এখনও বাদী পক্ষের সঙ্গে এই বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। বাদী পক্ষের পরামর্শ অনুযায়ী আইনি লড়াই চালিয়ে যাবো।
উল্লেখ্য, গত ১৫ জুলাই রাতে মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে নিজ বাড়ির সামনে হত্যা করা হয়। ১৮ জুলাই নিহত বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীরের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার চৌধুরী বাদী হয়ে মিঠামইন থানায় মামলা করেন। মামলায় তিনজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়।
মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনোয়ার মোহাম্মদ বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর থেকে এই পর্যন্ত ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বর্তমানে ডিবিতে তদন্তের জন্য মামলা হস্তান্তর করা হয়েছে।
