গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়নে অনন্য দুই চীনা নারী
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪১ পিএম
তোং মিনফাং এবং ইউ ছিনসিউ।
-->কেউ ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতিতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলছেন, কেউ আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহারে বদলে দিচ্ছেন গ্রামীণ কৃষির চিত্র। কৃষি, খাদ্যব্যবস্থা ও গ্রামীণ উন্নয়নে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ‘১০০ নারী হিরো’ উদ্যোগে জায়গা পেয়েছেন চীনের দুই নারী।
তারা হলেন চীনের হুবেই প্রদেশের ছিছুন কাউন্টির মক্সিবাস্টন থেরাপিস্ট ইউ ছিনসিউ এবং হুনান প্রদেশের ইউয়েয়াং কাউন্টির ফেংরুই কৃষিযন্ত্র পেশাদার সমবায়ের প্রধান তোং মিনফাং। তাদের কাজের ক্ষেত্র আলাদা হলেও লক্ষ্য এক— গ্রামীণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং নারীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেওয়া।
ইউ ছিনশিউ চীনের জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃত অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ছিছুন মক্সিবাস্টন থেরাপির একজন দক্ষ অনুশীলনকারী। মক্সিবাস্টন হলো ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতির একটি ধরন, যেখানে ভেষজ উপাদান পুড়িয়ে তাপ প্রয়োগ করা হয়। এ পদ্ধতিকে ঘিরে দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন তিনি।
গত দুই দশকে ৩০ হাজারেরও বেশি পেশাদার মক্সিবাস্টন থেরাপিস্টকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন ইউ। তার উদ্যোগে হাজারো মানুষ চাকরি কিংবা নিজস্ব ব্যবসা শুরু করার সুযোগ পেয়েছেন। এর মাধ্যমে বিশেষ করে গ্রামীণ নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আয় বাড়ানোর পথ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, তোং মিনফাং একসময় সফল করপোরেট পেশাজীবী ছিলেন। পরে নিজের এলাকার কৃষির উন্নয়নে কাজ করতে ফিরে আসেন জন্মভূমিতে। বর্তমানে তিনি ইউয়েয়াং কাউন্টির রানশেং রাইস প্রফেশনাল কো-অপারেটিভ এবং ফেংরুই এগ্রিকালচারাল মেশিনারি প্রফেশনাল কো-অপারেটিভের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
তার উদ্যোগে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে শস্য উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের সহায়তায় কাজ চলছে। পাশাপাশি গ্রামীণ নারীদের জন্য কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদনব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করাই তার কাজের অন্যতম লক্ষ্য।
২০২৬ সালকে ‘আন্তর্জাতিক নারী কৃষক বর্ষ’ ঘোষণা করেছে জাতিসংঘ। কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় নারীদের অবদান তুলে ধরা এবং অর্থায়ন, জ্ঞান ও প্রয়োজনীয় সেবায় তাদের প্রবেশাধিকার বাড়াতে নীতি ও বিনিয়োগ উৎসাহিত করাই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
এ উপলক্ষে এফএও চালু করেছে ‘১০০ নারী হিরো’ উদ্যোগ। সংস্থাটি জানিয়েছে, এ স্বীকৃতির জন্য ১৩১টি সদস্যদেশ থেকে ৬০৯টি মনোনয়ন জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই ও একাধিক পর্যায়ের মূল্যায়নের মাধ্যমে নির্বাচিত হন নারীরা।
আগামী ১৫ অক্টোবর রোমে এফএও’র সদর দপ্তরে বিশ্ব খাদ্য ফোরামের অংশ হিসেবে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকাশিত তালিকায় ৯৯ জনের নাম রয়েছে; বাকি একজনের নাম অনুষ্ঠানে ঘোষণা করা হবে।
সূত্র: সিএমজি
আরও পড়ুন
নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী হোন
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম
দ্য জাঙ্গল বুক সম্পর্কে সবাই জানি। একটা মানুষের বাচ্চা নেকড়ের পালের সঙ্গে বড় হয়েছিল। তাকে নেকড়েদের দলের নিয়মকানুন মেনে তো চলতেই হতো, উপরন্তু সব সময় প্রমাণ করতে হতো– সে একটা উপযুক্ত নেকড়ে। মানুষ যে পরিমণ্ডলেই বসবাস করে, তার একটা শক্তিশালী প্রভাব তার ওপর থাকে। যদি নারীদের কথা বলি, সে এক পরিবারে বড় হয়; তার পর অন্য একটা প্রায় অচেনা-অপরিচিত পরিবারে তাকে বসবাস করতে হয়। সে সর্বান্তকরণে সেই নতুন পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে চেষ্টা করে। তার নিজের কী যোগ্যতা, কী তার পরিচয়, কী তার বিলিভ সিস্টেম– সব সে ভুলে যায় নতুন পরিমণ্ডলে খাপ খাওয়াতে গিয়ে।
কেউ কেউ হয়তো বিশেষত যখন তার শিক্ষা-দীক্ষা, পারিবারিক মূল্যবোধ, পরিবেশ-পরিমণ্ডল তুলনামূলকভাবে শ্বশুর পরিবারের চেয়ে অভিজাত বা উচ্চপর্যায়ের হয়; সে বুঝতেই পারে না তার সঙ্গে যে নেতিবাচক আচরণগুলো হচ্ছে, যে বিষয়গুলো ভুল ধরা হচ্ছে তা আসলে তার ভুল নয়, বরং সে যে অভিজাত পরিমণ্ডল থেকে এসেছে– সেই ব্যাপারটাকে ছোট করে এক ধরনের বিকৃত আনন্দ পাওয়ার চেষ্টা। নিজ পরিবারের মানুষও বলে মানিয়ে নাও, কেউ বলে না তোমার জায়গা ওদের চেয়ে অনেক ওপরে; তোমার নিচে নেমে সমতা প্রমাণ করার কোনো দরকার নেই। যেমন সেই নেকড়ের পালে বড় হয়ে ওঠা মানুষের বাচ্চা মোগলিকে কেউ বলেনি যে সে মানুষ। তার যোগ্যতা তার অবস্থান নেকড়ের চেয়ে অনেক ওপরে, তার নেকড়ে হওয়ার চেষ্টা করার দরকার নেই। আসলে কোয়ালিফিকেশনই তার জন্য ডিসকোয়ালিফিকেশন।
‘আমাদের পরিবারের মেয়ে-বউরা কোনোদিন চাকরি করে না।’ এ রকম কথা অহরহ শুনতে হয় কর্মজীবী নারীকে। তাদের পরিবারে হয়তো উচ্চশিক্ষিত মেয়েই নেই বা চাকরি করতে যে যোগ্যতা লাগে, সেটা তাদের নেই। তাই তারা চাকরি করে না। তাই বলে যে যোগ্য, সেও ঘরে বসে থাকবে– এমন তো কথা নেই।
যে মেয়েটা সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে সম্পৃক্ত, টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করে– তাকে শুনতে হয় প্রতিবেশীরা বৌয়ের চরিত্র নিয়ে কথা তুলছে। তাই আর এসব করা যাবে না। প্রতিবেশীরা তো টিভিতে কাজ করা মেয়ে কাছ থেকে কোনোদিন দেখেনি, তাদের কাছে বিষয়টা লোভনীয় কিন্তু হিংসাবশত কাজটা করে। মিডিয়ায় কাজ করা মানেই কি চরিত্র খারাপ! এমন কোনো পরিমণ্ডল আছে, যেখানে চরিত্রহীন মানুষ নেই? তার মানে এই নয়, তাদের আশপাশ দিয়ে হেঁটে গেলে সেও চরিত্রহীন হয়ে যাবে!
সমাজে বসবাস করতে গেলে চারজনের চারটা কথা কানে আসবে। দেখতে হবে কথাগুলো কে বলছে, তার সামাজিক স্ট্যান্ডার্ড কী। ‘কী বলল’, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো– ‘কে বলল’। যারা আপনার আপনজন, সব সময় আপনার ভালো চায়– তারা যখন কোনো ব্যাপারে বাধা দেবে, বিষয়টা গুরুত্ব দেওয়া উচিত এবং বিষয়টা নিয়ে খোলামেলাভাবে আলোচনা করে সিদ্ধান্তে আসা উচিত।
কিন্তু সবার কথা ভাবতে বসে গেলে আপনি এক পা-ও এগোতে পারবেন না। মনে রাখবেন, ‘কমপ্লেক্স’ তা ‘ইনফিরিওরিটি’ হোক বা ‘সুপিরিয়রিটি’– তা মানসিক সমস্যা। ছাড় দিয়ে কমপ্লেক্স থেকে কাউকে বের করে আনা যায় না। হয় চিকিৎসা করাতে হয়, নয় তো ইগনোর করতে হবে। আপনি যদি কোনো অন্যায় না করে থাকেন, সঠিক পথে থাকেন– তা হলে আত্মবিশ্বসের সঙ্গে সামনে এগিয়ে যান। অন্যের মানসিক অসুস্থতার বলি আপনি নিজেকে হতে দেবেন না।
/এসএল
আরও পড়ুন
আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস বার্ধক্যে নারীর যত্ন
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৯ পিএম
সারা জীবন পরিবারকে আগলে রাখা নারীটি যখন বয়সের ভারে ধীরে ধীরে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তখন তার প্রয়োজন হয় শুধু ওষুধ কিংবা চিকিৎসার নয়—সময়, নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও সম্মানেরও। আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস-২০২৬ সামনে রেখে প্রবীণ নারীর সুস্থতা ও মর্যাদা রক্ষায় পরিবারের ভূমিকা তাই নতুন করে ভাবার বিষয়।
একজন নারী জীবনের বড় একটি সময় পরিবার ও সমাজের নানা দায়িত্ব পালন করেন। সন্তান লালন-পালন, সংসার সামলানো, কর্মক্ষেত্রের দায়িত্ব কিংবা স্বজনদের পাশে দাঁড়ানো–সবকিছুর মধ্যেই থাকে তার অবদান। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন শরীরের সক্ষমতা কমে আসে, তখন সেই নারীর নিজের যত্নের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ে। অথচ প্রবীণ নারীদের অনেকেই শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি একাকিত্ব, আর্থিক নির্ভরশীলতা, অবহেলা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি হন।
প্রতিবছর ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালিত হয়। দিবসটি প্রবীণ মানুষের স্বাস্থ্য, অধিকার, কল্যাণ ও মর্যাদা নিয়ে সচেতনতা তৈরির সুযোগ করে দেয়। ২০২৬ সালের এই দিনে প্রবীণ নারীদের জীবন ও প্রয়োজনের দিকে বিশেষভাবে নজর দেওয়া জরুরি।
বার্ধক্যের সঙ্গে পেশিশক্তি কমে যাওয়া, দৃষ্টিশক্তি বা শ্রবণশক্তির পরিবর্তন, হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া কিংবা ঘুমের ধরন বদলে যাওয়া স্বাভাবিক হতে পারে। তবে নতুন বা অস্বাভাবিক কোনো উপসর্গকে শুধু ‘বয়স হয়েছে’ বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, দুর্বলতা, চলাফেরায় সমস্যা কিংবা হঠাৎ শারীরিক পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
হাড় ও হৃদযন্ত্রের যত্ন
মেনোপজের পর নারীদের হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। ফলে পড়ে গিয়ে হাড় ভাঙার আশঙ্কাও তৈরি হয়। দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, ছোট মাছ, ডাল, ডিম ও শাকসবজির মতো পুষ্টিকর খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে হাড়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোও গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে চর্বির অস্বাভাবিকতা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার মতো বিষয়গুলো হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বুকে ব্যথা বা চাপ, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক দুর্বলতা কিংবা মাথা ঘোরা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
নিরাপদ ঘর, নিরাপদ চলাফেরা
প্রবীণ নারীদের পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি কমাতে ঘরের পরিবেশ নিরাপদ করা দরকার। বাথরুমে পিচ্ছিলতা কমানো, সিঁড়ি ও চলাচলের পথে পর্যাপ্ত আলো রাখা এবং মেঝেতে অপ্রয়োজনীয় জিনিস না রাখা জরুরি। শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী নিয়মিত হাঁটা বা হালকা ব্যায়ামও দৈনন্দিন কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।
একাকিত্ব যেন নিত্যসঙ্গী না হয়
প্রবীণ নারীর সুস্থতা শুধু শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্বামী বা কাছের মানুষের মৃত্যু, সন্তানদের দূরে থাকা, অবসর কিংবা আর্থিক নির্ভরশীলতা থেকে একাকিত্ব তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিন মন খারাপ থাকা, কোনো কাজে আগ্রহ হারানো, ঘুম বা খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তন কিংবা সামাজিক যোগাযোগ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার মতো লক্ষণ দেখা গেলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পরিবারের সদস্যদের উচিত নিয়মিত কথা বলা, সময় দেওয়া এবং তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
ওষুধ ও খাবারে সতর্কতা
অনেক প্রবীণ নারী একাধিক রোগের জন্য একাধিক ওষুধ গ্রহণ করেন। তাই ভুল ওষুধ বা মাত্রা এড়াতে পরিবারের কেউ ওষুধের তালিকা সংরক্ষণ করতে পারেন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ বা পরিবর্তন করা উচিত নয়।
বয়স বাড়লে ক্ষুধা কমে যেতে পারে কিংবা দাঁত ও গিলতে সমস্যার কারণে খাবার গ্রহণ কমতে পারে। এতে অপুষ্টি ও দুর্বলতার ঝুঁকি বাড়ে। তাই সহজে খাওয়া যায় এমন পুষ্টিকর খাবার, মাছ, ডিম, ডাল, শাকসবজি ও ফলের ভারসাম্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
যত্নের পাশাপাশি সম্মান
প্রবীণ নারীর জন্য পরিবারের ভালোবাসা ও আন্তরিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো কিংবা দৈনন্দিন কাজে সহযোগিতা করার পাশাপাশি তার ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সিদ্ধান্তের মূল্য দেওয়াও জরুরি। তাকে পরিবারের বোঝা হিসেবে দেখার মানসিকতা বদলাতে হবে।
যিনি জীবনের দীর্ঘ সময় পরিবারকে দিয়েছেন, বয়সের শেষ পর্যায়েও তার প্রাপ্য নিরাপত্তা, সম্মান ও ভালোবাসা নিশ্চিত করা পরিবারের দায়িত্ব। কারণ প্রবীণ নারী শুধু একজন বয়স্ক সদস্য নন–তিনি একটি পরিবারের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও ভালোবাসার ধারক। তার বার্ধক্য যেন নির্ভরতার নয়, মর্যাদারও হয়–আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসে এটিই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
/এসএল
আরও পড়ুন
শখের চুড়িতেই গড়লেন নিজের পরিচয়
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫০ পিএম
ছোটবেলা থেকেই চুড়ির প্রতি আলাদা ভালোবাসা ছিল রিদিতার। ঈদ কিংবা কোনো অনুষ্ঠান এলেই নতুন চুড়ি কেনার আগ্রহ কাজ করত। বাজারে নিজের পছন্দের নকশা, মাপ কিংবা রঙের চুড়ি না পাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেই চুড়ি নিয়ে কাজ করার ভাবনা আসে তার। চাচার বিয়ের শপিং করতে গিয়ে হঠাৎ মাকে বলেছিলেন, ‘বিয়ে শেষ হলে আমি একটা চুড়ির বিজনেস শুরু করব।’ সেই তাৎক্ষণিক কথাই পরে রূপ নেয় বাস্তব উদ্যোগে।
২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে তার ব্যবসায়িক উদ্যোগ ‘চুড়িভার্স’। মাত্র ২২ বছর বয়সেই হয়ে ওঠেন একজন সফল উদ্যোক্তা। শুরুতে পণ্য নির্বাচন, স্টক রাখা, ছবি তোলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট, ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, অর্ডার নেওয়া থেকে প্যাকেজিং সব কাজ একাই সামলাতেন তিনি। অর্ডার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের চাপও বাড়তে থাকে। কাস্টমার সার্ভিসের জন্য মডারেটর ও প্যাকেজিংয়ের জন্য আলাদা মানুষ যুক্ত করেন। এভাবেই গড়ে ওঠে ছোট একটি টিম।
চুড়িভার্সের কালেকশনে রয়েছে গ্লাস, মেটাল, জেলি, ফাইবারসহ বিভিন্ন উপকরণের চুড়ি। নকশা, রঙের সমন্বয় ও ফিনিশিংয়ের দিকেও গুরুত্ব দেন তারা। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয় ঘটানো চুড়ি তৈরি করাই তার বেশি পছন্দ। এমন চুড়ি, যা শাড়ির সঙ্গে যেমন মানিয়ে যাবে, তেমনি ক্যাজুয়াল বা ওয়েস্টার্ন পোশাকের সঙ্গেও পরা যাবে। চুড়িকে শুধু নির্দিষ্ট পোশাক বা অনুষ্ঠানের অংশ না দেখে দৈনন্দিন ফ্যাশনের অংশ করে তোলাই তার লক্ষ্য।
রিদিতার ব্যবসার আয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার ব্যবসার মাসিক আয় সাধারণত এক থেকে দেড় লাখ টাকার মধ্যে থাকে। তবে আয়টা মূলত সিজন ও বিক্রির ওপর নির্ভর করে উৎসব বা বিশেষ সময়গুলোয় বিক্রি তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। আমি আমার উদ্যোগটি মাত্র ২ হাজার ৫০০ টাকা পুঁজি দিয়ে শুরু করেছিলাম। ছোট পরিসরে শুরু করলেও ধীরে ধীরে নিজের কাজ, পরিশ্রম এবং ক্রেতাদের ভালোবাসার মাধ্যমে উদ্যোগটিকে বড় করার চেষ্টা করেছি।
এই পথচলায় পরিবারের সহযোগিতাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। অর্ডার বেড়ে গেলে প্যাকেজিংয়ের কাজে মা ও ফুফু পাশে দাঁড়ান। পাশাপাশি ব্যবসার সহযোগীর অবদানও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। শুরু থেকেই বিভিন্ন কাজে পাশে থাকা, সিদ্ধান্ত নেওয়া ও সমস্যা মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করেছেন তারা। বর্তমানে চুড়িভার্স মূলত অনলাইনভিত্তিক। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে অর্ডার নেওয়ার পর কুরিয়ারে পৌঁছে দেওয়া হয় ক্রেতাদের কাছে। এখনো কোনো স্থায়ী শপ নেই।
তবে ভবিষ্যতে নিজস্ব আউটলেট, আরও বড় কালেকশন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির স্বপ্ন দেখেন রিদিতা। নতুন যারা ব্যবসা শুরু করতে চান, তাদের ভয় না পেয়ে শুরু করার পরামর্শ তার। নিজেও কাজ করতে করতেই শিখেছেন বলে অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে নিজের মতো করে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলেন তিনি।
নারীদের জন্য আমার একটা কথাই বলার আছে “স্বপ্ন দেখো।” কোনো কিছু করার স্বপ্নই আমাদের হৃদয়ে উদ্যমের জন্ম দেয়। তাই নিজের স্বপ্নকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য মনোবল ও আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে হবে। নিজের উদ্যোগকে ছোট করে না দেখে সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে। শুরুটা যত ছোটই হোক না কেন, নিজের প্রতি বিশ্বাস আর নিয়মিত পরিশ্রম থাকলে সেই ছোট উদ্যোগও একদিন অনেক বড় কিছুতে পরিণত হতে পারে।
/এস লুপিন
আরও পড়ুন
ক্ষুদ্র ক্যানভাসে পাহাড়ের আত্মকথা
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৫ পিএম
গাছের ছায়ায় বসে আপন মনে একটি ফলের শুকনো খোলসে রঙের আঁচড় কাটছিলেন সুপ্রয়া চাকমা। ছোট্ট সেই ক্যানভাসে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছিল পাহাড়ি জীবনের নানা গল্প, উৎসব, প্রকৃতি, নারী-পুরুষের মুখচ্ছবি, মাতৃত্ব, আনন্দ-বেদনা আর কৃষ্টি-সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ। কাগজ কিংবা প্রচলিত ক্যানভাস নয়, তার শিল্পের জমিন একটি পবিত্র ফলের শুকনো শরীর।
খাগড়াছড়ি জেলা শহরের দক্ষিণ খবংপুড়িয়া এলাকার তরুণী শিল্পী সুপ্রয়া চাকমা ব্যতিক্রমী এই শিল্পধারার নাম দিয়েছেন ‘ঘিলাফুল মিনিয়েচার’। আয়তনে ক্ষুদ্র, কিন্তু ভাবনার পরিসরে যেন বিস্তৃত এক পাহাড়ি জগৎ। ঘিলা ফলের বুকে ছোট্ট পরিসরে তিনি তুলে ধরছেন পাহাড়ের জীবন, মানুষের অনুভূতি ও ঐতিহ্যের গল্প। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন সুপ্রয়া। পড়াশোনা শেষ করার পর নিজের একটি স্বতন্ত্র শিল্পভাষা খুঁজছিলেন তিনি। সেই খোঁজেই একসময় সামনে আসে ঘিলা ফল। এরপর ধীরে ধীরে ঘিলার শুকনো খোলস হয়ে ওঠে তার শিল্পচর্চার নিজস্ব ক্যানভাস।
পবিত্র ফল থেকে শিল্পের ক্যানভাস
পাহাড়ের বুকে জন্ম নেওয়া পৌরাণিক এক পবিত্র ফলের নাম ঘিলা। এটি মূলত একটি পরগাছা অপুষ্পক বৃক্ষ। পাহাড়ের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর কাছে ঘিলা একটি পবিত্র ফল এবং শুভ ও সমৃদ্ধির প্রতীক।
সুপ্রয়া চাকমা বলেন, ‘পাহাড়ি লোককথায় ঘিলাফুলকে ঘিরে রয়েছে নানা বিশ্বাস। বলা হয়, যে ঘিলাফুল ফুটতে দেখেছে, তার জীবনে সৌভাগ্য আসে। এই লোকবিশ্বাস, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে শিল্পচর্চার যোগসূত্র তৈরি হয়েছে ঘিলাকে ঘিরেই। আমার কাছে ঘিলা এখন কেবল একটি ফলই নয়, এটি পাহাড়ের গল্প বলার এক ক্ষুদ্র অথচ শক্তিশালী মাধ্যম।’
ঘিলার শুকনো খোলসের ছোট্ট বৃত্তে সুপ্রয়া আঁকেন পাহাড়ি উৎসব, প্রকৃতির বৈচিত্র্য, নারী-পুরুষের মুখ, মাতৃত্বের শক্তি, মানুষের সুখ-দুঃখ ও চারপাশের জীবনের নানা দৃশ্য। প্রতিটি কাজই মৌলিক ও স্বকীয়। ঘিলা ফলের বুকেই কেন এমন ছবি আঁকছেন তা জানতে চাইলে শিল্পী বলেন, এখানেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন নিজের শিল্পের আলাদা ভাষা। প্রচলিত ক্যানভাসের বাইরে গিয়ে পাহাড়ের নিজস্ব একটি উপাদানকে শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছেন তিনি।
প্রথম আত্মপ্রকাশ ২০২৩ সালে
২০২৩ সালে ‘রংতুলিতে পাহাড় ও শিল্পভাবনা’ শীর্ষক চিত্রপ্রদর্শনীতে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে আসে সুপ্রয়ার ‘ঘিলাফুল মিনিয়েচার’। এরপর ধীরে ধীরে পরিচিতি পেতে থাকে তার এই ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম। এখন পর্যন্ত চার শতাধিক ঘিলাফুল চিত্র তৈরি করেছেন সুপ্রয়া। দেশের বিভিন্ন জায়গায় তার কাজ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। দেশ-বিদেশেও প্রশংসা পেয়েছে তার শিল্পকর্ম। তবে এই শিল্পকে আরও এগিয়ে নিতে প্রয়োজন স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতা। জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি পেলে ঘিলাফুল মিনিয়েচার আরও বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে বলে আশা সুপ্রয়ার। এই শিল্পধারা গড়ে তোলার পথে পরিবারের সদস্যদের অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতা পেয়েছেন তিনি।
সুপ্রয়ার বাবা মিন্টু বিকাশ চাকমা বলেন, শৈশব থেকেই তার মেয়ের শিল্পের প্রতি আগ্রহ ছিল। নিজের একক প্রচেষ্টায় সুপ্রয়া আজ এমন একটি নান্দনিক শিল্পধারা তৈরি করতে পেরেছেন। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত এই শিল্প দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও সমাদৃত হতে পারে। এতে তরুণ চিত্রশিল্পীরাও অনুপ্রাণিত হবেন।
ঐতিহ্যের শিল্প, হারিয়ে যাচ্ছে উপাদান
খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক ঞ্যোহ্লা মং বলেন, সুপ্রয়ার শিল্পকর্ম তুলে ধরতে ইতোমধ্যে তারা একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন। পাহাড়ের ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে এই শিল্পকে আরও বিকশিত করতে সবার এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
তবে সুপ্রয়ার শিল্পের যে উপাদান, সেই ঘিলা ফলই এখন বিলুপ্তির পথে। ফলে একদিকে যেমন ঘিলাফুল মিনিয়েচারের পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন, অন্যদিকে ঘিলা গাছ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যে ফলের শুকনো খোলসে সুপ্রয়া পাহাড়ের জীবন ও ঐতিহ্য আঁকছেন, সেই ফলই যদি একদিন হারিয়ে যায়, তাহলে তার এই শিল্পের নিজস্ব ক্যানভাসটিও হারিয়ে যাবে। আর তাই ঘিলা গাছ রক্ষায় পাহাড়ের বনায়ন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এই কর্মকর্তা।
ছোট্ট ক্যানভাসে বড় গল্প
ঘিলার শুকনো খোলসের আয়তন খুব বেশি নয়। কিন্তু সেই ছোট্ট পরিসরেই সুপ্রয়া যেন পাহাড়কে ধরে রাখতে চাইছেন। একটি উৎসব, একটি মুখ, একটি মাতৃত্বের মুহূর্ত কিংবা প্রকৃতির কোনো দৃশ্য; সবকিছুই তার তুলিতে জায়গা করে নেয় ক্ষুদ্র সেই ক্যানভাসে।
মিনিয়েচার আর্টের সৌন্দর্য এখানেই। আকারে ছোট হলেও তার ভেতরের গল্প বড়। সুপ্রয়ার ঘিলাফুল মিনিয়েচারেও তাই একটি ছবির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন, স্মৃতি, বিশ্বাস ও সংস্কৃতি। পাহাড়ের প্রকৃতি নীরবে কথা বলে। সুপ্রয়া সেই নীরবতার ভাষা খুঁজে নিয়েছেন রং ও তুলিতে। আর তার ক্যানভাস হয়েছে পাহাড়েরই একটি পবিত্র ফলের শুকনো খোলস।
ঘিলা ফলের মতো শিল্পও ফোটে সময় নিয়ে। আর যখন ফোটে, সে শুধু সৌন্দর্য নয় একটি জাতিসত্তার পরিচয় হয়ে ওঠে। ঘিলাফুল মিনিয়েচার শুধু একটি ব্যতিক্রমী শিল্পধারাই নয়, এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাসহ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তার আত্মপরিচয়ের পুনর্জাগরণ।
/এসএল
