আজকাল ওয়েবডেস্ক: কয়েক দশক ধরে সমষ্টিগত অর্থনীতি (Macroeconomics) বিশ্বকে দেখত অনেকটা আকাশ থেকে পাখির চোখের মতো। অর্থনীতিবিদরা জাতীয় মুদ্রাস্ফীতি, মোট বেকারত্ব এবং মোট অভ্যন্তরীন উৎপাদনের (GDP) মতো বিশাল সব সূচককে এমনভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন, যেন অর্থনীতি হল একটা বিরাট কোনও যন্ত্র যা কয়েকটি নির্দিষ্ট গাণিতিক সমীকরণের ওপর ভর করে চলে। মনে করা হতো, এখানে কোনও নীতিকে প্রভাবিত করলে উল্টোদিকের সামগ্রিক পরিসংখ্যানে ঠিক তেমনই একটি প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে।
তবে এই পুরনো ভাবনার একটি মারাত্মক গোড়ামি ছিল: এটা অর্থনীতিকে মানুষের বাস্তব একটি নেটওয়ার্ক হিসেবে না দেখে, কেবল কতগুলো নিষ্ক্রিয় সংখ্যার সমষ্টি হিসেবে বিবেচনা করত। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রবার্ট ই. হল এবং কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইকেল উডফোর্ডের যুগান্তকারী গবেষণা এই দৃশ্যপটকে পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে। তাঁদের তত্ত্ব সমষ্টিগত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পেছনে ব্যক্তিগত পর্যায়ের সিদ্ধান্তের যোগসূত্র তৈরি করে (microeconomic foundations of macroeconomic stabilization), যার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁরা ২০২৬ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেলেন।
তাঁরা ঠিক কী করেছিলেন তা বুঝতে আকাশে উড়ে চলা এক ঝাঁক পাখির কথা ভাবা যেতে পারে। পুরোনো সমষ্টিগত অর্থনীতি শুধু পুরো পাখির ঝাঁকটির আকার, গতি আর চলার পথ লক্ষ করত। হল এবং উডফোর্ড তাঁদের দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন প্রতিটি আলাদা আলাদা পাখির ওপর। তাঁরা যুক্তি দিলেন, একটি পাখি কখন ডানা ঝাপটায়, কীভাবে বাঁক নেয় বা পাশের সঙ্গীর গতিবিধি দেখে কী প্রতিক্রিয়া দেখায় তা বুঝতে না পারলে পুরো ঝাঁকের গতিবিধি বোঝা কিংবা তাকে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। অর্থনীতির দুনিয়ায় এই একক পাখিগুলো হল সাধারণ পরিবার যারা সিদ্ধান্ত নেয় ভবিষ্যতের কঠিন সময়ের জন্য কতটা সঞ্চয় করবে, আর স্থানীয় ছোট ব্যবসায়ী, যারা ঠিক করে নিজেদের পণ্যের দাম কত রাখবে। একেবারে তৃণমূল স্তরের এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সিদ্ধান্তগুলোকে ভিত্তি ধরে সমষ্টিগত অর্থনৈতিক মডেল তৈরি করে তাঁরা বাস্তব অর্থনীতিকে বোঝার অনেক বেশি নিখুঁত এক রূপরেখা তুলে ধরেন, যা আধুনিক 'নয়া কেইনসিয়ান' অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
এই তত্ত্বের একটি মূল স্তম্ভ হল যে, মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রত্যাশা ও দূরদর্শী আচরণ কীভাবে আজকের অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। ধরা যাক, পাড়ার একটি কফি শপের মালিক তাঁর কফির দাম নির্ধারণ করবেন। পুরনো অর্থনৈতিক ধারণা অনুযায়ী, তিনি হয়তো কেবল বিগত বছরের খরচের দিকে তাকাতেন। কিন্তু হল ও উডফোর্ডের গবেষণা দেখায় যে মানুষ গভীরভাবে ভবিষ্যৎমুখী। সেই কফি বিক্রেতা যদি জানতে পারেন আগামী বছর পণ্য সরবরাহে বড় সংকট তৈরি হতে পারে, কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি বাড়তে দেবে তবে তিনি নিজের ব্যবসা সুরক্ষিত রাখতে আজই কফির দাম বাড়িয়ে দেবেন। কোটি কোটি মানুষ যখন ভবিষ্যতের প্রত্যাশার ওপর ভিত্তি করে বর্তমানের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সেই প্রত্যাশাগুলো খুব দ্রুত বাস্তব রূপ নেয় (self-fulfilling prophecies)।
ঠিক এই জায়গাতেই কাজে আসে সমষ্টিগত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষমতা, বিশেষ করে 'ফরওয়ার্ড গাইডেন্স' (Forward Guidance) বা আগাম নীতি-বার্তা নামের একটা কৌশলের মাধ্যমে। এই কাঠামোটি গড়ে ওঠার আগে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ বা ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো নিয়ন্ত্রকারী সংস্থাগুলো অনেকটা গোপনীয়তার মধ্যে কাজ করত, হঠাৎ সুদের হার বদলে দিয়ে বাজারকে অন্ধকারে রাখত পরবর্তী পদক্ষেপ আন্দাজ করার জন্য। উডফোর্ডের কাজ যেটা করল তা হল যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র কেবল আজকের নির্ধারিত সুদের হার নয়, বরং আগামীকাল তারা কী করতে চলেছে তা নিয়ে মানুষের ধারণাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা।
প্রথম বাড়ি কিনতে চাওয়া কোনও তরুণ দম্পতির কথা ভাবা যেতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি স্বল্প মেয়াদের জন্য মাত্র কয়েক সপ্তাহের সুদের হার কমায়, তবে সেই দম্পতি হয়তো ত্রিশ বছরের জন্য দীর্ঘমেয়াদী গৃহঋণ নিতে দু'বার ভাববে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি আগাম বার্তার মাধ্যমে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, "চাকরির বাজারকে চাঙা রাখতে আমরা আগামী তিন বছর সুদের হার প্রায় শূন্যের কাছাকাছি রাখব", তখন পরিস্থিতি দম্পতির ভাবনা পুরোপুরি বদলে যাবে। হঠাৎ করেই সেই পরিবার ঋণ নেওয়ার সাহস পাবে, ব্যাংক ঋণ দিতে রাজি হবে এবং নির্মাণ সংস্থা বাড়ি তৈরির জন্য নতুন শ্রমিক নিয়োগ করবে। ভবিষ্যতের নীতি স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সফলভাবে একটি পরিবারের ছোট ছোট সিদ্ধান্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়, যা সামগ্রিকভাবে গোটা অর্থনীতিকে মন্দা থেকে টেনে তুলবে। হল এবং উডফোর্ড এই নীতিগুলোর মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের ওঠানামার তীব্র ধাক্কা সামলানোর এক শক্তিশালী তাত্ত্বিক ভিত্তি হাজির করেছেন।
