ডায়াবেটিসকে সাধারণত দুটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। টাইপ-১ ডায়াবেটিস, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অগ্ন্যাশয়ের বা প্যানক্রিয়াসের ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষ ধ্বংস করে দেয়। টাইপ-২ ডায়াবেটিস, যেখানে শরীর ইনসুলিনে কার্যকরভাবে সাড়া দেয় না।
তবে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত কিছু ব্যক্তির মধ্যেও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বা ইনসুলিন প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে পারে। এই দুটি বিপাকীয় সমস্যার যৌথ উপস্থিতিকে সাধারণভাবে ‘ডাবল ডায়াবেটিস’ বলা হয়।
রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অনিয়ন্ত্রিত থাকলে এই অবস্থা শর্করার ব্যবস্থাপনা কঠিন করে তোলে। নানা ধরনের জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স সাধারণত টাইপ-২ ডায়াবেটিসের সঙ্গে জড়িত হলেও অতিরিক্ত ওজন ও কায়িক শ্রমের অভাব থাকলে টাইপ-১ আক্রান্তদের মধ্যেও এটি দেখা দিতে পারে। ‘ডাবল ডায়াবেটিস’ সুনির্দিষ্ট কোনো আনুষ্ঠানিক রোগ নির্ণয়কারী শব্দ বা বিভাগ নয়, বরং টাইপ-১ রোগীদের মধ্যে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের লক্ষণ বোঝাতে এটি ব্যবহৃত হয়।
দিল্লির ফোর্টিস হাসপাতালের নেফ্রোলজি কনসালট্যান্ট ডা. ভানু মিশ্রের মতে, দীর্ঘদিন ধরে রক্তে উচ্চ শর্করা থাকলে তা হৃদযন্ত্র, চোখ, স্নায়ু ও কিডনিসহ বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে।
প্রাথমিক লক্ষণ
ডাবল ডায়াবেটিসের উপসর্গগুলো অনেক সময় অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের সঙ্গে মিলে যায়। শারীরিক লক্ষণ প্রকাশের আগেই অনেকে গ্লুকোজ রিডিংয়ে পরিবর্তন দেখতে পান। সম্ভাব্য সতর্কতামূলক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
টানা উচ্চ রক্তশর্করা:
নির্ধারিত চিকিৎসা পরিকল্পনা অনুসরণ করার পরও রক্তের গ্লুকোজ কাঙ্ক্ষিত সীমার ওপরে থাকা।
অহেতুক ক্লান্তি:
রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে শরীর শক্তি পায় না, ফলে অস্বাভাবিক ক্লান্তি দেখা দেয়।
অতিরিক্ত তৃষ্ণা:
রক্তে জমে থাকা অতিরিক্ত গ্লুকোজ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দিতে শরীর পানি ব্যবহার করায় তীব্র তৃষ্ণা পায়।
ঘন ঘন প্রস্রাব:
কিডনি অতিরিক্ত গ্লুকোজ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে, ফলে ঘন ঘন প্রস্রাবের প্রবণতা বাড়ে।
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে জটিলতা:
ইনসুলিন প্রয়োগের পরও রক্তে শর্করার মাত্রা সহজে নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই লক্ষণগুলো সরাসরি ডাবল ডায়াবেটিসের নির্দিষ্ট উপসর্গ নয়। টাইপ-১ ডায়াবেটিস সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত না থাকলেও এমনটা হতে পারে। রক্তে শর্করার মাত্রা ধারাবাহিকভাবে পরিবর্তিত হলে ডোজ না বদলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তবে বমি, পেটে তীব্র ব্যথা, দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস বা অতিরিক্ত তন্দ্রাচ্ছন্নতার মতো মারাত্মক লক্ষণ দেখা দিলে তা ‘ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিস’ নামক জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়, যেখানে অবিলম্বে হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন।
কী কী কারণে ডাবল ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে?
টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের শরীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরির পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ ভূমিকা রাখতে পারে:
অতিরিক্ত ওজন:
পেটের চারপাশে চর্বি জমে থাকা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের মূল কারণগুলোর একটি, যা ইনসুলিন নির্ভর রোগীদের জন্য গ্লুকোজ ব্যবস্থাপনা আরও কঠিন করে তোলে। তবে স্বাভাবিক ওজনের মানুষের মধ্যেও এটি দেখা দিতে পারে।
শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা:
নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম পেশিকে গ্লুকোজ ব্যবহারে সাহায্য করে এবং ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়ায়। অলস জীবনযাপন এই সংবেদনশীলতা কমিয়ে দেয়।
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যভ্যাস:
প্রক্রিয়াজাত কার্বোহাইড্রেট, মিষ্টি পানীয় এবং অতিরিক্ত ক্যালোরিযুক্ত খাবার গ্রহণ ওজন বৃদ্ধির দিকে পরিচালিত করে। তবে যেকোনো একক খাবারের চেয়ে পুরো খাদ্যভ্যাসের ধরনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
পারিবারিক ইতিহাস:
পরিবারে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের প্রতি জন্মগত প্রবণতা বেশি থাকে। বংশগতি, শরীরের গঠন ও জীবনযাত্রা সবকিছুই এতে প্রভাব ফেলে। কেবল অতিরিক্ত চিনি খেলেই ডাবল ডায়াবেটিস হয় না, এতে বেশ কয়েকটি জৈবিক ও জীবনযাত্রার নিয়ামক যুক্ত থাকে।
শরীরে এর ক্ষতিকর প্রভাব
দীর্ঘদিন ধরে রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে তা রক্তনালী ও স্নায়ুর ক্ষতি করে, যা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে:
হৃদযন্ত্র ও রক্তনালী:
ডায়াবেটিস হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায়। রক্তে উচ্চ শর্করা, উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, ধূমপান বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ফলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।
চোখ (ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি):
রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে রেটিনার সূক্ষ্ম রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রাথমিক অবস্থায় কোনো লক্ষণ দেখা না গেলেও পরবর্তীতে এটি দৃষ্টিশক্তি কমিয়ে দেয় এবং অন্ধত্বের কারণ হতে পারে।
স্নায়ু (ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি):
এটি স্নায়ুর ক্ষতি করে, যার ফলে পা ও হাতে অবশ ভাব, জ্বালাপোড়া বা যন্ত্রণা দেখা দেয়। অনুভূতি কমে যাওয়ার কারণে কাটার বা ফোস্কার ক্ষত সহজে ধরা পড়ে না, যা ঘা বা ইনফেকশনে রূপ নিতে পারে।
কিডনির ওপর প্রভাব
ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে কিডনির যত্ন নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উচ্চ রক্তশর্করা কিডনির ফিল্টারিং কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এ প্রসঙ্গে ডা. ভানু মিশ্র বলেন, ‘রক্তে উচ্চ শর্করা কিডনির ক্ষুদ্র রক্তনালীগুলো নষ্ট করে দেয়, যা ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি বা কিডনি রোগের জন্ম দেয়। এই ব্যাধি ধীরে ধীরে বাড়ে। প্রাথমিক অবস্থায় কোনো লক্ষণ থাকে না। রোগ বাড়লে কিডনি প্রস্রাবের মাধ্যমে প্রোটিন বের করে দিতে শুরু করে এবং কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়। জটিল অবস্থায় কিডনি পুরোপুরি বিকল হতে পারে, যার জন্য ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়। তাই লক্ষণ প্রকাশের অপেক্ষা না করে নিয়মিত ইউরিন অ্যালবুমিন ও কিডনি ফাংশন টেস্ট করানো উচিত।
জটিলতার ঝুঁকি কমানোর উপায়
সবসময় ডাবল ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা না গেলেও, ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি কমানো সম্ভব:
ব্যক্তিগত খাদ্যতালিকা মেনে চলা:
শাকসবজি, হোল গ্রেইন, প্রোটিন ও ফাইবারযুক্ত সুষম খাবার রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। পুষ্টিবিদের পরামর্শে শর্করার পরিমাণ ও খাবারের সময় নির্ধারণ করা উচিত।
নিয়মিত ব্যায়াম:
হাঁটা, সাঁতারকাটা, সাইকেল চালানো ও স্ট্রেন্থ ট্রেনিং ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়ায়। তবে ওয়ার্কআউটের সময় বা পরে রক্তে শর্করা কমে যেতে পারে, তাই ব্যায়ামের সময় ইনসুলিন ও গ্লুকোজ মাত্রা খেয়াল রাখা দরকার।
গ্লুকোজ মনিটরিং:
নিয়মিত শর্করা পরীক্ষা করলে ট্রেন্ড বোঝা যায় এবং চিকিৎসকের জন্য ইনসুলিন সমন্বয় করা সহজ হয়।
রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ:
হৃদযন্ত্র ও কিডনি সুরক্ষায় রক্তচাপ এবং রক্তের চর্বির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
ধূমপান ত্যাগ:
ধূমপান হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় এবং ডায়াবেটিস রোগীদের পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা:
লক্ষণ না থাকলেও চোখ, পা, প্রস্রাবের অ্যালবুমিন ও রক্তে কিডনির পরীক্ষা নিয়মিত করা উচিত। চিকিৎসকের পরামর্শে এই পরীক্ষাগুলোর সময়সীমা নির্ধারণ করা দরকার।
খাদিজা রুমি/
