সারকথা
বিশ্বায়ন ও গণমাধ্যমের ধারাবাহিকতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার এবং তার সাংস্কৃতিক প্রভাব নিয়ে এই প্রবন্ধ। ম্যাকলুহানের বিশ্বগ্রাম, শিলারের সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ, রবার্টসনের গ্লোকালাইজেশন, আপ্পাদুরাইয়ের বৈশ্বিক প্রবাহ ও উপাত্ত উপনিবেশের ধারণার আলোকে লেখক দেখিয়েছেন, এআই শুধু তথ্য ও সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেয় না; সংস্কৃতিকেই উপাত্ত ও কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে মুনাফার পণ্যে পরিণত করে। এআইয়ের অবকাঠামো, ভাষা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অল্প কয়েকটি রাষ্ট্র ও প্রযুক্তি কোম্পানির হাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে উন্নয়নশীল সমাজ, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং স্বল্প সম্পদসমৃদ্ধ ভাষাগুলো নতুন বৈষম্য ও আধিপত্যের মুখে পড়ছে। ইংরেজিনির্ভর ভাষা মডেল, অদৃশ্য ও স্বল্পমূল্যের শ্রম, অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত এবং এআই গ্রহণকে অনিবার্য হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা এই সংকট আরও বাড়াচ্ছে। তবে স্থানীয় উদ্যোগ, বহুভাষিক উপাত্ত এবং জবাবদিহিমূলক শাসনের মাধ্যমে বিকল্প পথ তৈরি করা সম্ভব। প্রবন্ধটির মূল কথা হলো, এআইকে মানবসংস্কৃতির সহায়ক শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এর উন্নয়ন ও ব্যবহারে ভাষাগত বৈচিত্র্য, ন্যায্য শ্রমনীতি, স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
ভূমিকা
বিশ্বায়ন নিয়ে আলাপ নব্বই বা শূন্য দশকে যতটা হয়েছে, এখন আর ততটা হয় না—যেন এই বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিশ্বায়ন নিয়ে আলাপ বন্ধ করা উচিত নয়, বারবারই ওই আলাপে আমাদের ফিরে যেতে হবে। কারণ, আমাদের আজকের যাপিত জীবন, তা বিশ্বায়নোদ্ভূত এক বাস্তবতাই। আমাদের বারবারই বিশ্বায়নের গোড়ার আলাপে ফিরতে হবে।
বিশ্বায়ন সব সময়ই গণমাধ্যমের মধ্য দিয়ে বিস্তার লাভ করেছে। আমি বলি, গণমাধ্যম একই সঙ্গে বিশ্বায়নের কারণ ও ফল। বৈশ্বিক গণমাধ্যম ছিল বলেই মুক্তবাজারের পণ্য ও সেবার খবর টেলিগ্রাফ থেকে টেলিভিশন, স্যাটেলাইট সম্প্রচার থেকে স্মার্টফোন—সীমান্ত পেরিয়ে তথ্য বহনকারী প্রযুক্তিগুলো একই সঙ্গে সংস্কৃতিকেও বহন করেছে; ফলে মানুষ কী দেখে, কী কেনে, কী বিশ্বাস করে এবং নিজেদের কীভাবে কল্পনা করে, তা প্রভাবিত হয়েছে। অর্জুন আপ্পাদুরাই (১৯৯৬) তাঁর ‘মিডিয়াস্কেপ’ ধারণার মাধ্যমে এই আন্তসম্পর্ক ব্যাখ্যা করেছেন। আপ্পাদুরাই বিশ্বায়নকে বুঝতে পাঁচটি স্কেপ বা প্রবাহের কথা বলেছিলেন—মানুষ (এথনোস্কেপ), প্রযুক্তি (টেকনোস্কেপ), টাকাকড়ি (ফিন্যান্সস্কেপ), গণমাধ্যম (মিডিয়াস্কেপ) ও মতাদর্শ (আইডিওস্কেপ)। বিংশ শতাব্দীতে গণমাধ্যম সংস্কৃতিকে বিশ্বায়িত করেছিল; একবিংশ শতাব্দীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আরও ঘনিষ্ঠভাবে, কিন্তু আরও অসমভাবে সেই বিশ্বায়নকে পুনর্গঠন করেছে। এখন তৃতীয় একটি ঢেউ শুরু হয়েছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত ও ব্যাপক প্রচার ও প্রসার, এআই-উন্মাদনাও বলা যায়।
আগের গণমাধ্যম প্রযুক্তিগুলোর তুলনায় এআই কেবল তথ্য ও সংস্কৃতি বিতরণ করে না, এটি সংস্কৃতির ওপর প্রশিক্ষিত হয়, সংস্কৃতি থেকে মূল্য আহরণ করে এবং সেই সংস্কৃতিকে একটি তথাকথিত নিরপেক্ষ ও সর্বজনীন বুদ্ধিমত্তা হিসেবে আবার প্যাকেজ করে। এআই-উন্মাদনার মধ্যে এআই নিয়ে উদ্বেগও কম নয়।
সম্প্রতি এইআই গবেষণায় চাঞ্চল্যকর ও বিপজ্জনক সব তথ্য পাওয়া গেছে। ২৭ বছর বয়সী গবেষক জ্যাকব কক্সন এআই কোম্পানি অ্যানথ্রোপিক থেকে পদত্যাগ করে যা জানিয়েছেন, তা থেকে এআই নিরাপত্তা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, ওপেনএআই ও অ্যানথ্রোপিক সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সচেতন হয়েও সুপারইন্টেলিজেন্স তৈরির প্রতিযোগিতায় দ্রুত এগোচ্ছে। অ্যানথ্রোপিকের অ্যালাইনমেন্ট গবেষক ইভান হিউবিঙ্গারও স্বীকার করেছেন যে এআইয়ের মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করার ঝুঁকি রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুতগতিতে নিজেদের বুদ্ধিমত্তার স্তর বাড়িয়ে চলেছে। তারা হয়ে উঠবে সুপারইন্টেলিজেন্ট। কক্সনের মতো হুইসেল ব্লোয়াররা বলছেন, সুপারইন্টেলিজেন্সের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা এখনো কোম্পানিগুলোর নেই। প্রায় একই সময়ে ওপেন এআইয়ে এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে। সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক এক পরীক্ষার সময় প্রায় ১ হাজার ২০০টি এআই এজেন্ট একটি অননুমোদিত মেসেজ বোর্ডের মাধ্যমে যোগাযোগ করে এবং নিজেদের মধ্যে ৭০ হাজারের বেশি বার্তা ও ফাইল আদান-প্রদান করে। পরবর্তী সময়ে, প্রায় ৭০০টি এজেন্ট হাগিং ফেসের ওপর সাইবার আক্রমণে অংশ নেয়। (গ্রিনব্ল্যাট ও অন্যান্য ২০২৬) এজেন্টগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল; কিন্তু ওই পরীক্ষার সময় তাদের মধ্যে অননুমোদিত সহযোগিতার ঘটনা ঘটে। হাগিং ফেস হলো মেশিন লার্নিং প্ল্যাটফর্ম ও কমিউনিটি। ঘটনাটি মানুষের কমান্ডের বাইরে, এআইয়ের স্বায়ত্তশাসিত সক্ষমতা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি করেছে ও একে নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতার দিক নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
আশঙ্কা খুব অমূলক নয়। এই হারে বুদ্ধি বাড়তে থাকলে আগামী এক দশকের মধ্যে এআই চাইলে মানবজাতিকে ধ্বংস করে দিতে পারে। বিভিন্ন এইআই কোম্পানির মালিকেরাই বলছেন, এ রকম ঘটার আশঙ্কা শতকরা ১০ শতাংশ। এআই মেশিন থেকে বেরিয়ে এসে রোবট আকারে আক্রমণ করে মানুষ মারবে না, বরং বৈশ্বিক নানান ব্যবস্থাপনা, যেমন আণবিক গবেষণা, বিমান নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ইত্যাদিতে নেতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এ ধরনের ব্যবস্থাপনা বিপর্যস্ত হবে এবং মানুষ মৃত্যুবরণ করতে পারে। ফলে গবেষকেরা আন্তর্জাতিকভাবে এআই উন্নয়নের গতি নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানিয়েছেন। এআইয়ের উন্নয়নের জন্য টেক বিলিয়নিয়াররা বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছেন, যেন তারা সুপারইন্টেলিজেন্ট এআই বানানোতে প্রথম হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা অবতীর্ণ। মার্কিন উদ্যোক্তারা বলছেন, আমরা না করলে, চীন আমাদের আগে করে ফেলবে। একে তুলনা করা যায় স্নায়ুযুদ্ধকালের আণবিক বোমা বানানোর প্রতিযোগিতার সঙ্গে। আণবিক বোমা যেমন হিরোশিমা-নাগাসাকিতে দেখিয়ে দিয়েছিল, মানবজাতির জন্য কতটা ভয়ংকর হতে পারে। তবে আণবিক বোমার বোতাম মানুষের নিয়ন্ত্রণেই ছিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মহাবুদ্ধিমান হয়ে গেলে, তার নিয়ন্ত্রণ মানুষের হাতে থাকবে না, এটাই বেশি আশঙ্কার কথা। এসব ঘটনা ঘটেছে এবং তা নিয়ে বিতর্ক চলেছে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে।
এআইয়ের পেছনে ইতিমধ্যে যারা টেক বিলিয়নিয়ার, তারা প্রায় সবাই বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে, নতুন কিছু খেলোয়াড়ও মাঠে আছে; সুপারইন্টেলিজেন্ট বানানোর এই প্রতিযোগিতা আসলে টেকনির্ভর হয়ে আজকের ব্যবসা–বাণিজ্য যে জায়গায় এসে পৌঁছেছে, তার দায় বা আগ্রহ সাধারণ মানুষের দিক থেকে আসেনি, বরং টেকজগতের নিয়ন্ত্রক বিজ্ঞানী-গবেষকেরাই এদিকে আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন এবং তাঁরা নিয়ে যাচ্ছেন ইলন মাস্কদের নির্দেশনা ও চাহিদামাফিক। এবং বিশ্বায়িত গণমাধ্যম, নেটওয়ার্কনির্ভর সামাজিক মাধ্যম হয়ে এইআই উন্মাদনার তৃতীয় ঢেউটি, মাধ্যমের বিশ্বায়নের ধারাবাহিকতাতেই এসেছে এবং এর মূল উদ্দেশ্য অধিক মুনাফা। অতি বুদ্ধিমান এআই, সফটওয়্যার ও তার পরিচালনাকারী মানুষ—এই দুই সমন্বয় থেকে মানুষকে ছেঁটে ফেলবে। আর মানুষের শ্রমনির্ভর ম্যানুয়েল কাজগুলোও করে দেবে রোবট, যে জন্য এআইয়ের মতোই রোবোটিকসেও ব্যাপক বিনিয়োগ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও মানুষের প্রয়োজন কমে আসবে। অ্যামাজনের গুদামগুলোয় ইতিমধ্যেই রোবট ও মানুষের সংখ্যা প্রায় সমান হয়ে গেছে, নিকট ভবিষ্যতে তারা মানুষকে ছাড়িয়ে যাবে। এসবই হচ্ছে, বর্তমান পুঁজিবাদের অন্তর্হিত উদ্দেশ্যকে শিরোধার্য করে, আরও মুনাফা। অতি ধনী যারা, তারা আরও ধনী হওয়ার প্রক্রিয়ায়। ধনী হওয়ার রোগ আজ পাগলামিতে পরিণত। আপাতত তারা সওয়ার হয়েছে এআইয়ের ওপর। আশি-নব্বই দশকের মুক্তবাজার অর্থনীতিনির্ভর নয়া উদারবাদী বিশ্বায়নের সঙ্গে একে পৃথক করা যাবে না। বরং ওই সময়ের ধারাবাহিকতাই আজকের বাস্তবতা নির্মিত হয়েছে। ধনীদের পাগলামির বীজ ওই সময়ে রোপিত। নয়তো ঊনবিংশ শতাব্দীতে যে পুঁজিবাদ দেখা গিয়েছিল, তার মধ্যে একটা সংহতি ছিল, প্রতিযোগিতা এতটা অসুস্থ ছিল না এবং বুর্জোয়া এথিকস বলে একটা বিষয় ছিল। শ্রমশোষণ ছিল, কিন্তু শ্রমিকের ভালো–মন্দ দিক দেখার একটা দায় ছিল। কিন্তু এখনকার পুঁজিবাদ শ্রমিককেই নাই করে দিতে চায় কারখানা থেকে, তাতে তার ভালো–মন্দ দিক দেখার দায়ও থাকে না। মেশিনের তো স্বাস্থ্য-শিক্ষা-বাসস্থানের দাবি নেই! তবে মেশিনের তো মানবিকতাও নেই, তাই তো সেপ্টেম্বর মাসে খুব আলাপ হচ্ছে, এআইয়ের প্রবৃদ্ধিতে আপাতত রাশ টানার জন্য। কারণ, তারা বেশি বুদ্ধিমান হয়ে যাচ্ছে, মানুষের ইনপুট ছাড়াই। এ বড়ই বিপদের কথা!
উপরন্তু আজকের ‘এআই হাইপ’ বা অতিরঞ্জিত প্রতিশ্রুতি, উদ্যোক্তা-পুঁজির (ভেঞ্চার ক্যাপিটাল) উচ্ছ্বাস এবং জেনারেটিভ এআইকে ঘিরে অনিবার্যতার যে ভাষ্য তৈরি হয়েছে, উন্নয়নশীল সংস্কৃতিগুলোর জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছে। এটি পূর্ববর্তী সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের যুক্তিকে পুনরুৎপাদন করছে। তবে এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে উপাত্ত আহরণ ও বিক্রি, ভাষাগত ও অ্যালগরিদমিক পক্ষপাতের নতুন স্তর, যা আগের গণমাধ্যম প্রযুক্তিগুলোতে এই মাত্রায় ছিল না।
বিশ্বায়ন, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য
এআই হাইপ কেন সাংস্কৃতিকভাবে বিপজ্জনক, তা বোঝার জন্য প্রথমে বোঝা দরকার গণমাধ্যম ও সংস্কৃতির সম্পর্ক নিয়ে বিশ্বায়ন তাত্ত্বিকেরা দীর্ঘদিন ধরে কীভাবে বিতর্ক করেছেন। মার্শাল ম্যাকলুহানের (১৯৬৪) প্রভাবশালী সময়ের সঙ্গে ম্যাকলুহান নিজেও ধারণাটি নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হন এবং পরে ইঙ্গিত দেন যে আজকের বিশ্বগ্রামের অধিবাসীদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি হলেও তা পারস্পরিক সম্প্রীতির নিশ্চয়তা দেয় না। ট্রাইবাল সমাজ, যা সংবাদপত্রের আবিষ্কারের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন ও আধুনিক হয়েছিল, ইলেক্ট্রনিক মাধ্যম (টেলিভিশন ও নতুন প্রযুক্তি), ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের ট্রাইবাল সমাজকে আবার ফিরিয়ে আনে। কিন্তু ট্রাইবাল সমাজে সবাই সবাইকে চিনলেও তাদের সম্পর্ক প্রীতিমূলক ছিল না। সীমিত সম্পদে দখল আনতে তারা দলবদ্ধ হতো, নিজস্ব আত্মপরিচয় (আইডেন্টিটি) গড়ে তোলার চেষ্টা করত এবং অপর দলের ওপর আক্রমণ করত।
ম্যাকলুহান এসব ভবিষ্যমুখী তত্ত্ব দিয়েছিলেন ষাটের দশকে। ১৯৬৪ সালে তিনি লিখছেন, ‘আজ আমরা তথ্য ও যোগাযোগের যুগে বাস করছি, কারণ বৈদ্যুতিক মাধ্যম তাৎক্ষণিক ও নিরবচ্ছিন্নভাবে পারস্পরিক ক্রিয়াশীল ঘটনাবলির একটি সামগ্রিক পরিসর সৃষ্টি করে, যেখানে সব মানুষ অংশগ্রহণ করে।’ (ম্যাকলুহান ১৯৬৪) এত সামাজিক মাধ্যমের মতোই শোনায়। কিন্তু আজকের বিশ্বগ্রাম (যা প্রাচীনকালের ট্রাইবাল সমাজের সঙ্গে তিনি তুলনা করছেন) বা সামাজিক মাধ্যমে আমরা আদর্শের ভিত্তিতে, সমমনা মানুষেরা, একেক ‘ইকো চেম্বার’ গঠন করেছি। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ভিন্ন মতের সঙ্গে তর্কবিতর্ক না করে, আমরা একধরনের ‘ফিল্টার বাবল’ তৈরি করেছি।
হার্বার্ট শিলার (১৯৭৬) এই দ্বিধাকে আরও এগিয়ে নিয়ে সরাসরি সমালোচনার পর্যায়ে নিয়ে যান। তাঁর যুক্তি ছিল, শক্তিশালী দেশগুলো গণমাধ্যম, সংস্কৃতি ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্বল বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর নিজেদের মূল্যবোধ, জীবনধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রভাবিত করে। শিলার বিশেষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক পণ্যের বৈশ্বিক বিস্তারকে গুরুত্ব দেন। হলিউডের চলচ্চিত্র, টেলিভিশন অনুষ্ঠান, বিজ্ঞাপন এবং সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে ভোক্তাবাদ, ব্যক্তিবাদ ও মার্কিন জীবনধারা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে স্থানীয় সংস্কৃতি ও মিডিয়া শিল্প অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চাপের মুখে পড়তে পারে। শিলারের মতে, সাংস্কৃতিক আধিপত্য কেবল সামরিক বা রাজনৈতিক শক্তির মাধ্যমে নয়; মিডিয়া, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের মাধ্যমেও প্রতিষ্ঠিত হয়।
পরে রোলান্ড রবার্টসন (১৯৯২) ‘গ্লোকালাইজেশন’ ধারণার মাধ্যমে যে চিত্র আঁকেন, তা কিছুটা ভিন্ন হয়। রবার্টসনের মতে, বিশ্বায়ন মানেই সব জায়গায় সংস্কৃতির একরূপতা (হোমোজেনাইজেশন) তৈরি হওয়া নয়। বরং বৈশ্বিক ধারণা, পণ্য ও চর্চা বিভিন্ন স্থানীয় সংস্কৃতি, প্রয়োজন ও ঐতিহ্যের সঙ্গে খাপ খাইয়ে পরিবর্তিত হয় (রবার্টসন ১৯৯২)। অর্থাৎ বৈশ্বিক ও স্থানীয় উপাদান পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন রূপ তৈরি করে। যেমন বহুজাতিক কোম্পানিগুলো একই বৈশ্বিক পণ্য বিভিন্ন দেশে বিক্রি করলেও স্থানীয় স্বাদ, নকশা, বিজ্ঞাপন ও বিপণন কৌশল অনুযায়ী তা পরিবর্তন করে। তাই গ্লোকালাইজেশন বিশ্বায়নের মধ্যে স্থানীয় সংস্কৃতির ভূমিকা ও বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দেয়।
এই তিনটি অবস্থান—ম্যাকলুহানের প্রযুক্তিনির্ভর আপাত–আশাবাদ, শিলারের সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ এবং রবার্টসনের গ্লোকালাইজেশন ধারণাগুলো দিয়ে এই প্রবন্ধে আমি বোঝার চেষ্টা করব এআই কি প্রকৃত সাংস্কৃতিক বিনিময়ের প্রতিনিধিত্ব করে, নাকি আধিপত্যের একটি নতুন রূপ?
বিংশ শতাব্দীর গণমাধ্যমের যুগ শিলারের সতর্কবাণীকে অনেকাংশে সত্য প্রমাণ করেছিল, একই সঙ্গে রবার্টসনের পাল্টা যুক্তিকেও সমর্থন করেছিল। আমেরিকান চলচ্চিত্র, সংগীত ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান স্যাটেলাইট ও কেব্ল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। ইউনেসকো ও জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের তত্ত্বকে এতটাই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল যে তারা পশ্চিমা গণমাধ্যমের আধিপত্যের ভারসাম্য রক্ষার উদ্দেশ্যে একটি নতুন আন্তর্জাতিক তথ্যব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচারণা চালায়। কিন্তু স্থানীয় দর্শকেরা খুব কম ক্ষেত্রেই বিদেশি কনটেন্টকে নিষ্ক্রিয়ভাবে গ্রহণ করেছে। লাতিন আমেরিকার ছোট সিরিজ বা টেলিনভেলা, ভারতের বলিউড বা নাইজেরিয়ার নলিউড স্থানীয় ভাষা, সংগীত ও সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে বৈশ্বিক ঘরানাকে মানিয়ে নিয়ে বিশাল আঞ্চলিক বাজার তৈরি করেছে। এগুলো একমুখী চাপিয়ে দেওয়ার উদাহরণ নয়; বরং গ্লোকালাইজেশনের সুস্পষ্ট উদাহরণ।
পরবর্তী সময়ে ম্যানুয়েল ক্যাস্টেলস (২০০৯) এই পুরো গতিশীলতাকে একমুখী সম্প্রচারের পরিবর্তে নেটওয়ার্কের ধারণাকে সামনে আনেন। ক্ষমতা কেবল বিষয়বস্তুর ওপর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রয়োগ হয় না; বরং তথ্যের কোন প্রবাহ কোন দর্শকের কাছে পৌঁছাবে, তা নির্ধারণকারী সুইচ ও প্রটোকলের ওপর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেও ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়।
নেটওয়ার্ক-ক্ষমতার এই পরিবর্তনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পথ তৈরি করে। সেখানে সুইচের মালিকানা সরকার বা টেলিভিশন নেটওয়ার্কের হাতে নয়; বরং অল্প কয়েকটি মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানির হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। ম্যাকলুহানের বিশ্বগ্রাম ধারণা যেন তাঁর দেখা ইলেকট্রনিক মাধ্যমের তুলনায় বর্তমানের সামাজিক মাধ্যমে এসে আরও বেশি প্রযোজ্য হয়ে উঠেছে। মানুষ অনেক বেশি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু ট্রাইবাল সমাজের মতোই তারা বিবাদমুখর। অন্যদিকে চীন দেখিয়ে দিয়েছে, মার্কিন টেক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণের বাইরেও নিজস্ব নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সম্ভব। তারা দাঁড় করিয়েছে নিজস্ব টুইটার (উইবো)। টিকটকের আদিরূপ (দোউইন) তো চীনাদেরই তৈরি করা। উইচ্যাটকে বলা হয় সুপারঅ্যাপ। কারণ, হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, অ্যাপল পে, ইনস্টাগ্রাম, উবারের ফিচার এই এক অ্যাপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। উদ্দেশ্য হয়তো চীনের বাস্তবিক সমাজের মতো অনলাইনেও সরকারি কর্তৃত্ব বলবৎ রাখা, কিন্তু তা মার্কিন প্রাযুক্তিক অনিবার্যতার বিকল্প হিসেবে হাজির হয়।
তবে অনেক গবেষক যুক্তি দিয়েছেন যে ডিজিটাল জগতে আপাত সংযুক্তির আড়ালে সব সময়ই আরও গভীর একটি আহরণমূলক (ডেটা এক্সট্র্যাকশন) প্রক্রিয়া কাজ করেছে। কেউ কেউ (কোল্ড্রি ও মেজিয়াস ২০১৯) ‘উপাত্ত উপনিবেশ’কে এমন একটি প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা মানুষের প্রাত্যহিকতাকে পুঁজিবাদের কাঁচামালে পরিণত করে এবং ব্যক্তিগত উপাত্ত ক্রমাগত আহরণ করে—যেভাবে ঐতিহাসিক ঔপনিবেশিকতা একসময় ভূমি, শ্রম ও প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করত। উন্নয়নশীল অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন ডিজিটাল কার্যক্রমকে এমনভাবে বিক্রি ও বিজ্ঞাপিত করে, যার মালিকানা প্রায় সম্পূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে সদর দপ্তর থাকা কোম্পানিগুলোর হাতে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই দ্বৈত চরিত্র—একদিকে ব্যবহারকারীদের আপাত এজেন্সি উপহার দেয়, অন্যদিকে ব্যবহারকারীর নিমগ্নতাকে (ইমারসিভ এনগেজমেন্ট) কাজে লাগিয়ে প্ল্যাটফর্মকে উপাত্ত আহরণ ও বিক্রির বাণিজ্য করার ব্যবস্থা করে দেয়। বর্তমান এআই হাইপের সময়ে এসব আরও তীব্র হয়েছে।
এআই উন্মাদনা: আহরণ, বর্জন ও চাপিয়ে দেওয়া অনিবার্যতা
এআই নিয়ে হাইপ বা মাতামাতি দিকে নজর দেওয়া যাক। এইআইয়ের অধিকাংশ পাইলট প্রকল্প পরিমাপযোগ্য আর্থিক লাভ দিতে ব্যর্থ হলেও, ২০২৫ সাল জুড়ে এবং ২০২৬ সালেও এ খাতে বৈশ্বিক ভেঞ্চার বিনিয়োগ বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি কোম্পানি, জাতীয় সরকার এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো এমন একটি ভাষ্য গ্রহণ করেছে, যেখানে এইআইকে বহু বিকল্পের একটি হিসেবে নয়; বরং ‘আধুনিক’ থাকতে হলে অনিবার্য ও জরুরি প্রয়োজন হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
অনিবার্যতার এই ভাষ্য নিজেই একটি সাংস্কৃতিক উপাদান। এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অল্প কয়েকটি কোম্পানি তৈরি করা বাণিজ্যিক পণ্যসমষ্টিকে এমন একটি সর্বজনীন অবকাঠামো হিসেবে উপস্থাপন করে, যা আধুনিক থাকতে হলে প্রতিটি সমাজকেই গ্রহণ করতে হবে। এটি বিংশ শতাব্দীর গণমাধ্যম সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে শিলারের যুক্তির সঙ্গে প্রায় হুবহু মিলে যায়। উন্নত দেশের উপাত্ত ও প্রচলিত কোডিং চর্চার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়ায় এটি পশ্চিমকেন্দ্রিক মানদণ্ড, নান্দনিকতা ও জ্ঞানচর্চার পদ্ধতিকে পুনরুৎপাদন করে এবং একমাত্র বাস্তবতা হিসেবে হাজির করে।
এআই উন্মাদনা পূর্ববর্তী গণমাধ্যমের বিশ্বায়নের সময়কার তুলনায় উন্নয়নশীল সংস্কৃতিগুলোর জন্য আরও গুরুতর হুমকি তৈরি করে। কারণ, এটি একই সঙ্গে আহরণ (এক্সট্র্যাকশন), বর্জন (এক্সক্লুশন) বা চাপিয়ে দেওয়া অনিবার্যতা (ইমপোজড ইনএভিটেলিবিটি) হিসেবে কাজ করে।
প্রথমে আহরণ নিয়ে কথা বলা যাক। কেট ক্রফোর্ড (২০২১) অ্যাটলাস অব এআই বইয়ে বলেছেন, সিস্টেমের পেছনে থাকা বস্তুগত ও মানবিক শ্রম ব্যাপকভাবে তৃতীয় বিশ্বের ওপর নির্ভরশীল। এ ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক যুগের সম্পদ আহরণের কথা স্মর্তব্য। তখন যেমন উপনিবেশ থেকে খনিজ উত্তোলন করা হতো; তেমনি এখন ভারত, কেনিয়া, ফিলিপাইন ও ভেনেজুয়েলার মতো দেশে কম মজুরির দেশ থেকে ডেটা লেবেলিং ও কনটেন্ট মডারেশনের কাজ করানো হয়। এই অদৃশ্য শ্রমই এআই সিস্টেমকে বুদ্ধিমান বলে মনে হতে সাহায্য করে। উন্নয়নশীল অঞ্চলগুলো এমন একটি প্রযুক্তির জন্য কাঁচামাল ও সস্তা শ্রম সরবরাহ করে, যার মুনাফা ও পরিকল্পনাগত সিদ্ধান্ত বিদেশে কেন্দ্রীভূত থাকে। (ক্রফোর্ড ২০২১)
দ্বিতীয়ত, এআইয়ের ভাষাগত মডেলগুলো ইংরেজিনির্ভর। উন্নয়নশীল বিশ্বের হাজার হাজার ভাষায় এগুলোর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা অনেক কম। ফারহানা শহিদের (২০২৫) তামিল, আরবি, মাগরেবি আরবি ভাষায় কনটেন্ট মডারেশন নিয়ে গবেষণা দেখায় যে ভাষা মডেলের ইংরেজিকেন্দ্রিক ও বিপুল উপাত্তনির্ভর পরিকল্পনা অন্যান্য ভাষাভাষী সম্প্রদায়গুলোর চাহিদা পূরণে অক্ষম, যারা আগের ডিজিটাল বিনিয়োগের ডামাডোলের সময়েও প্রান্তিক ছিল।
বিশ্বের প্রায় সাত হাজার ভাষার মধ্যে প্রায় তিন হাজার ভাষাই ইতিমধ্যে বিপন্ন বলে বিবেচিত। ফলে এমন একটি এআই অবকাঠামো, যা পর্যাপ্ত সম্পদহীন ভাষাগুলোকে আরও বিনিয়োগ থেকে বঞ্চিত করে, যে প্রক্রিয়া থেকে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কেবল উতরানো শুরু করেছিল। সংস্কৃতি ভাষার মধ্য দিয়েই বাহিত হয়। যে প্রযুক্তি অ-ইংরেজি ও অ-প্রভাবশালী ভাষাগুলোকে গৌণ হিসেবে বিবেচনা করে, সেই প্রযুক্তি এই ভাষাগুলোর বহন করা সংস্কৃতিকেও একইভাবে গৌণ হিসেবে বিবেচনা করে।
সম্ভবত এআইয়ের সবচেয়ে সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য হলো এর চাপিয়ে দেওয়া অনিবার্যতা। এআই উন্মাদনা যখন এআই গ্রহণকে অনিবার্য হিসেবে উপস্থাপন করে, তখন উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমপ্রতিষ্ঠানের ওপর দ্রুত বিদেশি এআই সিস্টেম গ্রহণের জন্য চাপ তৈরি হয়। অথচ এই অনিবার্যতা নিয়ে প্রশ্ন করার, উপাত্ত সুরক্ষা আইন গড়ে তোলার প্রয়োজন নিয়ে কথা বলা দরকার। কিন্তু এই নতুন পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য স্থানীয় ভাষাগত অবকাঠামোই থাকে না। বিকল্প প্রযুক্তি না থাকায় অনেক সময় এসব প্রযুক্তির সমালোচনার জন্য বা এর সীমাবদ্ধতা ও সাম্রাজ্যবাদের রূপটি নিয়ে তর্ক করার ভাষা খুঁজতেও অন্যের দ্বারস্থ হতে হয়।
বিশ্বায়নের তত্ত্বে আপ্পাদুরাই বৈশ্বিক টেকনোস্কেপ এবং স্থানীয় আইডিওস্কেপের মধ্যকার যে দূরত্বের কথা বলেছিলেন, এআই সময়ে এ যেন সেই তত্ত্বেরও পুনরুৎপাদন হচ্ছে। সমাজের মূল্যবোধকে প্রশ্ন করা, গ্রহণ করা বা স্থানীয়ভাবে অভিযোজিত করার সক্ষমতা গড়ে ওঠার আগেই প্রযুক্তি দ্রুত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রবেশ করে। রবার্টসনের গ্লোকালাইজেশনের তত্ত্ব, যা টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট কীভাবে স্থানীয়ভাবে পুনর্ব্যাখ্যা করা হয় তা ব্যাখ্যা করতে কার্যকর, এখন আরও কঠিন হয়ে পড়ে, যখন প্রযুক্তিটি পুনর্ব্যাখ্যার জন্য কেবল একটি কনটেন্ট নয়; বরং শ্রেণীকরণ, অনুবাদ ও অনুসন্ধানের এমন একটি অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল, যা শুরুতেই নির্ধারণ করে দেয় কোন স্থানীয় বিষয়াদি আদৌ বোধগম্য বা দৃশ্যমান হবে।
তবে এই দাবিকে প্রাযুক্তিক নির্ধারণবাদের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়। এআই বিপন্ন ভাষাগুলো নথিবদ্ধ ও পুনরুজ্জীবিত করতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রকৌশলী, শিল্পী ও উদ্যোক্তারা কেবল সিলিকন ভ্যালির কোটিপতিদের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে সক্রিয়ভাবে স্থানীয় বিকল্প তৈরি করছেন। গ্লোবালের মধ্যে লোকাল সব সময়ই নিজেকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে—রবার্টসনের এই অন্তর্দৃষ্টি এখনো কিছুটা কার্যকর। কিন্তু এখানে যুক্তি এই নয় যে এআই ভালো কিছু করতে পারে না; বরং যুক্তি হলো, কেন্দ্র থেকে সৃষ্টি করা এআই উন্মাদনা এর গতি, ব্যাপ্তি ও অনিবার্যতার ভাষ্যের মাধ্যমে প্রান্তকে শাসন করছে। পাশাপাশি সবাইকে নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক যেকোনো পরিকল্পনাকে উপেক্ষা করছে, বহুভাষিক উপাত্ত সংগ্রহে অনুৎসাহ দেখাচ্ছে এবং প্রান্তের স্বার্থ নিয়ে একেবারেই না ভাবতে প্ররোচিত করছে। উন্মাদনা সেই এআই সংস্করণকেই পুরস্কৃত করে, যা দ্রুত বাজারে আনা যায় এবং সবচেয়ে বেপরোয়াভাবে বিপণন করা যায়।
উপসংহার: মানবসংস্কৃতির পক্ষে এআই
এআই উন্মাদনা তাই মানবসংস্কৃতির জন্য হুমকি তৈরি করে। শিলার ও ম্যাকলুহানের সময় থেকে গণমাধ্যমব্যবস্থার ক্ষেত্রে বিশ্বায়নতাত্ত্বিকেরা যে সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ ও সমরূপীকরণমূলক প্রবণতা শনাক্ত করে আসছেন, এআই উন্মাদনা সেগুলোকে পুনরুৎপাদন করছে এবং সম্ভবত আরও ত্বরান্বিত করছে।
বিশ্বায়ন সব সময়ই গণমাধ্যমের মাধ্যমে অগ্রসর হয়েছে এবং প্রতিটি মাধ্যম নিজস্ব উপায়ে বৈশ্বিক প্রবাহ ও স্থানীয় সংস্কৃতির সম্পর্ককে পুনর্নির্ধারণ করেছে। গণমাধ্যম অল্প কয়েকটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র থেকে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে কনটেন্ট সম্প্রচার করেছে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে অনুকৃত অনুষ্ঠানাদি, পাশাপাশি গ্লোকালাইজড প্রতিরোধ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনুভূমিক সংযোগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু তার নিচে নীরবে গড়ে তুলেছে উপাত্ত উপনিবেশের এক নতুন অবকাঠামো। এখন এআই উন্মাদনা একইভাবে একটি সর্বজনীন ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। অথচ সেই ভবিষ্যৎকে সংজ্ঞায়িত করার বস্তুগত, ভাষাগত ও বাগ্মিতাগত ক্ষমতা কয়েকটি কোম্পানি ও রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত করছে।
আজকের এআই মুহূর্তকে বোঝার জন্য টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বোঝার ক্ষেত্রে যে সমালোচনামূলক ধারণাগুলো তৈরি হয়েছিল, যেমন সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ, গ্লোকালাইজেশন, উপাত্ত উপনিবেশ, সেগুলোই নতুনভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে এআইয়ের প্রকৃত নতুন বৈশিষ্ট্যের দিকে: এটি শুধু সাংস্কৃতিক বার্তা বহন করে না; বরং সংস্কৃতিকেই কাঁচামাল হিসেবে গ্রহণ করে এবং এমন একটি পণ্যে রূপান্তরিত করে, যার পরিকল্পনাগত সিদ্ধান্তগুলো যে উন্নয়নশীল সমাজগুলোর সেবা করার দাবি করা হয়, তাদের কাছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় না এবং জবাবদিহির বাইরে থাকে।
বহুভাষিক উপাত্ত সৃষ্টি না করা গেলে, এইআইয়ের স্থানীয় শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা না গেলে এবং ন্যায্য শ্রমনীতিতে সচেতন বিনিয়োগ না করা হলে, এআইকে ঘিরে উন্মাদনা ও এর প্রয়োগ, বিশ্বায়নের ইতিহাসে সাংস্কৃতিক সংকোচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রূপ হয়ে উঠতে পারে।
রচনাপঞ্জি
আপ্পাদুরাই ১৯৯৬।। Arjun Appadurai, Modernity At Large: Cultural Dimensions of Globalization, Minneapolis: University of Minnesota Press।
ক্যাস্টেলস ২০০৯।। Manuel Castells, Communication Power, New York: Oxford University Press।
কোল্ড্রি ও মেজিয়াস ২০১৯।। Nick Couldry and Ulises A. Mejias, The Costs of Connection: How Data Is Colonizing Human Life and Appropriating It for Capitalism, Stanford: Stanford University Press।
ক্রফোর্ড ২০২১।। Kate Crawford, Atlas of AI: Power, Politics, and the Planetary Costs of Artificial Intelligence, New Haven: Yale University Press।
গ্রিনব্লাট, কোত্রা ও উইক ২০২৬।। Ryan Greenblatt, Ajeya Cotra, and Hjalmar Wijk, ‘Brief independent investigation of agents’ behavior, reasoning and collaboration in the OpenAI / Hugging Face hacking incident’, Redwood Research, 26th August, https://www.redwoodresearch.org/research/hugging-face-incident#core-takeaways-about-this-incident, প্রবেশ: ১৩ই অক্টোবর, ২০২৬।
ম্যাকলুহান ১৯৬৪।। Marshall McLuhan, Understanding Media: The Extensions of Man, New York: McGraw-Hill।
রবার্টসন ১৯৯২।। Roland Robertson, Globalization: Social Theory and Global Culture, London: Sage Publications।
শহিদ ও অন্যান্য ২০২৫।। Farhana Shahid, Mona Elswah, Aditya Vashistha and, ‘Think Outside the Data: Colonial Biases and Systemic Issues in Automated Moderation Pipelines for Low-Resource Languages’, Proceedings of the Eighth AAAI/ACM Conference on AI, Ethics, and Society (AIES-25), Vol. 8, No. 3, arXiv: 2501.13836, প্রবেশ: ১০ আগস্ট, ২০২৬।
শিলার ১৯৭৬।। Herbert Schiller, Communication and Cultural Domination, New York: International Arts and Sciences Press।

লেখক পরিচিতি
ড. ফাহমিদুল হক বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র ও গণমাধ্যম গবেষক, লেখক, এবং শিক্ষক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। বর্তমানে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বার্ড কলেজে (Bard College) শিক্ষকতা ও গবেষণায় নিয়োজিত আছেন। তাঁর বইগুলোর মধ্যে রয়েছে Identity, Nationhood and Bangladesh Independent Cinema (Routledge, 2022); Cinema of Bangladesh: A Brief History (2020); অসম্মতি উৎপাদন: গণমাধ্যম বিষয়ক প্রতিভাবনা (২০১১) এবং চলচ্চিত্র: তত্ত্ব ও গবেষণা (২০২২)
