পুজোর পরই আনুষ্ঠানিক ভাবে ভোটের বাদ্যি বেজে যাবে কলকাতায়। নির্বাচন হবে কলকাতার নতুন পুরবোর্ড গঠনের জন্য। সেই নির্বাচনে প্রার্থী খোঁজার অভিযান দেবীপক্ষের প্রথম দিনে শুরু করল বিজেপি। কলকাতা পুরসভার নির্বাচনে কোন ‘সঙ্কল্প’ সামনে রেখে বিজেপি লড়বে, সাংবাদিক বৈঠক ডেকে তা-ও ঘোষণা করা হল। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা দলের হয়ে কলকাতার ভোট সামলানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা সুকান্ত মজুমদার রবিবার আনুষ্ঠানিক ভাবে উন্মোচন করলেন একটি ‘ড্রপ বক্স’, যেখানে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছাপত্র জমা দিতে পারবেন যে কেউ। ভোটের আগে যুবসমাজকে সঙ্গে নিয়ে প্রত্যেক ওয়ার্ডে বিশেষ জনসংযোগ কর্মসূচিও ঘোষণা করলেন তিনি।
কলকাতার নির্বাচন ব্যবস্থাপনার জন্য যে ‘টিম’ বিজেপি গড়েছে, তাতে সুকান্তের সঙ্গে রয়েছেন রাজ্য বিজেপির অন্যতম সহ-সভাপতি রাজু বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী তথা মানিকতলার বিধায়ক তাপস রায় এবং কাশীপুর-বেলগাছিয়ার বিধায়ক রীতেশে তিওয়ারি। তাঁরা প্রত্যেকেই রবিবারের সাংবাদিক বৈঠকে হাজির ছিলেন। সুকান্ত বলেন, ‘‘কলকাতা তার ঐতিহ্যবাহী মর্যাদা ও গৌরব ফিরে পাক, দেশের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধুনিক মহানগর হিসাবে নিজের স্থানকে দৃঢ় করুক, এই লক্ষ্য সামনে রেখে বিজেপি কলকাতার পুনর্নির্মাণ করতে চায়।’’ বাম জমানায় ‘ভ্রান্ত আর্থিক নীতি’র কারণে কলকাতার অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থানের বাজার ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল বলে সুকান্ত অভিযোগ করেন। তৃণমূলকে বাম ‘অপশাসন’-এর ‘সুযোগ্য উত্তরসূরি’ হিসাবে বর্ণনা করে সুকান্তের দাবি করেন যে, গত ১৫ বছরে সিন্ডিকেট এবং দুর্নীতি কলকাতাকে আরও বেহাল করে দিয়েছে। বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতির কথায়, ‘‘আমাদের লক্ষ্য হল কলকাতার ইতিবাচক পরিবর্তন ও সামগ্রিক পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎমুখী রূপরেখাকে বাস্তবায়িত করা।’’ নতুন সরকার পাঁচ মাসেই কলকাতায় সিন্ডিকেট-রাজ বন্ধ করে দিয়েছে বলে সুকান্ত মন্তব্য করেন। তার সঙ্গে এ-ও বলেন যে, ‘‘যদি কোথাও বিচ্ছিন্ন ভাবেও সিন্ডিকেট-রাজের খবর পান, আমাদের জানান। আমরা তা-ও বন্ধ করব।’’ আপাতত কলকাতার বেহাল রাস্তাঘাট সারিয়ে তোলার উপরেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়ে সুকান্ত বলেন, ‘‘মহালয়ার মধ্যেই সব বেহাল রাস্তা সারিয়ে ফেলা হবে বলে আমরা ঠিক করেছিলাম। কিন্তু তা করে ওঠা যায়নি। তবে তৃতীয়ার মধ্যে কলকাতায় সব বেহাল রাস্তা সারানোর কাজ হয়ে যাবে।’’
কলকাতার মহানগরের ‘পুনর্নির্মাণ’-এর যে লক্ষ্য ঘোষণা করে বিজেপি ভোটের ময়দানে নামছে, সে লক্ষ্যপূরণে বিজেপির বৃত্তের বাইরে থাকা নাগরিকদেরও অংশগ্রহণের আহ্বান জানান সুকান্ত। সে প্রসঙ্গেই প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছাপত্র গ্রহণ করতে ‘ড্রপবক্স’ চালুর কথা তিনি আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করেন। সুকান্ত বলেন, ‘‘প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য কেন্দ্রীয় ভাবে ৬ নম্বর মুরলীধর সেন লেনের দফতরে একটি ড্রপ বক্স রাখা হবে। সমস্ত স্তরের মানুষ, যাঁরা প্রার্থী হতে ইচ্ছুক, তাঁরা এই ড্রপবক্সে নিজেদের বায়োডাটা জমা দিতে পারবেন।’’ সুকান্ত জানিয়েছেন যে, বিজেপি কর্মীরা তো বটেই, যাঁরা কর্মী নন, তাঁরাও বায়োডাটা জমা দিতে পারবেন। সুকান্তের কথায়, ‘‘হতে পারেন, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল বা সমাজসেবী, তাঁদের বলছি, দূরে দাঁড়িয়ে বা গ্যলারিতে বসে নয়, মাঠে নেমে খেলুন। আপনাদের বিজেপি সুযোগ দিচ্ছে। আপনারা এসে ড্রপবক্সে আপনাদের ভোটে দাঁড়ানোর ইচ্ছার কথা আমাদের জানান। আমরা চাই একটি স্বচ্ছ কলকাতা পুরনিগম তৈরি করতে, যে পুরনিগম কোনও প্রোমোটার বা ডেভেলপারেরা চালাবে না।’’
বিজেপির এই নির্বাচনী অভিযানে যুবসমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন সুকান্ত। শুধু আহ্বান জানিয়েই যে বিজেপি ক্ষান্ত হচ্ছে না, এ বারের ভোট অভিযানে যুবসমাজকে জুড়ে নেওয়ার জন্য বিজেপির যে বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে, তা-ও সুকান্ত স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘বিজেপি প্রত্যেকটি ওয়ার্ডের মানুষের কাছে পৌঁছোবে, তাঁদের সমস্যাগুলি বুঝবে এবং সেগুলির সমাধানের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরবে।’’ তার পরেই বলেন, ‘‘আমরা যুবসমাজকে এর সঙ্গে যুক্ত করব। যুবসমাজ শুধু দর্শক হয়ে বা ভোটার হয়ে থাকবে না। তাঁদের সঙ্গে আমরা আলাপ-আলোচনা করব, যাতে কলকাতার উন্নয়নে তাঁদের অবদান থাকে।’’ যুবসমাজের সঙ্গে বিজেপি ‘ওয়ার্ডভিত্তিক আলোচনাসভা’ আয়োজন করবে বলে সুকান্ত জানিয়েছেন। অনেক মনে করছেন, কলকাতার উন্নয়নের রূপরেখা সংক্রান্ত আলোচনায় আলাদা করে যুবসমাজের মতামত নেওয়ার উপরে জোর দিয়ে বিজেপি প্রথমত বিরোধীদের তৈরি করা ‘জেন জ়ি’ ভাষ্যকে ধাক্কা দিতে চাইছে। দ্বিতীয়ত, যুবসমাজকে বেশি করে ভোট-অভিযানে টেনে এনে বিজেপি প্রচারে এবং ভোটগ্রহণের দিনে দাপট বহাল রাখার কৌশল নিতে চাইছে।
তবে এই তত্ত্ব সুকান্ত নিজে নস্যাৎ করেছেন। তাঁর দাবি, যুব সমাজকে গুরুত্ব দেওয়া বিজেপির রাজনীতিতে নতুন নয়। তিনি সে প্রসঙ্গে নিজের সভাপতিত্বের উদাহরণ টেনে আনেন। সুকান্ত বলেন, ‘‘তরুণ প্রজন্মকে বিজেপি সবসময় গুরুত্ব দেয়। না হলে অচেনা, অজানা সুকান্ত মজুমদারকে কে রাজ্য সভাপতি করত!’’ সুকান্তের কথায়, ‘‘আমাকে যখন দল রাজ্য সভাপতি করেছিল, আমার তখন ৪০ বছরের আশেপাশে বয়স। রাজনীতিতে এই বয়সকে তরুণই তো বলা হয়, নাকি?’’
কলকাতার পুরভোটে বিজেপির ‘সঙ্কল্পপত্র’ কেমন হতে চলেছে, রবিবার বিজেপি সে আভাসও দিয়েছে। সুকান্ত বলেছেন, ‘‘কলকাতায় আমাদের যে বোর্ড তৈরি হবে, সেই বোর্ড রাজ্য সরকার ও পুর প্রশাসনের যৌথ সমন্বয়ে একটি দায়বদ্ধ প্রশাসন গড়ে তুলবে।’’ রাস্তাঘাট, গণপরিবহণ, নিকাশি এবং পানীয় জলের সমস্যা সমাধানে অগ্রাধিকার দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে সুকান্ত বলেন, ‘‘শহরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী অঞ্চলগুলির স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ রেখে আমরা সেখানে পরিকাঠামোর উন্নয়ন ঘটাব।’’ বিজেপির ভোট ইনচার্জের আহ্বান, ‘‘২০৯টি ওয়ার্ডের সকল স্তরের মানুষ, যাঁরা কলকাতার এই পুনর্নির্মাণে যোগ দিতে চান, তাঁদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আসুন, দূর থেকে নয়, মাঠে নেমে মুখ দেখিয়ে খেলুন, পিচ আপনাদের জন্য প্রস্তুত।’’
কলকাতা পুরসভার নির্বাচনে বিজেপি যে একাই লড়বে, কারও সঙ্গে জোট গড়ে নয়, সে কথা সুকান্ত রবিবার ফের জোর দিয়ে বলেছেন। এনসিপিআই-এর তরফ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, কলকাতার পুরভোটে তারা বিজেপির জোটসঙ্গী হিসেবে লড়বে। কিন্তু সে সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে সুকান্ত রবিবার বলেন, ‘‘কলকাতার ২০৯টি ওয়ার্ডেই বিজেপি প্রার্থীরা লড়বেন, পদ্ম প্রতীকে লড়বেন। অন্য কোনও দলের সঙ্গে কোনও জোট বা আসন সমঝোতায় বিজেপি যাচ্ছে না।’’
