সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত সব রোগীর প্লাটিলেট দেয়ার প্রয়োজন হয় না। তবে গুরুতর রক্তক্ষরণসহ নির্দিষ্ট জটিলতা দেখা দিলে রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন।
দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। রাজধানীর পাশাপাশি ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলাতেও প্রতিদিন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। কিন্তু রোগীর চাপ বাড়লেও অনেক জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে এখনো প্লাটিলেট দেয়ার প্রয়োজনীয় সুবিধা গড়ে ওঠেনি। কোথাও প্লাটিলেট প্রস্তুতের যন্ত্রপাতি নেই, কোথাও নেই প্রয়োজনীয় জনবল ও রক্ত পরিসঞ্চালনসংশ্লিষ্ট সক্ষমতা। ফলে জটিল রোগীর প্লাটিলেট প্রয়োজন হলে নির্ভর করতে হচ্ছে অন্য প্রতিষ্ঠান বা ঢাকার হাসপাতালের ওপর। এতে রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তি বাড়ছে, পাশাপাশি জরুরি সময়ে রোগী স্থানান্তরের কারণে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর মৌসুমে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর এ সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ২১ অক্টোবরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ১৬ হাজার ৯৯০ জন। এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৩৬৪ জনের। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩৭৩ জন এবং মারা গেছেন সাতজন। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরেই সবচেয়ে বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
চলতি বছরে বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ অঞ্চলে চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২১ হাজার ৮১৬ জন। সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকা জেলাগুলোর একটি গাজীপুর। জেলার সিভিল সার্জন ডা. মামুনুর রহমান জানান, ২১ অক্টোবরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ১ হাজার ৩৪৫ জনকে পরীক্ষা করে ৩০০ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৩ জন। অক্টোবরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত জেলায় ছয়জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
অথচ গাজীপুরের চারটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পাশাপাশি শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে প্লাটিলেট কনসেনট্রেট প্রস্তুতের ব্যবস্থা নেই। এসব প্রতিষ্ঠানে এ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত জনবলেরও ঘাটতি রয়েছে। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি জেলার বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও এ সুবিধা নেই। ফলে কোনো ডেঙ্গু রোগীর প্লাটিলেট সঞ্চালনের প্রয়োজন হলে জটিল রোগীদের ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে। এতে জরুরি চিকিৎসা পেতে বিলম্বের পাশাপাশি রোগীর অবস্থার আরো অবনতি ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়তে পারে।
শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আব্দুস সালাম বলেন, ‘আমাদের এখানে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবল নেই। কোনো রোগীর প্লাটিলেট প্রয়োজন হলে কিংবা রক্তচাপ কমে গেলে রোগীর অবস্থা ও প্রয়োজনীয় সূচক বিবেচনা করে তাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দিই।’
ডেঙ্গুতে মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তি—দুই সূচকেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে খুলনা বিভাগ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর বিভাগটিতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৮ হাজার ৬৪ জন। খুলনা বিভাগের যশোরেও ডেঙ্গুর প্রকোপ অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৯৫৭ জন। এর মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছেন ১ হাজার ৭৭৩ জন এবং বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ১০০ জন। তবে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে প্লাটিলেট প্রস্তুতের ব্যবস্থা নেই। প্রয়োজন হলে রোগীর স্বজনদের রেড ক্রিসেন্ট থেকে প্লাটিলেট প্রস্তুত করিয়ে আনতে হচ্ছে। এতে জরুরি সময়ে বাড়তি ভোগান্তিতে পড়ছেন তারা। জেলার বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও এ সুবিধা নেই।
যশোর মেডিকেল কলেজের ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সেলিম রেজা বলেন, ‘যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য প্লাটিলেট প্রস্তুতের ব্যবস্থা নেই। রেড ক্রিসেন্টে চারজন দাতার রক্ত থেকে প্লাটিলেট প্রস্তুত করা হয়। তবে ঢাকায় অ্যাফেরেসিস পদ্ধতিতে একজন দাতার কাছ থেকেই প্রয়োজনীয় প্লাটিলেট সংগ্রহের ব্যবস্থা রয়েছে। যশোর মেডিকেল কলেজে এ-সংক্রান্ত মেশিন পুরোপুরি চালু হলে যশোরসহ আশপাশের জেলার রোগীরাও এ সুবিধা পাবেন।’
যশোর রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য প্লাটিলেট প্রস্তুতের ব্যবস্থা তাদের রয়েছে। হাসপাতাল থেকে কোনো রোগীকে পাঠানো হলে রেড ক্রিসেন্টের কর্মীরা প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্লাটিলেট সরবরাহ করেন।
ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যায় চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে বরিশাল বিভাগ। চলতি বছরে বিভাগটিতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১৪ হাজার ৭৫০ জন এবং মারা গেছেন ২৮ জন। বিভাগের পটুয়াখালী জেলাতেও ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ২০ অক্টোবরের দৈনিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় জেলায় নতুন করে ৩৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত মোট ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ৩৮৭ জন। তাদের মধ্যে ২ হাজার ২৭৩ জন ছাড়পত্র পেয়েছেন এবং বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১১২ জন। এ পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।
তবে বরিশাল বিভাগে প্লাটিলেট দেয়ার সুবিধা সীমিত। বিভাগে একমাত্র বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই এ সুবিধা রয়েছে। পটুয়াখালীর হাসপাতালগুলোতে এ ব্যবস্থা না থাকায় কোনো ডেঙ্গু রোগীর প্লাটিলেট প্রয়োজন হলে তাদের অন্যত্র পাঠাতে হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত সব রোগীর প্লাটিলেট দেয়ার প্রয়োজন হয় না। তবে গুরুতর রক্তক্ষরণসহ নির্দিষ্ট জটিলতা দেখা দিলে রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন। এমন পরিস্থিতিতে নিবিড় পর্যবেক্ষণ, জরুরি চিকিৎসা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তের বিভিন্ন উপাদান সরবরাহের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। জেলা পর্যায়ে এ ধরনের সুবিধা সীমিত থাকলে জটিল রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘সরকারের পক্ষে সব জায়গায় সরাসরি নজর দেয়া সম্ভব নয়। তবে জরুরি পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারেরই। একই সঙ্গে ডেঙ্গুর মৌসুমে হাসপাতালগুলোরও নিজস্বভাবে প্লাটিলেট সরবরাহের সক্ষমতা গড়ে তোলা উচিত। কারণ রোগীর যখন প্লাটিলেটের প্রয়োজন হয়, তখন তাকে অন্য হাসপাতালে রেফার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এতে রোগীর অবস্থার আরো অবনতি ঘটতে পারে।’
প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন যশোর, গাজীপুর ও পটুয়াখালী প্রতিনিধি
