জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দুটি হত্যা ও একটি হত্যাচেষ্টার অভিযোগে করা তিন মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১৬ জনের বিরুদ্ধে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ। এ ছাড়া অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ৩০৩ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছেন তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।
সম্প্রতি ঢাকার সিএমএম আদালতের সাধারণ নিবন্ধন শাখায় এসব অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
তিন মামলার মধ্যে ইলেকট্রিশিয়ান ইলিয়াস হোসেন হত্যা মামলায় ৪৩ জন, রায়হান আকন হত্যা মামলায় ৪৯ জন এবং অটোরিকশাচালক মেহেদী হাসানের হত্যাচেষ্টা মামলায় ২৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। তিনটি মামলার অভিযোগপত্রেই শেখ হাসিনার নাম রয়েছে। এ ছাড়া সাবেক সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও আসামি করা হয়েছে।
ইলিয়াস হত্যা মামলা
এজাহার থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৪ অগাস্ট রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেওয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হন ইলেকট্রিশিয়ান ইলিয়াস হোসেন। পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৯ অগাস্ট তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ইলিয়াসের বাবা ফারুক খান ২০২৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনাসহ ১০২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৩০০ জনকে আসামি করে মামলা করেন।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আক্কেল আলী শেখ হাসিনাসহ ৪৩ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। তিনি এজাহারের আসামিদের মধ্যে ৬৬ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করেছেন।
অভিযোগপত্রে শেখ হাসিনার পাশাপাশি তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, বোন শেখ রেহানা, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, তার ভাই যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ এবং আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের নাম রয়েছে।
এ ছাড়া নানকের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) মাসুদুর রহমান বিপ্লব, সাবেক সংসদ সদস্য সাদেক খান, মাইনুল হোসেন খান নিখিল ও আ কা ম সরওয়ার জাহান বাদশার নামও রয়েছে আসামির তালিকায়।
অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাবেক প্রধান হারুন অর রশীদ, পুলিশের সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতি রিয়াজ মাহমুদ হৃদয়, সাবেক কাউন্সিলর আসিফ আহম্মেদ ও তারেকুজ্জামান রাজীব।
অব্যাহতির সুপারিশ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন রফিকুল ইসলাম, জয়নাল আবেদীন, ফারুক, রতন, অভি খান, রীয়াজ মীর, তার ভাই খোকন মীর ও রনি বেপারী।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে আগামী ১৬ নভেম্বর মামলাটির শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।
রায়হান হত্যা মামলা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর বাড্ডা ইউলুপ এলাকায় আন্দোলন চলাকালে গুলিবিদ্ধ হন সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের বনশ্রী শাখার লোডার রায়হান আকন। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে ওই দিন বিকেল ৪টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় রায়হানের বাবা কামাল হোসেন ২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল শেখ হাসিনাসহ ২৩৬ জনকে আসামি করে মামলা করেন। তদন্ত শেষে গত ২৭ সেপ্টেম্বর বাড্ডা থানার এসআই সুমন মিয়া শেখ হাসিনাসহ ৪৯ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। সেখানে ২৩৬ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
এ মামলায় শেখ হাসিনার পাশাপাশি আসামির তালিকায় রয়েছেন সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, পিরোজপুর-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শামিম শাহনেওয়াজ ও ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রবিউল ইসলাম ওরফে সোহেল।
অব্যাহতির সুপারিশ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার আতিকুর রহমান খান, এস এলাহী শিমুল, মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন ঢালী, আজম খসরু ও কামাল হোসেন।
মেহেদী হাসান হত্যাচেষ্টা মামলা
চাকরির সন্ধানে ভোলা থেকে ঢাকায় এসে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় আহত হন অটোরিকশাচালক মেহেদী হাসান। এ ঘটনায় তার করা মামলার অভিযোগপত্রে শেখ হাসিনাসহ ২৪ জনকে আসামি করেছে পুলিশ। এ ছাড়া আলমাছ নামে একজনকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
গত ২০ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুর থানার এসআই সেলিম উদ্দীন আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। তিনি বলেন, গত মাসে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছি। বাদী এজাহারে যাদের নাম দিয়েছেন এবং তদন্তে যাদের নাম এসেছে, তদন্ত করে যা পেয়েছি, সেই মোতাবেক আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছি।
এ মামলায় শেখ হাসিনার সঙ্গে ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাদেক খান, আসিফ আহম্মেদ, তারেকুজ্জামান রাজীব ও রিয়াজ মাহমুদ হৃদয়কে আসামি করা হয়েছে।
