ইউক্রেনে স্টারলিংক ইন্টারনেট সেবার সংযোগ সীমিত করার কথা জানিয়েছেন স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক। এর আগে ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, সংযোগজনিত সমস্যার সমাধান হয়েছে এবং সেবা আবার স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে।
সামরিক কর্মকাণ্ডে বাণিজ্যিক স্টারলিংক সেবা ব্যবহারের মাধ্যমে ইউক্রেন তাদের ব্যবহারের শর্ত লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ করেছেন এই প্রযুক্তি উদ্যোক্তা। তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা স্টারশিল্ডে যে সমস্যা দেখা দিয়েছিল, তার জন্য দায় অস্বীকার করেছেন তিনি।
মাস্কের সর্বশেষ বক্তব্য নিয়ে কিয়েভ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা সেরহি বেস্ক্রেস্তনভ তাঁর পোস্টকে ‘খুবই অদ্ভুত’ বলে মন্তব্য করেছেন।
এর আগে ইউক্রেনের সংযোগ ইচ্ছাকৃতভাবে সীমিত করার অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন মাস্ক। ইউক্রেনের দাবি, এই সমস্যার কারণে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে তাদের প্রতিরক্ষামূলক অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা ব্যাহত হয়েছে।
গত সপ্তাহে রাশিয়ার তেল অবকাঠামোয় ইউক্রেনের হামলা নিয়ে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের মধ্যে উত্তেজনা চলার সময় স্টারলিংকের সংযোগ সমস্যাটি সামনে আসে।
মাস্কের সর্বশেষ বক্তব্য এবং সেবা স্বাভাবিক হওয়ার খবরের আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি মাস্ককে স্টারলিংক সেবা ‘আবার চালু করতে’ বলেছেন। তবে এর আগে সেবা সীমিত করার নির্দেশ দেওয়ার কথা একাধিকবার অস্বীকার করেছিলেন ট্রাম্প।
শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মাস্ক লেখেন, ‘মানুষকে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণাত্মক ড্রোন হামলায় বেসামরিক বাণিজ্যিক সেবা স্টারলিংক ব্যবহার কখনোই অনুমোদিত ছিল না, আর তা হওয়াও উচিত নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী স্টারলিংকের ব্যবহারের শর্ত লঙ্ঘন করে মানুষ হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণাত্মক ড্রোন হামলায় এটি ব্যবহার করেছে। গত সপ্তাহে সেই সুযোগ বন্ধ করা হয়েছে।’
ইউক্রেনকে রক্ষায় পৃথিবীর অন্য যেকোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে স্পেসএক্স বেশি কাজ করেছে বলেও দাবি করেন মাস্ক। একই সঙ্গে তিনি আবারও বলেন, স্টারশিল্ড আলাদা একটি ব্যবস্থা, যা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নিয়ন্ত্রণে। এ ব্যবস্থা কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বিষয়।
পরবর্তী এক পোস্টে মাস্ক লেখেন, সামরিক অবকাঠামোয় স্টারলিংক ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এমন আক্রমণাত্মক হামলায় এটি ব্যবহার করা যাবে না, যার কারণে পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
মাস্কের বক্তব্যের জবাবে বেস্ক্রেস্তনভ টেলিগ্রামে লেখেন, ইউক্রেনে স্টারলিংক ব্যবহার করে পরিচালিত ড্রোনগুলোর গতিসীমা ঘণ্টায় ৭০ থেকে ৯০ কিলোমিটার। রাশিয়ার ভূখণ্ডে এসব ড্রোন কাজ করে না।
তিনি বলেন, ‘তাই বাণিজ্যিক স্টারলিংক ব্যবহার করে আমরা রাশিয়ার গভীরে বা মাঝারি দূরত্বে হামলা চালাতে পারি না। ইউক্রেনে স্টারলিংকের ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে ইলন মাস্ক জানেন না—বিষয়টি খুবই অদ্ভুত।’
এ বিষয়ে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
যোগাযোগের প্রয়োজন অনুযায়ী ইউক্রেন স্টারলিংকের বেসামরিক সেবা ও তুলনামূলক নিরাপদ স্টারশিল্ড—দুটিই ব্যবহার করে। স্পেসএক্সের উৎক্ষেপণ করা নিম্ন-পৃথিবী কক্ষপথের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয় দুটি ব্যবস্থা।
যুদ্ধক্ষেত্রের দুর্গম এলাকায় সামরিক ইউনিটগুলোর মধ্যে সমন্বয় রক্ষায় স্টারলিংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে, স্টারশিল্ডের মাধ্যমে ইউক্রেনের ড্রোন পরিচালকেরা লক্ষ্যবস্তু সরাসরি দেখতে পারেন এবং প্রতিরোধী ড্রোন পরিচালনা করতে পারেন।
রাশিয়াকে স্টারলিংক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়নি। ফলে ইউক্রেন যখন রাশিয়ার গভীরে তেল শোধনাগারসহ বিভিন্ন স্থাপনায় আঘাত হানতে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন পাঠায়, তখন ওই নেটওয়ার্ক কাজ করে না।
শনিবার ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়েভহেনি খমারা জানান, সামরিক বাহিনী এখন স্টারলিংকে ‘স্থিতিশীল সংযোগ’ পাচ্ছে। ড্রোনগুলো ঘণ্টায় ৪০০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চলতে পারছে বলেও জানান তিনি। এর আগে কিয়েভ বলেছিল, ঘণ্টায় ১৬১ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চললে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি টেলিগ্রামে লেখেন, ‘এখন গতি ঠিক যে পর্যায়ে থাকা প্রয়োজন, সেই পর্যায়ে রয়েছে।’
তবে গত সপ্তাহে স্পেসএক্স কেন সেবায় পরিবর্তন এনেছিল, তা মাস্ক তাঁর পোস্টে জানাননি। অথচ কয়েক বছর ধরেই ইউক্রেন স্টারলিংক ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে আসছে।
স্টারলিংকের সংযোগ সমস্যার সময়টিতে জেলেনস্কি ও ট্রাম্পের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছিল। রাশিয়ার অভ্যন্তরে তেল অবকাঠামোয় ইউক্রেনের হামলা নিয়েই মূলত এই বিরোধ।
ট্রাম্পের দাবি, রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। কিয়েভের বক্তব্য, মস্কোর যুদ্ধ প্রচেষ্টার প্রধান আয়ের উৎসে আঘাত হানতে এসব স্থাপনায় হামলা গুরুত্বপূর্ণ।
হামলাগুলো বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে প্রভাব ফেললেও চলতি বছরে দাম বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে ইরান যুদ্ধকে বিবেচনা করা হচ্ছে। আগামী মাসে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে এবং দেশে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে অসন্তোষের মুখে ট্রাম্প রাশিয়ার ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছেন। পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তিতে সম্মত হয়েছেন, যার আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক বাজারে রুশ ডিজেল সরবরাহ করা হবে। ইউরোপীয় মিত্ররা এই চুক্তির সমালোচনা করে বলেছে, এর ফলে রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্রে অর্থের জোগান বাড়বে।
প্রথমে জেলেনস্কি রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করতে রাজি হয়েছিলেন, শর্ত ছিল মস্কোকেও ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করতে হবে। তবে রাশিয়া একাধিকবার সেই শর্ত উপেক্ষা করায় ইউক্রেন আবারও হামলা শুরু করে।
জেলেনস্কির অভিযোগ, স্টারলিংকের সক্ষমতা সীমিত করার পাশাপাশি হামলা বন্ধ না করলে যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানও বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। ট্রাম্প অবশ্য এ অভিযোগও অস্বীকার করেছেন।
এদিকে, রাতভর রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে লড়াই এবং পাল্টাপাল্টি বিমান হামলা অব্যাহত ছিল।
ইউক্রেনের জরুরি পরিষেবা জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলে হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৫ জন, যাঁদের মধ্যে ১১ বছর বয়সী এক কিশোরীও রয়েছে।
এ ছাড়া, মধ্যাঞ্চলীয় শহর ভিনিতসিয়ায় একটি আবাসিক ভবনে রুশ ড্রোন আঘাত হানলে আরও ছয়জন আহত হন।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রোববার জানিয়েছে, কৃষ্ণসাগরের বন্দর চোরনোমর্স্কের দিকে যাওয়ার পথে একটি পণ্যবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী। জাহাজটি ইউক্রেনের সেনাবাহিনীকে সরঞ্জাম সরবরাহে ব্যবহৃত হচ্ছিল বলে দাবি করেছে মস্কো। এ ছাড়া, ইউক্রেনের খারকিভ শহরের একটি লজিস্টিকস কেন্দ্র, বিতরণকেন্দ্র ও সরবরাহ টার্মিনালেও হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে তারা।
এর আগে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, রাশিয়ার ওরিয়ল শহরে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা একটি ভারী যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে ইউক্রেনীয় বাহিনী। রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। সংঘাত এখন পঞ্চম বছরে গড়িয়েছে।
সূত্র: বিবিসি
এমএস/
