Published on
:
3 min read
সৈকত সরকার
প্রাথমিক ভাবে, সর্বজনীন দুর্গাপুজোর শুরুটা হয়েছিল একত্রে উৎসব পালনের উদ্দেশ্যে। কোনও ব্যক্তির একক উদ্যোগের পরিবর্তে তা ক্রমে হয়ে উঠেছিল সমষ্টির। ধনী ব্যক্তির অঙ্গন ছেড়ে তা নেমে এসেছিল পথে, জনতার দরবারে। বাঁশ-কাপড়ের প্যাণ্ডেল থেকে ক্রমে জন্ম নিয়েছে শিল্পভাবনাজাত ‘বিষয়’-নির্ভর পুজো। গত কয়েক দশকে কলকাতার দুর্গাপুজোর এই বদল বেশ চোখে পড়ার মতো। ২০০১ সালে বোসপুকুর শীতলা মন্দিরে ভাঁড়ের মণ্ডপ বানিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন শিল্পী বন্দন রাহা। কোনও নির্দিষ্ট উপাদান নিয়ে এমন কাজ সে যুগে বেশ সাড়া ফেলেছিল। এর পর তো পাড়ায় পাড়ায় থার্মোকলের গ্লাস থেকে শুরু করে মশা মারার ধূপ, কিছুই বাদ পড়েনি। পরে সেই উপকরণ-ভিত্তিক কাজের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিষয়ভিত্তিক কাজ শুরু হয়েছে কলকাতায়। থিমের সেই আদি যুগ থেকে অমর সরকার, রণো ব্যানার্জি প্রমুখের নাম দুর্গাপুজোর জগতে মুখে মুখে ফেরে। ‘এশিয়ান পেইন্টস শারদ সম্মান’-এর মতো বেশ কিছু পুরস্কার এই শিল্পের উদ্যাপনকে আরও স্বতঃস্ফূর্ত করেছে। শিল্পীদের ভাবনার রসে জারিত হয়ে, ক্লাব কমকর্তাদের উদয়াস্ত পরিশ্রমের ফলে যা গড়ে ওঠে, তা শুধু পুজোর নয়, তা শিল্প-উদ্যাপনের এক অনবদ্য নজির। আমার দুর্গাপুজোকে দেখার শুরুটাও সেই শিল্পরসিকের চোখ দিয়ে।
কোনও আর্ট গ্যালারিতে চিত্র-প্রদর্শনী হলে, তার রসগ্রহণের জন্য যেমন সহৃদয়-রসিক দর্শকের প্রয়োজন হয়, কলকাতার দুর্গোৎসবও খানিকটা তেমন। তবে এ দুয়ের মধ্যে পার্থক্য এটুকুই যে দুর্গাপুজোর পরিসর আরও বিস্তৃত, তার দর্শনার্থীও নানাবিধ। তবে সকলেই যে ‘সহৃদয়-রসিক’ হবেন, এমন নয়। বরং, সাধারণ মানুষের চোখ দিয়ে সেই শিল্পকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করার এক পরিসর গড়ে ওঠে দুর্গাপুজোয়।
এ বার ফিরি চলতি দশকের কথায়৷ অতিমারী পর্ব পেরিয়ে দুর্গাপুজোরও বাঁকবদল ঘটেছে অনেকখানি৷ বদলেছে তার আঙ্গিক। স্থির, অচল মণ্ডপে ‘কাইনেটিক্স’-এর সফল প্রয়োগ ঘটিয়েছেন শিল্পীরা। ২০২১ সালের ‘অর্জুনপুর আমরা সবাই ক্লাব’। দুর্গাপ্রতিমার সামনে রয়েছে কাঠের সিংহাসন। এবং তা প্রায় মানুষের মতোই নতজানু হয়ে প্রণাম জানাচ্ছে দর্শনার্থীদের। নেপথ্যে শোনা যাচ্ছে সেই গান— ‘ভগবান আজ পথের ধূলায় আম জনতার দরবারে/ নতজানু তাই রাজার আসন মানবতাকেই গড় করে।’ ভক্ত আর ভগবানের দূরত্ব কমে এসেছে এখানে। শিল্পী ভবতোষ সুতার থিমের নাম রেখেছিলেন ‘সমর্পণ’।
এই ক্লাবেরই আর একটি কাজ ‘স্ব-কাল’। মেহনতি মানুষেরা তাঁদের দৈনন্দিন শ্রমের মাধ্যমে প্রতি দিন সকালে সূর্যকে ঘুম থেকে টেনে তুলছেন। সমগ্র মণ্ডপের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন ‘পারফরম্যান্স’, মেহনতি মানুষের নানা প্রতীকী ক্রিয়াকলাপ। প্রতিটি ‘পারফরম্যান্স’ সময়গত একটি সূত্রে গ্রথিত। দর্শনার্থীরা এখানে শুধু আর প্রতিমা দর্শন করেন না। বরং, এক বৃহৎ শিল্প-পরিসরে ‘অর্গ্যানিক থিয়েটার’-এর কিয়দংশকেও প্রত্যক্ষ করেন৷
এরও বেশ কয়েক বছর আগে নাকতলা উদয়ন সংঘে শিল্পী সুশান্ত পাল ‘সময়’-কে ধরতে চেয়েছিলেন ভিন্ন আঙ্গিকে। এক বৃত্তাকার প্ল্যাটফর্মের কেন্দ্রে রয়েছেন সপরিবারে দেবী দুর্গা। আর তাঁকে ঘিরে ওপরে বৃত্তাকারে প্রদক্ষিণ করছে একদল মানুষ। সময়চক্র বা কালচক্রকে এই ‘পারফরম্যান্স’ সফল ভাবে পৌঁছে দিতে চেয়েছিল মানুষের কাছে। আলিপুর সর্বজনীনের মণ্ডপে শিল্পী অনির্বাণ দাসের ভাবনায় স্থান পেয়েছিল যাত্রা-শিল্পীদের কথা। যাত্রার রঙ্গমঞ্চ যেন প্রাণ পেয়েছিল যাত্রার কুশীলবদের ‘লাইভ পারফরম্যান্স’-এ।
দুর্গাপুজোয় ‘আর্ট-কলেজ’ আর ‘নন-আর্ট-কলেজ’, এই তরজাও দীর্ঘ দিনের। একদল শিল্পী সরকারি বা বেসরকারি চারুকলা মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষালাভের পর দুর্গাপুজোর কাজে এসেছেন। আর অন্য দল হলেন তাঁরা, যাঁরা ‘স্ব-শিক্ষিত’, অর্থাৎ কোনও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না নিয়ে নিজস্ব শিল্পচর্চার পরিসর গড়ে তুলেছেন। তবে, এ দুয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে যাওয়া অনর্থক। কারণ, শেষ পর্যন্ত উভয়েই মাঠে নামছেন তাঁর পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করতে। তাঁর পরিকল্পনা, লোকবল, বাস্তব অভিজ্ঞতাই এখানে শেষ কথা বলে।
শিল্পী গৌরাঙ্গ কুইলার নাম কলকাতার দুর্গাপুজোর জগতে সুপরিচিত। ‘থিম’-এর আতিশয্যে নয়, বরং উৎসবের আমেজেই রঙিন হয়ে ওঠে তাঁর কাজগুলি। ত্রিধারা সম্মিলনী থেকে সুরুচি সংঘ, দীর্ঘ দিন তাঁর শিল্পকর্মে সেজে উঠেছে। তাঁর সঙ্গে এই কর্মযজ্ঞে সামিল হয় প্রায় গোটা একটা গ্রাম। গ্রামবাংলার অনামা লোকশিল্পীরা এ ভাবেই জুড়ে থাকেন কলকাতার দুর্গাপুজোর সঙ্গে। আর অনির্বাণ দাস তো নিজেকে শিল্পী বলার পরিবর্তে ‘প্যান্ডেলওয়ালা’ বলতেই বেশি স্বচ্ছন্দ। ‘দুর্গা’ই তাঁর জীবনের অন্তর্গত প্রেরণা, তা-ই নিজের মেয়ের মতো দুর্গাকে সাজিয়ে তোলেন তিনি। প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পচর্চার সঙ্গে যুক্ত না থেকেও বিশ্বনাথ দে, বিমল সামন্ত, সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, মলয়-শুভময় তাঁদের কাজ দিয়ে চমৎকৃত করে চলেছেন।
শিল্পী পার্থ দাশগুপ্ত দীর্ঘ দিন ধরেই প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পচর্চার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর কাজের মধ্যে শিল্পের সেই পরিশীলিত রূপ যেমন রয়েছে, তেমনই আছে শিল্পকে সাধারণের সঙ্গে জুড়ে নেওয়ার প্রয়াস। ঠাকুরপুকুর এস-বি-পার্কে তাঁরই নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল লোকশিল্পের এক অস্থায়ী সংগ্রহশালা। নাম দিয়েছিলেন ‘লোকশিল্পপ্রবাহ’। টেরাকোটা থেকে মজিলপুরের পুতুল, কী ছিল না সেখানে! শুধু সাজিয়ে তোলার মতো করে নয়, বরং সংগ্রহশালা নির্মাণের দর্শনকে প্রত্যক্ষ করেছিলাম সেই কাজে। আবার, গত বছর পূর্বাচলে তাঁর তত্ত্বাবধানেই নির্মিত হয়েছিল ‘মাঠখোদাই-কাঠখোদাই’ শীর্ষক এক বৃহদাকার প্রদর্শনী। প্রবাদপ্রতিম শিল্পী হরেন দাসের কাজের অনুষঙ্গ যেমন সেখানে ছিল, তেমনই ছিল বিভিন্ন শিল্পীর শিল্পকর্মের এক সম্মিলিত উপস্থাপনা। পার্থ দাশগুপ্ত সেখানে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন ‘কিউরেটর’ হিসেবে। শিল্পী সুশান্ত পাল তাঁর মণ্ডপগুলিতে যে বিশেষ ‘আবহ’ নির্মাণ করেন, তা রীতিমতো দর্শনার্থীদের একটা অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে নিয়ে যায়। কোথাও মহাজাগতিক পরিমণ্ডল, কোথাও আবার স্বপ্নিল কল্পলোক, এ ভাবেই দর্শনার্থীদের এক ভিন্ন পরিসরে নিয়ে যায় তাঁর কাজগুলি।
কলকাতার দুর্গোৎসব এই বিবিধ আঙ্গিককে একই অঙ্গে ধারণ করে আছে। এই উৎসবে যেমন সামিল কুমোরটুলির পরম্পরাগত শিল্পীরা, তেমনই আছেন সুদূর গ্রামবাংলার লোকশিল্পীরাও। তাঁদের পটচিত্রে, গালার পুতুলে, বেতের কাজে যেন এক চলমান অস্থায়ী প্রদর্শনী হয়ে ওঠে কলকাতা শহর৷ চিরচেনা মাঠ, অলিগলি শিল্পের জ্যোৎস্নায় আলোকিত হয়ে ওঠে। আঙ্গিক বদলালেও, সেই শিল্পাঞ্জলিতে ভাঁটা পড়েনি এখনও। সেই শিল্পের টানে এখনও সেই কলকাতার পথে-প্রান্তরে হেঁটে চলি।
