Published on
:
3 min read
বুদ্ধদেব বেরা, পিয়ালগেড়িয়া
'হইহই কাণ্ড, রইরই ব্যাপার!'
স্বচক্ষে এমন দৃশ্য দেখলে নির্ঘাৎ এমনটাই বলতেন লালমোহন গাঙ্গুলি ওরফে জটায়ু। এতদিন পর্যটকরা এসে অরণ্যশহরের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছেন। সম্ভবত, এই প্রথম বার পর্যটকদের দেখে, বলা ভালো, তাঁদের জোড়া ওপেন–টপ ভিন্টেজ গাড়ি (১৯২৬–এর বেন্টলি ট্যুরার) দেখে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়লেন লোকজন। মিলেমিশে ছিটকে এলো প্রশ্ন, কৌতূহল, বিস্ময় ও কল্পনা,
—আরিব্বাস, এ তো ভুকলা (বিশাল) বড় হরেন (হর্ন) গো!
—উপরে যে ছাদ নেই! জল পড়লে ভিজে যাবে তো!
—ওই দ্যাখো, চার চাকার গাড়িতে আবার সাইকেলের মতো ইস্পোক (স্পোক) কেনে?
—বাপ রে বাপ! গাড়ি তো নয়, যেন হেলিকপ্টার। আর আওয়াজও এক্কেরে উড়াকলের (ফ্লাইট) মতো।
রবিবার ভরা ছুটির দিনে এ ভাবেই 'টক অফ দ্য টাউন' হয়ে রইল দু'টি ভিন্টেজ বেন্টলি। ঝাড়গ্রাম শহর লাগোয়া আদিবাসী গ্রাম পিয়ালগেড়িয়ায় এসেছিলেন দুই ব্রিটিশ বন্ধু জন ওয়াল্টন ও রবার্ট উইকিনসন। জনের বয়স ৭২ বছর। রবার্ট একটু ছোট, ৬৪। বয়সটা যে আসলে একটি সংখ্যা ছাড়া কিছুই নয়, তা প্রতি মুহূর্তে প্রমাণ করে দিচ্ছেন তাঁরা। 'ভিন্টেজ বেন্টলি লাভার' দুই দোস্ত গত ১৫ বছর ধরে নিজেদের ওই গাড়িতে চষে বেড়াচ্ছেন তামাম দুনিয়া। প্রথমে তাঁরা ফ্লাইটে পৌঁছে যান গন্তব্যে। জাহাজে করে তাঁদের বাহনও চলে আসে বন্দরে। তারপরে পছন্দের 'ডেস্টিনেশন' ঠিক হয়ে গেলে গর্জে ওঠে জোড়া বেন্টলি।
মাদলে বোল তুলছেন রবার্টEi Samay
শাল–পিয়ালের জঙ্গলঘেরা মসৃণ পিচপথে আচমকা অচেনা আওয়াজে চমকে ওঠেন পথচলতি ও আশপাশের মনুষ। তাকিয়ে দেখেন, দুই 'সাহেব' নিজেরাই ড্রাইভ করছেন দু'টি 'আজব' গাড়ি। গ্রামে গ্রামে সে বার্তা রটে যায় ক্রমে। কেউ ঘর থেকে তড়িঘড়ি ছুটে এলেন রাস্তায়। কেউ গাড়ি থামিয়ে পকেট থেকে মোবাইল বের করে সেল্ফি তুললেন। 'সাহেব'রা অবশ্য কেউ বিরক্ত হননি। বরং মুচকি হেসে ওঁরা দেখলেন ঝাড়গ্রামের 'বিউটি'। আর স্থানীয় লোকজন দেখলেন গাড়ির হরেক কেরামতি।
জন ও রবার্টের দুপুরে থাকার আয়োজন করা হয়েছিল পিয়ালগেড়িয়ার জয়ন্তী মুর্মুর বাড়িতে। আদিবাসী সমাজের রীতি অনুযায়ী তাঁদের বরণ করে ঘরে তোলা হয়। মাটির ভাঁড়ে দেওয়া হয় দুধ চা। ঝাড়গ্রাম ট্যুরিজ়মের উদ্যোগে আদিবাসী সঙ্গীত ও নৃত্যের আয়োজন করা হয়েছিল। সে সব দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতে করতে আচমকা এক জনের থেকে মাদল নিয়ে রবার্ট গলায় ঝুলিয়ে বাজাতে শুরু করেন। খাটিয়ায় বসে বন্ধুর কাণ্ড দেখে হেসে গড়িয়ে পড়েন জন।
ঝাড়গ্রাম ট্যুরিজ়মের কর্ণধার সুমিত দত্ত বলেন, 'মুম্বইয়ের পর্যটন সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, দু'জন ব্রিটিশ পর্যটক ঝাড়গ্রামে রাত্রিযাপন করবেন। কিন্তু বিশেষ কারণে তা বাতিল হয়। তবে, এক বেলার জন্য ওঁরা ঝাড়গ্রামে এসেছিলেন। মুগ্ধ হয়ে কথা দিয়েছেন, আবার আসবেন।'
এশিয়া মহাদেশ সফর শুরুর আগে দুই বন্ধু আমেরিকা, ইউরোপ এবং অস্ট্রেলিয়ায় ঘুরেছেন। ভারত সফরের আগে গাড়ি দু'টিকে জাহাজে লন্ডন থেকে মুম্বইয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। রবার্টের কথায়, 'আমাদের দুই বন্ধুর শখ ভিন্টেজ গাড়ি আর দেশ ঘোরা। এই গাড়ি নিয়ে আমরা ক্যানাডা ও আলাস্কা–সহ গোটা উত্তর আমেরিকায় ঘুরেছি। দক্ষিণ আমেরিকায় ইকুয়েডর, চিলি ও বলিভিয়াও ঘুরেছি। আমাদের সাম্প্রতিক ভ্রমণ শুরু হয়েছে মুম্বই থেকে। ইতিমধ্যে গোয়া, কর্ণাটক, কেরলম হয়ে এখানে এসেছি। পরের গন্তব্য দিল্লি।'
জন বলছেন, 'ভারত–ভ্রমণে আমাদের সঙ্গী হয়েছে মুম্বইয়ের ট্যুর ম্যানেজার ড্যানিয়েল। ও থাকায় আমাদের কোনও অসুবিধে হচ্ছে না। এখানকার আদিবাসী সঙ্গীত ও নৃত্য খুব উপভোগ করেছি। আবার আসব।' পিয়ালগেড়িয়ার ফাগু মান্ডির এখনও যেন ঘোর কাটেনি। বলছেন, 'উফ্, এ জিনিস না দেখলে আফসোস থেকে যেত। এক্কেরে রাজার গাড়ি! যেমন বাহার, তেমনই আওয়াজ!'
বেলা পড়ে আসে। জন ও রবার্ট গাড়িতে ওঠেন। বেন্টলি গর্জে ওঠার আগে থিকথিকে ভিড়ের দিকে হাত নেড়ে বলেন, 'হ্যাভ আ নাইস ডে।' হাত দুটো কপালে ঠেকিয়ে জয়ন্তী মুর্মু বিড়বিড় করেন, 'দুগ্গা... দুগ্গা...।'