বিশিষ্টজনদের গোলটেবিল বৈঠক
ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিস্তার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে প্রবীণ ও তরুণদের সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্ট ব্যাক্তিরা। তাঁরা বলেছেন, বাংলাদেশের জনগণ আর কখনো ভারতীয় আধিপত্যবাদ মেনে নেবে না।
ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিস্তার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে প্রবীণ ও তরুণদের সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্ট ব্যাক্তিরা। তাঁরা বলেছেন, বাংলাদেশের জনগণ আর কখনো ভারতীয় আধিপত্যবাদ মেনে নেবে না। জাতীয় প্রেসক্লাবে ভিশন পিস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টার (ভিপিএসএসসি) এর “জাতীয় ঐক্য: সংকট উত্তরণের উপায়” শীর্ষক আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ভিশন পিস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টার ( VPSSC )-এর উদ্যোগে গতকাল শনিবার এই গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে শিক্ষাবিদ, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, সাবেক মন্ত্রী, আমলা, কুটনীতিবিদ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, সাংবাদিক, উদ্যোক্তা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিসহ অনেকে অংশগ্রহণ করেন।
মুক্ত আলোচনার আদলে আয়োজিত এই গোলটেবিল আলোচনায় সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন VPSSC -এর চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী (অব:)। সূচনা বক্তব্যে তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় সবার মধ্যে ঐক্য অপরিহার্য। জাতি বিভিন্ন সময়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, কিন্তু পরবর্তীতে আবার বিভক্ত হয়েছে। তিনি বলেন, এর পেছনে রয়েছে একটি সম্প্রসারণবাদী ও আধিপত্যবাদী প্রতিবেশী দেশের পরিকল্পনা, যার লক্ষ্য জনগণকে বিভক্ত করা, অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা এবং একটি অনুগত সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণ করা। জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে জনগণ এ ধরনের প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেছে; কিন্তু আবারও অনুপ্রবেশের চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, ভারতীয় গণমাধ্যম, ভারতীয় পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা, ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী এবং তাদের এজেন্টদের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো অপপ্রচার জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষায় রাজনৈতিক মতপার্থক্য দ্রুত পাশে সরিয়ে রেখে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। অতীত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি না করে বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের বাস্তবসম্মত ও জরুরি করণীয় নির্ধারণে মনোযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে তিনি উপস্থিত অতিথিদের আলোচনার জন্য উন্মুক্ত আহ্বান জানান।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী; রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান; মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুর রব; অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সাইদুল ইসলাম; কমডোর জসীম উদ্দিন ভূঁইয়া; সমাজ ও মানবাধিকারকর্মী রুবি আমাতুল্লাহ; লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মুদাসসির এইচ খান, বীর প্রতীক, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাবেক সদস্য ও সাবেক সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ আয়ুব মিয়া; ব্যারিস্টার এম বেলায়েত হোসেন; মাহমুদা চৌধুরী; সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী; অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন; এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ড. নাঈমা মুয়াজ্জম।
আলোচকগন বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর পাঁচটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল—নিরাপত্তা, ঐক্য, সংস্কার, পুনর্মিলন এবং নতুনভাবে যাত্রা শুরু করা। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রত্যাশিত ঐক্য, সংস্কার ও পুনর্মিলন প্রতিষ্ঠিত হয়নি; বরং পারস্পরিক দোষারোপ ও বিদ্বেষ বেড়েছে। তিনি শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, শিশু, নাগরিক ও রাজনীতিবিদদের নতুনভাবে শিক্ষিত ও সচেতন করে তোলা এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকলে ভারত বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। তারা আরো বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনের পেছনে থাকা শক্তিগুলোর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টিকারী বিষয়গুলো দ্রুত চিহ্নিত করতে হবে। এসব বিষয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা করে গণমাধ্যম ও তরুণদের অন্তর্ভুক্তিতে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে হবে। শুধুমাত্র দুই রাজনৈতিক দলের ঐক্যই বাংলাদেশের আধিপত্যবাদ বিরোধী অবস্থান নিশ্চিত করতে পারবে না; তরুণদের সম্পৃক্ত করতে হবে এবং জনমত ও জনচাপ গড়ে তুলতে হবে, যাতে দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া না হয়।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মুদাসসির এইচ খান, বীর বিক্রম, বলেন, জাতীয় স্বার্থ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানোকে জাতীয় ঐক্য হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন; একই সঙ্গে ব্যক্তি ও দলের নিজস্ব মতপার্থক্য বজায় রাখার বিষয়টিও তিনি স্বীকার করেন। তার মতে, ক্ষমতা হারানোর ভয় এবং যেকোনো উপায়ে ক্ষমতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষাই দীর্ঘস্থায়ী ঐক্য প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার মূল কারণ। তিনি আত্মসমালোচনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং বলেন, ২০২৪ সালে যারা বুলেটের মুখোমুখি হয়েছিল, সেই তরুণ-তরুণীদের যথাযথ দিকনির্দেশনা দিয়ে নেতৃত্বের সামনের সারিতে নিয়ে আসতে পারলে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব।
