মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা বর্তমানে বিপজ্জনক মোড়ে এসে উপনীত হয়েছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি ও এর
আশপাশের জলসীমায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া এবং যুক্তরাজ্যে গোপন নাশকতা পরিকল্পনার অভিযোগে তেহরানের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ তীব্রতর হয়েছে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল সরবরাহ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে যখন চরম শঙ্কা তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই দুপক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ লক্ষ্য করে গত সোমবার টানা তৃতীয় দিনের মতো শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে হুথিরা। গত শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। গত এক দশকেরও বেশি সময়ে সৌদির মাটিতে এটিই সবচেয়ে বড় প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা। এরপর রবিবারের আরেকটি হামলায় আরও একজন নিহত ও প্রায় ডজনখানেক মানুষ আহত হন।
টানা এসব হামলার ফলে রাজধানী রিয়াদের আকাশপথ সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে পড়েছে এবং আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিমানবন্দরটির অবকাঠামোগত নিরাপত্তা ও অপারেশনাল প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে আগামী শনিবার পর্যন্ত কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে এয়ার ফ্রান্স-কেএলএম, এয়ার ইন্ডিয়া, ক্যাথে প্যাসিফিক, ডেল্টা, ইতিহাদ, গালফ এয়ার, লুফথানসা এবং কাতার এয়ারওয়েজসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি এয়ারলাইনস সৌদি আরবগামী তাদের সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে।
এদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, তারা রিয়াদ অভিমুখে ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খামিস মুশাইত ও রিয়াদের উত্তরাঞ্চল লক্ষ্য করে পাঠানো বেশ কয়েকটি ড্রোন সফলভাবে প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে। তবে হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এক সতর্কবার্তায় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, পবিত্র মক্কা ও মদিনা বাদে সৌদি আরবের অন্য কোনো বিমানবন্দরই আর নিরাপদ নয়। এ ছাড়া সৌদি রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি আরামকোর বিভিন্ন স্থাপনাকেও তাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ঘোষণা করে সংশ্লিষ্ট কর্মী ও নাগরিকদের এসব এলাকা থেকে দূরে সরে যাওয়ার আলটিমেটাম দিয়েছে বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি।
রিয়াদ বিমানবন্দরে হুথিদের নজিরবিহীন ও ভয়াবহ হামলার পর সৌদি আরবের প্রভাবশালী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনা করে তাকে কড়া সুরক্ষাবেষ্টিত ও বাঙ্কার-সুবিধাসম্পন্ন একাধিক প্রাসাদে রাখা হচ্ছে এবং ক্রমাগত এক প্রাসাদ থেকে অন্য প্রাসাদে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। গত ৬ অক্টোবর একটি জাতীয় রক্তদান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর থেকে তাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। যুবরাজের নিরাপত্তায় বিশেষভাবে বাছাই করা একটি উচ্চপদস্থ টিম নিয়োজিত রয়েছে।
সৌদি ভূখণ্ডে হুথিদের একের পর এক এমন সফল আক্রমণ কীভাবে সম্ভব হলো এবং কেন দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সময়মতো ঠেকাতে ব্যর্থ হলো— তা নিয়ে গভীর তদন্ত শুরু করেছে রিয়াদ। আঞ্চলিক দুই কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে যে হুথিরা প্রথমে বেশ কয়েকটি ড্রোন পাঠিয়ে সৌদির রাডার ও নজরদারিব্যবস্থা বিভ্রান্ত করে। এরপর ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বিত ও যুগপৎ হামলা চালানো হয়। হুথিদের কিছু উন্নত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ওয়ারহেড উড্ডয়নকালে গতিপথ পরিবর্তন করতে সক্ষম হওয়ায় প্যাট্রিয়টসহ প্রচলিত প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পক্ষে সেগুলোকে পুরোপুরি প্রতিহত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, ইয়েমেনের অভ্যন্তরেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত রয়েছে। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী ‘অপারেশন ডন অব ইয়েমেন’-এর আওতায় হুথিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের পাল্টা অভিযান পরিচালনা করছে। সরকারি সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক লড়াইয়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ হুথি যোদ্ধা নিহত এবং ৪৪০০-এর অধিক সামরিক যান ও সরঞ্জাম ধ্বংস করা হয়েছে। এর মাঝেই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাইজ শহর ও এর আশপাশের পাহাড়ি এলাকা দখল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে হুথি বিদ্রোহীরা, যা ইয়েমেন সরকারের জন্য বড় ধরনের সামরিক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতেও অব্যাহত আছে উত্তেজনা। ইরানি নৌবাহিনী জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির পূর্বে একটি সীমাবদ্ধ অঞ্চলে স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণব্যবস্থা বন্ধ রেখে অতিক্রম করার সময় একটি তেল ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেটিতে আগুন ধরে গেছে। জাহাজটিকে শনাক্ত করা হলেও কীভাবে এতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেয়নি তেহরান।
ঘটনার প্রেক্ষাপটে ইরানি নৌবাহিনী ওমান সাগর এবং আরব সাগরসহ হরমুজ প্রণালির পূর্ব অঞ্চলে তাদের নতুন মোতায়েন কৌশল গ্রহণ করেছে এবং রিয়েল-টাইমে সামুদ্রিক ট্রাফিক পর্যবেক্ষণ করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে সব জাহাজকে তাদের ইলেকট্রনিক সিস্টেম সচল রাখার এবং নিরাপদ চলাচলের জন্য ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের আহ্বান জানানো হয়েছে। হরমুজ প্রণালির এই সংকটের পাশাপাশি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও সংঘাতের মধ্য দিয়েই ইরানের শহীদ রাজাই বন্দর থেকে চলতি বছরের প্রথমার্ধে পাঁচ মিলিয়নেরও বেশি টন পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে হরমোজগান পোর্টস অ্যান্ড মেরিটাইম অর্গানাইজেশন। তবে এই উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে; অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানির বাজারে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা।
মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ইরানের কথিত ‘শত্রুতামূলক তৎপরতা’ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম জানিয়েছেন, গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে দক্ষিণ ইংল্যান্ডের ফেয়ারফোর্ড রয়্যাল এয়ারফোর্স ঘাঁটিতে যেটি মার্কিন বোমারু বিমানগুলো ব্যবহার করে আসছিল সেখানে সন্দেহজনক নাশকতার পরিকল্পনার পেছনে প্রায় নিশ্চিতভাবেই ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের হাত রয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যে দুই ইরানি নাগরিকের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং তেহরানের অপরাধমূলক নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান কাজা কলাস ব্রিটিশ পদক্ষেপের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ইরানের এই ভীতি প্রদর্শনমূলক কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। এর আগে ইইউ আইআরজিসিকে আগেই সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকাভুক্ত করেছে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চুক্তি করতে চাইলেও তারা সেটি কীভাবে করতে হবে তা জানে না। ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে এবং দেশটিতে চরম মুদ্রাস্ফীতি বিরাজ করছে। তবে তিনি এটাও স্বীকার করেছেন, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হয়তো অতিরিক্ত কঠোর বা ‘বেশিদূর’ চলে গিয়েছিল, যার ফলে এখন আলোচনার জন্য উপযুক্ত কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
ইরানযুদ্ধ ঘিরে চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে তৈরি হওয়া জল্পনা-কল্পনা উড়িয়ে দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, চীন ও রাশিয়া ইরানকে কোনো সাহায্য করছে না। যদি তারা সহায়তা করেও থাকে, তবে তা অত্যন্ত সীমিত পর্যায়ের। তবে আমি একেবারেই বিশ্বাস করি না যে তারা কোনো সাহায্য করছে। কারণ, এতে তাদের হারানোর অনেক কিছু রয়েছে। তারা এমন কিছু করলে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে তা জেনে যাব।’
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের এই চলমান দ্বন্দ্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রক্সি যুদ্ধগুলো যদি এভাবে চলতে থাকে, তবে তা কেবল উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকেই ধূলিসাৎ করবে না, বরং বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির প্রেসিডেন্ট মিরজানা স্পোলজারিক সতর্ক করে বলেছেন, চলমান সামরিক অভিযান এবং সৌদি আরব ও ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের ওপর এর ধ্বংসাত্মক প্রভাব কোটি কোটি বেসামরিক নাগরিকের জন্য চরম বিপর্যয়কর প্রমাণিত হবে।
ইরানি সরকার এবং দেশটির সামরিক নেতৃত্ব অবশ্য সব ধরনের সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার ঘোষণা দিয়েছে। তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নতুন কোনো হামলা হলে তা আরও ধ্বংসাত্মক ও সুদূরপ্রসারী আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হবে। এমতাবস্থায়, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং আগামী দিনের ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্য কোন দিকে মোড় নেবে, তা নির্ধারণ করবে।
