তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুতগতির উদ্ভাবনের এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক অনুষঙ্গ নয়, বরং বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক লেনদেন ও ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে বদলে দেওয়ার প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ ফিনটেক সামিট’-এর ষষ্ঠ সংস্করণে স্পষ্ট উঠে এসেছে যে, এআই ও ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের রূপান্তর বাংলাদেশের জন্য ক্যাশলেস (নগদবিহীন) সমাজ গঠন, প্রান্তিক মানুষের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং দ্রুত ঋণ বিতরণের এক অনন্য দুয়ার উন্মোচন করেছে।
তবে নতুন প্রযুক্তির সুবিধার সাথে সাথে সংবেদনশীল তথ্য সুরক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা এখন সবচেয়ে বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক তাগিদ হিসেবে সামনে এসেছে।
আর্থিক প্রযুক্তি বা ফিনটেক খাতকে কেবল সাময়িক অ্যাপ-ভিত্তিক সেবায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; বরং এটিকে জাতীয় অর্থনীতিতে টেকসই সক্ষমতা তৈরিতে কাজে লাগাতে হবে।
সামিটে উপস্থাপিত আলোচনা অনুযায়ী, ডিজিটাল ব্যাংকিং ও ফিনটেকের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে চিরাচরিত ব্যাংকিংয়ের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
বিশ্বের আধুনিক ব্যাংকিং মডেলগুলোর মতো দৈনন্দিন সেবার সাথে সেভিংস, বিনিয়োগ ও ঋণপ্রদান প্রক্রিয়াকে একটি ‘সুপার অ্যাপ’ ও উন্নত পেমেন্ট পরিকাঠামোতে যুক্ত করা গেলে দেশের এসএমই খাত ও সুবিধাবঞ্চিত বিপুল জনগোষ্ঠীকে সহজে ব্যাঙ্কিং সেবায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হবে।
গ্রাহকসেবায় সার্বক্ষণিক সহায়তা (২৪/৭), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং স্বয়ংক্রিয় কেওয়াইসি (KYC) যাচাইকরণ প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও পরিচালন খরচ বহুগুণ কমিয়ে দেয়।
ফিনটেক খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সুবিধার বিপরীত পিঠে রয়েছে ডেটা প্রাইভেসি এবং চরম আর্থিক নিরাপত্তার ঝুঁকি, যা অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।
গ্রাহকের ব্যক্তিগত আর্থিক রেকর্ড ও গোপনীয় তথ্য যেন কোনো অননুমোদিত এআই এজেন্ট বা অনিয়ন্ত্রিত অ্যালগরিদমের হাতে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে কঠোর আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাইবার নিরাপত্তা প্রয়োজন।
ঋণ ঝুঁকি মূল্যায়ন বা বিমা সেবা প্রদানে এআই যেন কোনো ভুল, স্বজনপ্রীতি বা বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত না নেয়, তার জন্য সর্বক্ষণিক প্রাতিষ্ঠানিক মনিটরিং এবং মানুষের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে দ্রুত নীতি-কাঠামো হালনাগাদ করতে হবে, যাতে উদ্ভাবন ক্ষতিগ্রস্ত না করেও জালিয়াতি প্রতিরোধ করা যায়।
আর্থিক প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের প্রকৃত মূল্য তখনই সার্থক হয়, যখন তা সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসার জীবনে বাস্তব ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।
বাংলাদেশের ফিনটেক খাতকে বিশ্বমানের পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে উদ্ভাবক, বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং নীতি-নির্ধারকদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আস্থার সংকট দূর করে প্রযুক্তির গতিশীলতা এবং কঠোর নিরাপত্তার সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করাই হোক বাংলাদেশের ডিজিটাল আর্থিক রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।
