টলিপাড়ার আঙিনায় বংশপরিচয়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের মেধা ও স্বকীয়তায় শক্তপোক্ত আসন করে নিয়েছেন প্রতিশ্রুতিশীল অভিনেতা দেবপ্রিয় মুখোপাধ্যায়। প্রথিতযশা শিল্পী মৃণাল মুখোপাধ্যায়ের কৃতি সন্তান এবং জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী জোজোর ভাই হওয়া সত্ত্বেও জীবনের কোনো পর্যায়েই পারিবারিক পরিচিতিকে নিজের সুবিধার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেননি এই তারকা। বরং শিল্পের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা আর জন্মগত প্রতিভাকে সম্বল করে টলিউডের রূপালী পর্দায় নিজের রাজত্ব নিজে তৈরি করেছেন দেবপ্রিয়। সম্প্রতি এক জমকালো টেলিভিশন শোয়ের মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের এই দীর্ঘ সংগ্রামের নেপথ্য কাহিনী এবং সাফল্যের ঝলমলে পথচলার অজানা অধ্যায় ভাগ করে নেন তিনি।
ছোটবেলা থেকেই শিল্পের আবহে বড় হওয়া দেবপ্রিয়র শৈশব কেটেছে গান বাজনার তালিম নিয়ে। বাবা ও মায়ের সুপ্ত বাসনা ছিল ছেলেকে সংগীতের ভুবনে প্রতিষ্ঠিত করার। তবে সবকিছু বদলে যায় যখন কলকাতার ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানমঞ্চে প্রথমবার অভিনয় করার সুযোগ পান তিনি। সেই মঞ্চের আলো-আঁধারি আর দর্শকদের করতালির মাঝেই দেবপ্রিয় উপলব্ধি করেছিলেন, অভিনয় নামক মায়াবী শিল্পই হতে চলেছে তাঁর জীবনের একমাত্র নেশা এবং পেশা। কিন্তু এই উপলব্ধির যাত্রাপথটা মোটেও ফুল বিছানো ছিল না। পরিবারের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল, অভিনয়ের মূল ভিত তৈরি হলেও তার প্রসারের জন্য কোনো রকম সুপারিশ বা তদবির করা হবে না।
বাবার এই কঠোর অথচ সুদূরপ্রসারী নিয়মের কারণে নিজের অভিনয় ক্ষমতার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে বিনোদন ইন্ডাস্ট্রিতে লড়াই শুরু করেন দেবপ্রিয়। অবশেষে টলিউডের খ্যাতনামা নির্মাতা অঞ্জন দত্তের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে ডাক পান তিনি এবং ‘তিন পেনি অপেরা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় নিজের খাতা খোলেন। এই সিনেমায় তাঁর সাবলীল অভিনয় নজর কাড়ে টপঅর্ডার পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি, সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরেই ‘জুলফিকার’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সোনালী সুযোগ পান দেবপ্রিয়। বৃহৎ পরিসরে কাজ করার সেই অভিজ্ঞতা তাঁর অভিনয় জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং তাঁকে নিয়ে যায় সাফল্যের এক অনন্য উচ্চতায়।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ছোট পর্দা এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মেও নিজের বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন এই অভিনেতা। ‘গণশত্রু’, ‘মৌচাক’, ‘বিভীষণ’, ‘আসছে আবার শবর’ এবং ‘দ্য একেন’-এর মতো আলোচিত সিনেমা ও ওয়েব সিরিজের পাশাপাশি জনপ্রিয় ‘নেতাজি’ ধারাবাহিকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। সম্প্রতি সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘এমপারার ভার্সেস শরৎচন্দ্র’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে আবারও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছেন দেবপ্রিয়। চরিত্র ছোট হোক কিংবা বড়, ইতিবাচক বা নেতিবাচক—প্রতিটি অভিনয়ে নিজের স্বকীয়তা ফুটিয়ে তুলে প্রয়াত বাবা মৃণাল মুখোপাধ্যায়ের মতো একজন পরিপূর্ণ ও সফল অভিনেতা হিসেবে নিজেকে আজীবন টিকিয়ে রাখতে চান দেবপ্রিয় মুখোপাধ্যায়।
