জন্মের সময় থেকেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে শিশুর মধ্যে ‘সাকিং রিফ্লেক্স’ বা চোষার অভ্যাস তৈরি হয়, যা মাতৃস্তন্য বা ফিডার পানে সহায়তা করে। শুধু খাদ্যোপাদান চুষে খাওয়াই নয়, চোষার অভ্যাসের কারণে শিশুর মধ্যে সুখকর ও আরামদায়ক অনুভূতিও তৈরি হয়। বড় হয়ে শিশু স্তন্যপান বন্ধ করলেও কারও মধ্যে চোষার অভ্যাস থেকেই যায়। এক্ষেত্রে অনেকে আঙুল চোষা বেছে নেয়। তবে ৪ মাস বয়সেই শিশুর ‘সাকিং রিফ্লেক্স’ থেমে যায়। আঙুল চোষার অভ্যাসটি অবশ্য আরও অনেক দিন চালিয়ে যায়। অধিকাংশ শিশু ২-৪ বছর বয়সের মধ্যে নিজে নিজেই আঙুল বা অন্য কোনো উপকরণ, যেমন- চুষনী চোষার অভ্যাস ত্যাগ করে। কোনো কোনো শিশু প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও আঙুল চোষা চালিয়ে যায় বদভ্যাসের কারণে। প্রাপ্তবয়স্কদের কেউ কেউ মানসিক রোগের কারণে, কেউ কেউ ‘স্টেরিওটাইপিক মোভমেন্ট ডিসওর্ডার’-এ স্নায়বিক সমস্যায় আঙুল চোষা চালিয়ে যেতে পারে।
ক্ষতির কারণ : যদি কোনো শিশু পাঁচ বছর বয়সের পরও আঙুল চোষে, তবে তা স্থায়ী দাঁতের বিন্যাসের জন্য গুরুতর সমস্যা তৈরি করে। আঙুল চোষায় মুখগহ্বরের আকার ক্ষতিগ্রস্থ হয়। উপরের সামনের দাঁত ঠোঁটের দিকে ও নিচের সামনের দাঁত জিহ্বার দিকে এগিয়ে আসে। উপর ও নিচের সামনের দাঁতের মাঝখানে অস্বাভাবিক ফাঁকা অর্থাৎ ‘ওপেন বাইট’ তৈরি হয়। তবে মুখে স্থায়ী দাঁত আসার আগে (৬ বছর বয়স থেকে মুখে স্থায়ী দাঁত আসতে শুরু করে)। যদি আঙুল চোষার অভ্যাস বন্ধ করা যায়, তা হলে দাঁতের বিন্যাসগত ক্ষতি এড়ানো যায়। আঙুল চোষায় অপরিচ্ছন্ন আঙুল থেকে মুখগহ্বরে জীবাণু সংক্রমণ ঘটতে পারে।
বন্ধের উপায় : আঙুল চোষা বন্ধ করতে কোনো কোনো বাবা-মা শিশুর আঙুলে তিক্ত বা ঝাঁঝাল উপাদান মাখিয়ে দেন। তবে এ পদ্ধতিটি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করেছে আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশন। এক্ষেত্রে শিশুর বাবা-মায়ের প্রতি আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনের পরামর্শ হলো, আঙুল চোষার জন্য শিশুকে তিরষ্কার করবেন না। আঙুল না চুষলে তার প্রশংসিত করুন। শিশু যখন নিজেকে অনিরাপদ মনে করে বা অস্বস্তিতে পড়ে, তখন আঙুল চোষা শুরু করে। তখন তার নিরাপত্তাহীনতা বা অস্বস্তির কারণগুলো খুঁজে বের করে তা সমাধানের চেষ্টা করুন, যেন শিশুর জন্য আরামদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়। যদি শিশু কোনো কিছুতে বিরক্তির কারণে আঙুল চুষতে শুরু করে, তা হলে চিত্তাকর্ষক কাজে শিশুর মনযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করুন। আঙুল চুষলে দাঁতের যা ক্ষতি হতে পারে, একজন ডেন্টিস্ট তা শিশুকে ব্যাখ্যা করতে পারেন এবং আঙুল চোষা বন্ধে উৎসাহী করতে পারেন। আঁকাবাঁকা দাঁত সোজা করার জন্য বিশেষজ্ঞ ডেন্টিস্ট (অর্থোডন্টিস্ট) শিশুর মুখে পরার জন্য বিশেষ ধরনের অ্যাপ্লায়েন্স বা যন্ত্র, যেমন- খড় আঁচড়ার মতো হে রেইক অ্যাপ্লায়েন্স, প্যালাটাল ক্রিব অ্যাপ্লায়েন্স বা ব্লু গ্রাস অ্যাপ্লায়েন্স বানিয়ে দিতে পারেন, যা শিশুর আঙুল চোষা বন্ধ করতে ও দাঁতের ওপর আঙুল চোষার ক্ষতি কমিয়ে আনতে পারে। আঙুল চোষা বন্ধ করতে আঙুলে পরিধানযোগ্য থাম গার্ড (বাণিজ্যিক নাম টি গার্ড) নামক প্লাস্টিক উপাদান বাজারে পাওয়া যায়, যা ব্যবহারে ৪ সপ্তাহের মধ্যেই অধিকাংশ শিশু আঙুল চোষার অভ্যাস ত্যাগ করে বলে গবেষণায় দেখা গিয়েছে।
লেখক : ডেন্টাল স্পেশালিস্ট
তায়েফ ডেন্টাল হাসপাতাল, সৌদি আরব
