একদিকে বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে অপরদিকে মাঠ ঘাট ডুবে যাওয়ায় পশুর খাবার বিছালী খড়ও নষ্ট হয়েছে।
বন্যায় কুষ্টিয়ার এক তৃতীয়াংশ মাঠ-ঘাট ডুবে যায়। বন্যার ঝুঁকি সামাল দিতে না দিতেই গরু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন গরু খামারীরা। একদিকে বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে অপরদিকে মাঠ ঘাট ডুবে যাওয়ায় পশুর খাবার বিছালী খড়ও নষ্ট হয়েছে। এতে গরুর খামারীরা চরম গোখাদ্যের সংকটে ভুগছে। ঠিক সেই মুহুর্তে গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছে জেলার গো-খামারীরা।
জানা যায়, কুষ্টিয়া জেলায় মোট ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩শ' ৪২ হেক্টর জমি রয়েছে। এর মধ্যে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ১ লাখ ২১ হাজার ২০০শ' হেক্টর। চলতি মওসুমে পাট চাষ করা হয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার হেক্টর জমিতে, সবজি চাষ করা হচ্ছে সাড়ে ৫ হাজার হেক্টর। ইতিমধ্যেই আমন চাষ করা হচ্ছে ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে। অন্যান্য ফসলের আবাদও চলছে পুরোদমে। ফলে জেলায় পতিত জমি ও গোচারণভূমির দারুণ অভাব দেখা দিয়েছে। পশু চরানোর জায়গা না থাকা ও মাঠে ঘাস না পাওয়ায় চরম সংকট দেখা দিয়েছে গো-খাদ্যের।
প্রাণী সম্পদ অফিস সুত্রে জানা গেছে, জেলার দেড় হাজার পশু খামারীদের মধ্যে প্রায় ১০০০ খামারী মাঠে খোলামেলা গরু ছাগল চরিয়ে থাকে। কিন্তু আবাদযোগ্যসহ অন্যান্য জমিতে ফসল আবাদ করায় গো-চারণ ভূমির অভাবে গো-খাদ্যের সংকটে চাষীরা পশু নিয়ে পড়েছে মহা-বিপদে।
তথ্যসুত্রে জানা গেছে, কুষ্টিয়া জেলায় প্রতি মওসুমে ফসল থেকে গরুর যে খাদ্য উৎপাদন হয় তা জেলার পশুর জন্য ২ মাসের খাদ্য হয়ে থাকে। কিন্তু এ জেলায় ব্যাপক আকারে তামাক চাষ হওয়ায় গরুর খড় বা বিচালী তামাক চাষীরা কিনে দেদারছে পুড়িয়ে থাকে। এতে জেলায় গো-খাদ্যের ২ মাসের খাবার এক মাসও চলে না। খড়ের অভাব পূরণে এ সময় খামারীরা মাঠে চরিয়ে গৃহপালিত পশুর খাবারের চাহিদা মেটায়। উদ্বৃত্ত ও পতিত জমি না থাকায় গৃহস্থরা অনেকেই পশু খাদ্যের সংকটে পশু বিক্রি করে দিচ্ছে। বিক্রি করতে গিয়েও খামারীরা পড়ছে বিড়ম্বনায়।
এদিকে অনেক কৃষকরা জানান, তাদের যে গরু রয়েছে কিন্তু, গো-খাদ্যের চরম সংকটে গরুগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। তারা সদরের আইলচারা হাটে এসেছিলেন কিছু ধানের খড় কেনার জন্য। কিন্তু, দাম শুনে কপালে হাত! তারপরও বাধ্য হয়ে চড়া দামে খড় কিনতে হয়েছে।
দেখা যায়, কৃষকরা পচে যাওয়া ধান ও খড় শুকিয়ে কোনোভাবে সংরক্ষণের চেষ্টা করছেন। কিন্তু অধিকাংশ খড় পানিতে পচে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তা গবাদিপশুর খাবার হিসেবে ব্যবহার করা নিয়েও সংশয়ে রয়েছেন তারা। ফলে বছরের বাকি সময় গরুকে কী খাওয়াবেন, সেই দুশ্চিন্তায় অনেকে আগেভাগেই গরু বিক্রি করছেন।
বর্তমানে জেলায় পশু খাদ্য সংকটসহ গো-চারনভূমি না থাকায় পশু পালনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। খামারীরা চড়া দামে বিচালী কিনে পশুকে খাওয়াচ্ছেন। অনেকেই লতা পাতা খাইয়ে পশুকে বাঁচিয়ে রাখছেন। গো খাদ্যের সংকটে এক শ্রেণীর মানুষ মাঠের বিভিন্ন ধরনের ঘাস কেটে বাজারে বিক্রি করছে। চলতি মৌসুমের ধান না কাটা পর্যন্ত গো-খাদ্যের সংকট যাবে না বলে জেলার পশু খামারীরা জানিয়েছেন।
অপরদিকে, এ গোখাদ্য সংকট নিরসনে হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে ঘাস চাষ শুরু হয়েছে।
মাটি ছাড়া মাচায় ঘাস চাষ করা হচ্ছে।
‘এ পদ্ধতিতে ঘাষ চাষ করে কৃষকরা গো-খাদ্যের সংকট উত্তরণ করতে পারবেন এবং অবশ্যই তারা লাভাবান হবেন। এ পদ্ধতিতে একজন কৃষক সাড়ে চার থেকে পাঁচ টাকা খরচ করে এক কেজি ঘাস উৎপন্ন করতে পারবেন। এ পদ্ধতিতে উৎপাদিত ঘাস পুষ্টিগুণ-সম্পন্ন এবং এ ঘাস খাওয়ালে গাভী ১২-১৫ শতাংশ বেশি দুধ দিতে সক্ষম হবে।’
‘প্রতি এক কেজি ভুট্টা বীজ থেকে ৬-৭ কেজি ঘাস উৎপন্ন হচ্ছে। স্বল্প জায়গায় মাচা তৈরি করে চারটি তাকের মাধ্যমে আট দিনের মধ্যে এ ঘাস উৎপন্ন হয়ে থাকে। এ পদ্ধতিতে প্রতিটি ঘাস ৬-৮ ইঞ্চি লম্বা হয়ে থাকে। প্রথম দুই দিন দিতে হয় পানির স্প্রে। আর বাকি ছয় দিন দিতে হয় প্লান্ট নিউট্রিয়ান্ট-এ এবং প্লান্ট নিউট্রিয়ান্ট-বি ভিটামিন স্প্রে।
এগুলোর ব্যাপারে কৃষি বিভাগ গরু খামারিদের উদ্বুদ্ধ করছেন বলে জানা গেছে।
