বাংলাদেশে ছেলেদের ছোটবেলা থেকেই শুনতে হয়—‘ছেলেরা কাঁদে না’, ‘কান্না দুর্বলতার লক্ষণ’, ‘পুরুষ মানুষকে শক্ত হতে হয়’। খেলতে গিয়ে পড়ে ব্যথা পেলে কিংবা প্রিয় কিছু হারিয়ে মন খারাপ হলে অনেক ছেলেকেই কান্না চেপে রাখতে বলা হয়। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই শিক্ষা যেন আরও গভীর হয়। ফলে দুঃখ পেলেও অনেক পুরুষ প্রকাশ্যে কাঁদতে সংকোচ বোধ করেন।
ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন ৩০ বছর বয়সী আরিফ (ছদ্মনাম)। কর্মক্ষেত্রে নানা চাপ সামলাতে হয় তাঁকে। কখনো কাজের ব্যর্থতা, কখনো পরিবারের দায়িত্ব, আবার কখনো ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে মানসিক চাপ কম নয়। কিন্তু কাছের মানুষদের সামনেও নিজের কষ্টের কথা বলতে পারেন না তিনি। তাঁর ধারণা, পুরুষ হয়ে কাঁদলে অন্যরা তাঁকে দুর্বল ভাবতে পারেন।
আরিফের এই অভিজ্ঞতা একেবারে বিচ্ছিন্ন নয়। সমাজে পুরুষের কাছ থেকে দৃঢ়তা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্বশীলতা প্রত্যাশা করা হয়। অনেক সময় এসব গুণের সঙ্গে কান্না না করার ধারণাও জুড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু পুরুষেরা কি সত্যিই নারীদের তুলনায় কম আবেগ অনুভব করেন? নাকি সামাজিক প্রত্যাশার কারণে তাঁরা আবেগ প্রকাশ করতে চান না?
কান্নার সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিক ধারণা
আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের (এপিএ) উদ্ধৃত গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, পুরুষেরা বছরে গড়ে ৫ থেকে ১৭ বার কাঁদেন। অন্যদিকে নারীদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ৩০ থেকে ৬৪ বার। অর্থাৎ গড়ে নারীরা পুরুষদের তুলনায় বেশি কাঁদেন।
তবে কান্নার এই পার্থক্যকে শুধু নারী-পুরুষের জৈবিক পার্থক্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। সামাজিক পরিবেশ, ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং আবেগ প্রকাশের বিষয়ে ছোটবেলা থেকে পাওয়া শিক্ষাও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অস্ট্রেলিয়া, ক্রোয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, থাইল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের ৮৯৩ জন অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে করা একটি আন্তর্দেশীয় গবেষণায় কান্না, লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকা এবং কান্না সম্পর্কে মানুষের ধারণা বিশ্লেষণ করা হয়। দেশগুলোর সংস্কৃতি আলাদা হলেও গবেষণায় বেশ কিছু বিষয়ে মিল পাওয়া যায়।
গবেষণায় দেখা যায়, নারীরা পুরুষদের তুলনায় বেশি ঘন ঘন ও তীব্রভাবে কাঁদেন। একই সঙ্গে প্রচলিত পুরুষালি আচরণ ও মূল্যবোধে বেশি বিশ্বাসী পুরুষেরা তুলনামূলক কম কাঁদেন। তাঁদের অনেকে মনে করেন, কান্না তেমন উপকারী নয়।
অন্যদিকে প্রচলিত নারীত্বের সঙ্গে যুক্ত আবেগ প্রকাশের আচরণকে যেসব পুরুষ সহজভাবে গ্রহণ করেন, তাঁদের কান্নার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। তাঁরা কান্নাকে আবেগ প্রকাশের উপকারী উপায় হিসেবেও বেশি বিবেচনা করেন।
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় বিষয়টি বোঝা কঠিন নয়। অনেক পরিবারে ছেলেশিশু কাঁদলে তাকে বলা হয়, ‘তুমি ছেলে, এভাবে কাঁদছ কেন?’ আবার মেয়েশিশুর কান্নাকে অনেক সময় স্বাভাবিক আবেগ প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়। এ ধরনের অভিজ্ঞতা বারবার হতে থাকলে ছেলেরা শিখে নিতে পারে, দুঃখ পেলেও তা প্রকাশ করা উচিত নয়।
অর্থাৎ কান্না শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতির বিষয় নয়; কখন, কোথায় এবং কার সামনে কাঁদা গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে, তার সঙ্গেও সামাজিক নিয়মের সম্পর্ক রয়েছে।
কান্নার পর স্বস্তি মেলে কেন?
কান্নার পর অনেকের মন হালকা লাগে। তবে সবাই একই রকম স্বস্তি অনুভব করেন না। গবেষণায় দেখা গেছে, কান্নার পর কেউ কতটা স্বস্তি পাচ্ছেন, তা তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাসের পাশাপাশি আশপাশের মানুষের আচরণের ওপরও নির্ভর করতে পারে।
যাঁরা মনে করেন, কান্না উপকারী, তাঁরা কাঁদার পর আবেগগত স্বস্তি পাওয়ার কথা তুলনামূলক বেশি জানিয়েছেন। পরিচিত ও কাছের মানুষের সামনে কাঁদলে তাঁদের সহানুভূতি ও সহযোগিতাও স্বস্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণাটির লেখকেরা জানান, কান্নার সময় কেউ যদি অন্যের কাছ থেকে সহায়তা, প্রয়োজনীয় তথ্য কিংবা শারীরিক সান্ত্বনা পান, তাহলে কান্নার পর তাঁর মানসিক অবস্থা তুলনামূলক ভালো হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। তবে শুধু অন্য মানুষের উপস্থিতিই যে স্বস্তি এনে দেয়, বিষয়টি এমন নয়। কান্নার পর মানুষের অনুভূতি মূল্যায়নের সঙ্গে সামাজিক পরিবেশের সম্পর্ক জটিল। দেশ ও সংস্কৃতিও এতে প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের একটি পরিবারের কথা ভাবা যাক। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি চাকরি হারিয়েছেন। সংসারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা কিংবা বাবা-মায়ের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় আছেন। কিন্তু পরিবারের অন্য সদস্যদের উদ্বিগ্ন করবেন ভেবে নিজের কষ্টের কথা বলছেন না। এমন পরিস্থিতিতে তাঁর প্রয়োজন শুধু সমস্যার সমাধান নয়, নিজের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগও।
পরিবারের কেউ যদি তাঁর কথা মন দিয়ে শোনেন, দোষারোপ না করে পাশে থাকেন, তাহলে তিনি মানসিকভাবে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন। এ ক্ষেত্রে কান্না দুর্বলতার প্রমাণ নয়; বরং কষ্টের কথা প্রকাশ এবং অন্যের সহায়তা গ্রহণের একটি উপায় হতে পারে।
কোথায় পুরুষের কান্না বেশি গ্রহণযোগ্য?
পুরুষের কান্না সব পরিস্থিতিতে একইভাবে দেখা হয় না। কিছু ক্ষেত্রে পুরুষের আবেগ প্রকাশ সমাজ তুলনামূলক সহজে গ্রহণ করে। খেলাধুলা তার একটি উদাহরণ।
ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালে প্রিয় দলের পরাজয়, দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর শিরোপা জয় কিংবা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বিদায়ের মুহূর্তে পুরুষ খেলোয়াড়দের কাঁদতে দেখা যায়। বাংলাদেশের ক্রিকেট বা ফুটবলেও আবেগঘন মুহূর্তে খেলোয়াড়দের চোখের পানি দর্শকের সহানুভূতি পায়। এমন পরিস্থিতিতে কান্নাকে অনেক সময় দলের প্রতি ভালোবাসা, দীর্ঘদিনের পরিশ্রম কিংবা জয়ের আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়।
গবেষকদের মতে, যেসব পুরুষকে সমাজের প্রচলিত পুরুষালি আদর্শের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করা হয়, তাঁদের কান্না করার ক্ষেত্রে সামাজিক ছাড় বেশি থাকতে পারে। অর্থাৎ শুধু কান্না করছেন কি না, তা নয়; কে কাঁদছেন এবং কোন পরিস্থিতিতে কাঁদছেন, সেটিও মানুষের মূল্যায়নে প্রভাব ফেলে।
শক্ত থাকা মানেই কি না কাঁদা?
বাংলাদেশে অনেক পুরুষের কাছে পরিবারের দায়িত্ব পালন, বিপদের সময় দৃঢ় থাকা এবং নিজের কষ্ট আড়াল করা পুরুষত্বের অংশ বলে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে পরিবারে উপার্জনকারী ব্যক্তির কাছ থেকে প্রত্যাশা থাকে, তিনি যেকোনো পরিস্থিতিতে শক্ত থাকবেন। ফলে নিজের দুঃখ প্রকাশ করলে তাঁর দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে—এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়।
কিন্তু আবেগ অনুভব এবং তা প্রকাশ করা এক বিষয় নয়। কেউ প্রকাশ্যে কাঁদছেন না বলেই যে তিনি কম কষ্ট পাচ্ছেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। আবার কেউ কাঁদলে তাঁকে দুর্বল ভাবারও কারণ নেই।
এমনকি শোকের মুহূর্তেও সবাই একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান না। প্রিয়জনের মৃত্যুর পর কেউ কাঁদেন, কেউ নীরব হয়ে যান, কেউ আবার পরিবারের অন্য সদস্যদের সামলাতে ব্যস্ত থাকেন। তাই কান্নার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি দিয়ে কারও শোকের গভীরতা নির্ধারণ করা যায় না।
কান্না মানুষের আবেগ প্রকাশের একটি স্বাভাবিক উপায়। পুরুষের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নেই। তাই কেউ কাঁদলে তাঁকে দুর্বল বলার বদলে তাঁর অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করা জরুরি। আর কেউ না কাঁদলে তাঁকে আবেগহীন ভাবারও অবকাশ নেই। কান্নার ধরন আলাদা হতে পারে, কিন্তু কষ্ট অনুভব করার অধিকার সবারই আছে।
