নারায়ণগঞ্জে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। সম্প্রতি কুপিয়ে হত্যা, সন্ত্রাসীদের প্রকাশ্যে গুলি, ব্যক্তিগত বিরোধ ও রাজনৈতিক পরিচয়ধারীদের হত্যার ঘটনা ঘটছে জেলার বিভিন্ন এলাকায়। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা। এসব ঘটনায় জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
গত ১৮ অক্টোবর রূপগঞ্জে বিরোধের জেরে যুবদল নেতা রিপন মিয়াকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় এজাহারভুক্ত অন্যতম আসামি সারোয়ার খানকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এর তিনদিনের ব্যবধানে, ২১ অক্টোবর রাতে সোনারগাঁয়ের চিরকিশোরগঞ্জে আড়াইহাজার উপজেলার কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি জহিরুল ইসলাম ফকিরকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। অল্প সময়ের ব্যবধানে জেলার দুটি উপজেলায় দুই রাজনৈতিক নেতার হত্যাকাণ্ড স্থানীয়ভাবে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এর আগে ৮ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত এক সপ্তাহে জেলায় ছয়টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। ওই সময়ে আটটি মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া যায়। এর মধ্যে দুটি অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। এক সপ্তাহের মধ্যে একাধিক হত্যাকাণ্ড ও মরদেহ উদ্ধারের এসব ঘটনা জেলার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এরমধ্যে বন্দরে পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে গত ১২ অক্টোবর। উপজেলার মাহমুদনগর এলাকায় নিহত মাকসুদা বেগমের বয়স ছিল ৭২ বছর। এ সময় তার ছেলে রাসেল ও প্রতিবেশী শফিকুল ইসলাম তাকে রক্ষা করতে গিয়ে আহত হন।
এর পরদিন ১৩ অক্টোবর বন্দরের তিনগাঁও উত্তরপাড়া এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে সুফিয়া আক্তার নিশি (২৪) নামের এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় তার স্বামী আবদুল মান্নান ওরফে মনিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দাম্পত্য কলহের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এছাড়া গত ৪ সেপ্টেম্বর রাতে চাষাড়ায় হকার্স মার্কেটের পেছনে শুভ চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড শহরে আলোচনার জন্ম দেয়।
সেইসাথে গত ১৮ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ শহরের আমলাপাড়া এলাকায় মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে তুলে দিতে গিয়ে সকালে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন দৈনিক শীতলক্ষ্যার সম্পাদক ও নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি আরিফ আলম দিপু।
এ সময় ছুরি ও আগ্নেয়াস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে নগদ টাকা এবং তার মেয়ের মোবাইল ফোন ও কানের দুল ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীর।
এছাড়া গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) ফতুল্লায় ফুল বিক্রি করা ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ উঠে। মধ্যরাতে শিশুটিকে চানমারী থেকে তুলে নিয়ে শিবু মার্কেট এলাকার একটি বাসায় নিয়ে অচেতন করে ধর্ষণ করা হয়। পরে শিশুটিকে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে যায়।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রূপগঞ্জে ১৯ বছর বয়সী এক যুবক ও ১৫ বছর বয়সী কিশোরীকে অপহরণ করে আটকে রেখে মুক্তিপণ দাবির অভিযোগে চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
নারায়ণগঞ্জে এসব ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিকদল ও নাগরিক সমাজের লোকজনরা।
এরমধ্যে খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব এবিএম সিরাজুল মামুন ও এসব পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানান। তিনি জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু আশ্বাস নয় দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপের কথাও বলেন।
সাম্প্রতিক সময়ে জেলার বিভিন্ন স্থানে খুন, চাঁদাবাজি, দখল ও সন্ত্রাসী ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখা। ২২ অক্টোবর দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত জেলা আমির মো. মাসুদুর রহমান গিয়াস ও সেক্রেটারি মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ যেন আইনের আওতার বাইরে না থাকেন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেন তারা।
এছাড়া নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ, বন্দর, সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লা ও শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন সময়ে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনার পেছনে ব্যক্তিগত বিরোধ, পূর্বশত্রুতা, জমি ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, পাওনা টাকা কিংবা রাজনৈতিক বিরোধের মতো কারণ উঠে এসেছে। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় অপরাধ দমন ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠছে।
অন্যদিকে অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ। এতে গ্রেফতার হচ্ছে অপরাধের সাথে জড়িত থাকা ব্যক্তিরা।
