স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার টেন্ডার আহ্বান করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। একই সঙ্গে দেশে পাঁচটি রোবটিক সার্জারি মেশিন আনা হচ্ছে বলেও জানান।
ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য রেডিওথেরাপি মেশিন সরবরাহ, পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ এবং উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন মন্ত্রী। শনিবার (২৪ অক্টোবর) ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব তথ্য জানান।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা দূর করে জনগণের কাছে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে সরকার কাজ করছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা একদিনে বা এক মাসে দূর করা সম্ভব নয়।
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি টেন্ডার আহ্বান করা হবে। এ ছাড়া পাঁচটি রোবটিক সার্জারি মেশিন আনা হচ্ছে। ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য রেডিওথেরাপি মেশিন সরবরাহের পরিকল্পনাও রয়েছে।
হাসপাতালের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে কাজ চলছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর অতিরিক্ত চাপের কথা স্বীকার করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, জনসংখ্যার তুলনায় দেশে চিকিৎসকের সংখ্যা কম। একজন চিকিৎসক যেখানে ৫০ জন রোগী দেখতে পারেন, সেখানে তাকে ২৫০ থেকে ৩০০ রোগী দেখতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, একটা মৃত্যুর জন্য আমাদের সবারই মন কাঁদে।
কিন্তু আমাদের ১৮ কোটি মানুষের জন্য ডাক্তার আছে কতজন? একজন ডাক্তার ৫০ জন রোগী দেখতে পারেন, সেখানে ২৫০-৩০০ রোগী দেখতে হয়। হাঁপিয়ে যান, তখন মাথার মেধা কাজ করে না।
চিকিৎসকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ থাকলেও তাদের দায়িত্ব পালনে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, চিকিৎসাসেবায় কোনো ধরনের গাফিলতি থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে। চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনে অনিয়মের বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি জানান, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরিদর্শনের সময় কয়েকজন চিকিৎসককে অনুপস্থিত পাওয়া গেছে। তাদের রোস্টার তালিকা সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। অনুপস্থিত চিকিৎসকদের বিষয়ে যাচাই করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে নতুন ক্লিনিক স্থাপন করা যাবে না বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে বেসরকারি ক্লিনিকগুলো নিয়ম অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, বেসরকারি ক্লিনিকগুলোকে নির্ধারিত শর্ত মেনে পরিচালিত হতে হবে। কোনো ক্লিনিকে লেবার রুম না থাকলে রোগীর চিকিৎসায় অব্যবস্থাপনা হলে কিংবা যথাযথ সেবা না দেয়ার কারণে রোগীর মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। যদি কমপ্লায়েন্স না করে কন্ডিশন অনুযায়ী ওগুলো বন্ধ করে দেয়া হবে। যদি লেবার রুম না থাকে বা রোগীর কোনো অব্যবস্থাপনা হয়, রোগীরা বিনা কেয়ারে যদি মারা যান, আমরা এগুলো সব বন্ধ করে দেব এবং ব্যবস্থা নেব।
এর আগে সকালে ফুলপুর ও তারাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পরিদর্শনে ফুলপুর হাসপাতালে কিছু অব্যবস্থাপনা ও ময়লা-আবর্জনা দেখতে পান তিনি। বাথরুম সংস্কার ও পরিষ্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।
ফুলপুর হাসপাতালে কিছু অব্যবস্থাপনা রয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, হাসপাতালের বাথরুমগুলো আগামী দুই দিনের মধ্যে ঠিক করে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বলা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ফুলপুর ও তারাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে ডায়ালাইসিস, ফিজিওথেরাপি, মাতৃসেবা ও শিশুদের জন্য আলাদা শয্যার ব্যবস্থা করা হবে। এসব হাসপাতালের উন্নয়ন হলে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর রোগীর চাপ কমবে।
স্বাভাবিক প্রসবের হার বাড়াতে ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য খাতে পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের পাশাপাশি নার্স নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। মিডওয়াইফ নিয়োগের মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রসব বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের জন্য পুরনো কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে ফ্যামিলি ওয়েলবিং সেন্টারে রূপান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ সময় ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন তালুকদার, জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাকির হোসেন, উপপরিচালক (পরিচালকের দায়িত্বপ্রাপ্ত) ডা. মো. জাকীউল ইসলামসহ হাসপাতালের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
