বাতাসে শিউলির সুবাস, নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা— প্রকৃতিজুড়েই এখন শরতের আবেশ। আর এই আবেশের সঙ্গে বাঙালির মনে জেগে ওঠে দুর্গাপূজার আনন্দ। ষষ্ঠী থেকে দশমী— পাঁচ দিনের এই উৎসব ঘিরে থাকে নানা আয়োজন, প্রিয়জনের সঙ্গে ঘোরাঘুরি আর সাজগোজের পরিকল্পনা। বিশেষ করে শাড়িতে নিজেকে নতুনভাবে সাজিয়ে তোলার আনন্দই যেন আলাদা।
দুর্গাপূজার প্রতিটি দিনের রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। ষষ্ঠীর স্নিগ্ধতা, সপ্তমীর রঙিন আমেজ, অষ্টমীর ঐতিহ্যবাহী সাজ, নবমীর জাঁকজমক আর দশমীর লাল-সাদার চিরচেনা আবেদন— প্রতিটি দিনেই সাজে আনা যায় ভিন্নতা। শুধু পোশাক নয়, রং, গয়না, চুলের ধরন ও মেকআপেও থাকতে পারে নতুনত্ব। তাহলে জেনে নেওয়া যাক, পূজার পাঁচ দিনে কীভাবে সাজে ফুটিয়ে তোলা যায় পাঁচ রকম রূপ।
ষষ্ঠী: সাজে থাকুক স্নিগ্ধতা
পূজার প্রথম দিন ষষ্ঠী। প্রতিমা দর্শন, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা প্যান্ডেলে ঘুরে বেড়ানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় শারদীয় উৎসব। তাই এ দিনের সাজে জাঁকজমকের চেয়ে স্বাচ্ছন্দ্য ও স্নিগ্ধতাকেই প্রাধান্য দেওয়া ভালো।
ষষ্ঠীর পোশাক হিসেবে বেছে নিতে পারেন আকাশি, সাদা, হালকা গোলাপি কিংবা প্যাস্টেল রঙের তাঁত বা সুতি শাড়ি। চাইলে নরম জর্জেটের শাড়িতেও সাজতে পারেন। শাড়ির সঙ্গে মানানসই সাধারণ ব্লাউজ সাজে আনবে পরিপাটি ভাব। গয়নার ক্ষেত্রে মুক্তার মালা, ছোট দুল কিংবা রুপার গয়না বেছে নিতে পারেন। চুলে বেলি বা চাঁপাফুলের মালা, হাতে কয়েক গাছি চুড়ি আর কপালে ছোট্ট টিপ— এতটুকুতেই পূর্ণতা পাবে ষষ্ঠীর সাজ।
মেকআপে থাকুক হালকা বেইজ, ন্যাচারাল ব্লাশ ও নুড লিপস্টিক। দিনের বেশির ভাগ সময় বাইরে কাটানোর পরিকল্পনা থাকলে আরামদায়ক পোশাক ও হালকা গয়নাই হবে উপযুক্ত।
সপ্তমী: রঙের ছোঁয়ায় উৎসবের আমেজ
ষষ্ঠীর স্নিগ্ধতার পর সপ্তমীতে সাজে আনা যায় একটু উজ্জ্বলতা। এ দিন থেকেই পূজার উৎসব জমে ওঠে, বাড়তে থাকে ঘোরাঘুরি ও আড্ডার ব্যস্ততা। তাই পোশাকে উজ্জ্বল রং আর সাজে আধুনিকতার ছোঁয়া রাখতে পারেন।
শাড়িপ্রেমীরা বেছে নিতে পারেন টিয়া, সবুজ, কমলা, লাল কিংবা উজ্জ্বল নীল রঙের শাড়ি। একরঙা শাড়ির সঙ্গে প্রিন্ট, লেস বা সূচিকর্মের ব্লাউজ পরলে সাজে আসবে ভিন্নতা। শাড়ির বদলে ইন্দো-ওয়েস্টার্ন পোশাক, প্রিন্টেড লেহেঙ্গা কিংবা টপ-স্কার্টও হতে পারে ভালো বিকল্প।
সাজের সঙ্গে মানানসই বড় ঝুমকা বা ঝোলানো দুল, হাতে চুড়ি এবং ছোট ব্যাগ বেছে নিন। চুল খোলা রাখতে পারেন, কিংবা এক পাশে ফুল গুঁজে দিতে পারেন। আগের দিনের খোঁপা বা বাঁধা চুলের বদলে বেণি করলেও সাজে আসবে নতুনত্ব। মেকআপে চোখের সাজ একটু গাঢ় করে ঠোঁটে পরতে পারেন গোলাপি বা কোরাল রঙের লিপস্টিক।
অষ্টমী: ঐতিহ্য আর আভিজাত্যের মেলবন্ধন
দুর্গাপূজার অন্যতম আকর্ষণ অষ্টমী। সকালে অঞ্জলি দেওয়া আর সন্ধ্যায় প্রতিমা দর্শন— দুই পর্বের জন্যই থাকে আলাদা প্রস্তুতি। তাই অষ্টমীর সাজে ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সঙ্গে আধুনিক অনুষঙ্গ মিলিয়ে নেওয়া যেতে পারে।
সকালের অঞ্জলির জন্য সাদা-লাল, পুরো লাল কিংবা হালকা রঙের শাড়ি বেছে নিতে পারেন। জামদানি, তাঁত বা সুতি শাড়িতে সাবেকি সাজ ফুটে উঠবে সহজেই। সন্ধ্যার আয়োজনে চাইলে গাঢ় নীল, বেগুনি, ছাই, বাদামি কিংবা উজ্জ্বল রঙের অরগ্যাঞ্জা শাড়ি পরতে পারেন। জামদানি বা সিল্কের শাড়িও এ দিনের সাজে মানানসই।
গয়নায় থাকতে পারে ঐতিহ্যবাহী ঝুমকা, চোকার, নাকফুল কিংবা নকশা করা চুলের কাঁটা। চুল পরিপাটি করে খোঁপা করে তাতে ফুল বা অলংকার জুড়ে দিতে পারেন। চোখে কাজল, হালকা আইলাইনার আর ঠোঁটে মানানসই লিপস্টিক সাজে যোগ করবে বাড়তি আকর্ষণ।
নবমী: জমকালো সাজে উৎসবের পূর্ণতা
পূজার শেষ রাতের অন্যতম আকর্ষণ নবমী। এ দিনের সাজে থাকতে পারে জাঁকজমক, আভিজাত্য ও উৎসবের উচ্ছ্বাস। বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি, নেমন্তন্ন কিংবা পরিবারের সঙ্গে বিশেষ সময় কাটানোর জন্য নবমীর পোশাক বেছে নিন একটু পরিকল্পনা করে।
গোলাপি জামদানি, মেরুন সিল্ক, বেনারসি কিংবা নেটের শাড়ি হতে পারে নবমীর উপযুক্ত পোশাক। শাড়ির বদলে আনারকলি বা জমকালো লেহেঙ্গাও বেছে নিতে পারেন। পোশাকের রং ও নকশার সঙ্গে মিলিয়ে ভারী দুল, চোকার, চুড়ি কিংবা পাথরের গয়না পরুন। তবে পোশাক ও গয়না দুটোই ভারী হলে একটির প্রাধান্য কমিয়ে ভারসাম্য রাখাই ভালো।
চুলে এলোখোঁপা কিংবা এক পাশে সিঁথি করে সাজতে পারেন। খোঁপায় পাথরের কাঁটা বা ফুলের অলংকার যোগ করলে সাজে আসবে আভিজাত্য। চোখে গাঢ় মেকআপ, গালে হালকা ব্লাশ এবং ঠোঁটে মেরুন, লাল কিংবা বেরি রঙের লিপস্টিক নবমীর সাজকে করে তুলবে আরও আকর্ষণীয়।
দশমী: লাল-সাদায় বিদায়ের আবেগ
দশমী মানেই বিসর্জনের সুর, সিঁদুরখেলা আর বিদায়ের বিষণ্নতার সঙ্গে নতুন বছরের অপেক্ষা। তাই এ দিনের সাজে বাঙালির চিরচেনা লাল-সাদা রঙের আবেদন বরাবরই বিশেষ।
দশমীর জন্য বেছে নিতে পারেন লাল পাড়ের সাদা শাড়ি। চাইলে জরির কাজ করা পাড় কিংবা লাল রঙের সিল্কের শাড়িও পরতে পারেন। সাদা-লাল শাড়ির সঙ্গে লাল ব্লাউজ, কপালে বড় লাল টিপ আর সিঁথিতে সিঁদুর— ঐতিহ্যবাহী এই সাজে ফুটে উঠবে শারদীয় উৎসবের আবহ।
গয়নায় সোনার অলংকার, সোনালি ঝুমকা কিংবা হালকা নকশার চুড়ি মানিয়ে যাবে ভালো। চুল খোলা রাখতে পারেন অথবা নিচু করে খোঁপা বাঁধতে পারেন। চোখে কাজল আর ঠোঁটে লাল লিপস্টিক সাজে আনবে পূর্ণতা। তবে বিসর্জন ও সিঁদুরখেলার সময় স্বাচ্ছন্দ্যের কথা মাথায় রেখে পোশাক, গয়না ও মেকআপ বেছে নেওয়াই ভালো।
পাঁচ দিনে পাঁচ সাজ, উৎসব হোক আরো রঙিন
দুর্গাপূজার পাঁচ দিন মানেই পাঁচ রকম অনুভূতি, পাঁচ রকম আয়োজন। তাই প্রতিদিন একই ধরনের সাজে না থেকে পোশাকের রং, গয়না, চুলের ধরন ও মেকআপে আনুন বৈচিত্র্য। এক দিন থাকুক স্নিগ্ধতা, অন্য দিন উজ্জ্বল রং, কোথাও সাবেকিয়ানা, আবার কোথাও আধুনিকতার ছোঁয়া।
তবে সাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিজের স্বাচ্ছন্দ্য ও ব্যক্তিত্ব। ট্রেন্ড অনুসরণ করার পাশাপাশি পোশাকের সঙ্গে নিজের পছন্দের মিল রাখুন। তাহলেই ষষ্ঠী থেকে দশমী— প্রতিটি দিন হয়ে উঠবে আরও আনন্দময়, আর আপনার পূজার সাজে ফুটে উঠবে নিজস্ব রুচি ও সৌন্দর্য।
