স্বাধীনতা সংগ্রামে দেশপ্রেমের অনন্য দৃষ্টান্ত সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২১ পিএম
মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী। ছবি: সংগৃহীত
-->দারিদ্র্যকে জয় করে লোকসাহিত্যের সাধক, আর দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদায় উজ্জ্বল এক অনন্য ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী। বাংলার লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণে অসামান্য অবদানের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সরকারের দেওয়া খেতাব প্রত্যাখ্যান করে দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তিনি। সাহিত্যসাধনা, নৈতিক দৃঢ়তা ও দেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার কারণে আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন এই কৃতী মানুষ।
১৯০১ সালের ২২ অক্টোবর নেত্রকোনা জেলার তৎকালীন কেন্দুয়া থানা, বর্তমানে নেত্রকোনা সদর উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নের কাসিমপুর গ্রামে এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী। শৈশব থেকেই দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে এগিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। পিতৃবিয়োগের কারণে তাঁর শিক্ষাজীবনেও বাধা আসে। তবু অধ্যবসায় ও মেধার জোরে তিনি শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন এবং সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরীর জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর সাহসী অবস্থান। ১৯৭০ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান সরকার তাঁকে ‘তঘমা-ই-খেদমত’ খেতাবে ভূষিত করে। কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দমন-পীড়নের প্রতিবাদে তিনি সেই খেতাব প্রত্যাখ্যান করেন বলে তাঁর জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ রয়েছে। ব্যক্তিগত সম্মাননা ও স্বীকৃতির চেয়ে দেশের স্বাধীনতা, মানুষের মর্যাদা এবং ন্যায়বোধকে প্রাধান্য দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত তাঁর দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদার পরিচয় বহন করে।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি লোকসাহিত্য সংগ্রহে তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৩৮ সাল থেকে তিনি বিশেষভাবে লোকসাহিত্য সংগ্রহের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। গ্রামবাংলার মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত গান, কাহিনি, প্রবাদ-প্রবচনসহ নানা লোকজ উপাদান সংগ্রহের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্যবাহী ভান্ডার সমৃদ্ধ করতে ভূমিকা রাখেন। তাঁর সাহিত্যকর্ম বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। লোকসাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬৮ সালে তাঁকে ‘লোকসাহিত্য বিশারদ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৬ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।
শিক্ষকতা, সাহিত্যসাধনা ও লোকজ সংস্কৃতি সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী নিজের কর্মজীবনকে অর্থবহ করে তুলেছিলেন। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, প্রতিকূলতা মানুষের পথ কঠিন করতে পারে, কিন্তু দৃঢ় মনোবল ও আদর্শনিষ্ঠা থাকলে সেই বাধা অতিক্রম করা সম্ভব। আর দেশপ্রেমের প্রকৃত পরিচয় মেলে সংকটের মুহূর্তে নিজের অবস্থান ও নীতির প্রতি অবিচল থাকার মধ্য দিয়ে।
১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। জন্মদিনে এই কৃতী মানুষকে স্মরণ করার মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্যকর্ম, দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদার আদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা জরুরি। তাঁর রচনা সংরক্ষণ, গবেষণা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা আয়োজনের মাধ্যমে এই লোকসাহিত্য সাধকের স্মৃতি ও অবদান আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। সেই লক্ষ্যে প্রয়াত সাধক সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী ১২৫ জন্মবার্ষিকীতে কেন্দুয়া লোকজ সাহিত্য আসর শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিকালে তাঁর জীবনকর্ম নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। কেন্দুয়া প্রেসক্লাব অডিটোরিয়ামে এই কৃত্তিমান পুরুষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। আয়োজকেরা সাহিত্য প্রেমি, লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতি কামনা করেছেন।
এসেএন/
আরও পড়ুন
জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুবার্ষিকী আজ
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৯ এএম
ছবি: সংগৃহীত
-->ডিজিটাল যুগে বইয়ের মলাট কিংবা সাদা পৃষ্ঠায় চোখ রাখা পাঠকের সংখ্যা কমছে। কিন্তু কবিতা কিংবা সাহিত্য আদতে কি মরেছে? একটুও নয়। কবির কবিতা আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে ফেসবুকের রিলস কিংবা ইউটিউবে। ভিডিও স্ক্রলিং করতেই এই তো শোনা যায়¬–‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে, সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে। আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন, আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।’
শান্তির অন্বেষণে হাজার বছর ধরে পথ হাঁটা কবি জীবনানন্দ দাশের ৭২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ ২২ অক্টোবর। বিশ শতকের অন্যতম প্রধান আধুনিক বাঙালি কবি, লেখক ও প্রাবন্ধিক জীবনানন্দ দাশ বাংলা কাব্যে আধুনিকতার পথিকৃৎদের অন্যতম। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থে নজরুল ইসলামের প্রভাব থাকলেও দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ থেকেই তিনি হয়ে ওঠেন মৌলিক ও ভিন্ন পথের অনুসন্ধানী। প্রকৃতি, নিঃসঙ্গতা, সময় ও ইতিহাসের স্বতন্ত্র চিত্রকল্পের মাধ্যমে বাংলা কবিতায় নিজস্ব জগৎ নির্মাণ করেছেন তিনি। জীবদ্দশায় তার সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি সীমিত থাকলেও মৃত্যুর পর তার অপ্রকাশিত রচনা প্রকাশিত হলে পাঠক ও সমালোচকদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে।
১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশাল শহরে জীবনানন্দ দাশ জন্মগ্রহণ করেন। ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতার রচয়িতা কবিতার কবি কুসুমকুমারী দাশের সন্তান জীবনানন্দ দাশ। বাবা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ব্রহ্মবাদী পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।
জীবনানন্দ দাশের জীবনে আর্থিক অনিশ্চয়তা ও চাকরিগত সংকট ছিল। মায়ের প্রভাবে ছোটবেলা থেকেই তিনি কবিতা লিখতে শুরু করেন। ১৯১৯ সালের এপ্রিল মাসে ব্রহ্মবাদী পত্রিকার বৈশাখ সংখ্যায় তার ‘বর্ষ-আবাহন’ কবিতাটি প্রকাশিত হয়। তখন তিনি জীবনানন্দ দাশগুপ্ত নামে লিখতেন। ১৯২৭ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’ প্রকাশিত হয় এবং এ সময় থেকেই তিনি পারিবারিক পদবি ‘দাশগুপ্ত’-এর পরিবর্তে ‘দাশ’ ব্যবহার করতে শুরু করেন। ঝরা পালক, রূপসী বাংলা, ধূসর পাণ্ডুলিপি, মহাপৃথিবী, বনলতা সেন, সাতটি তারার তিমির জীবনানন্দের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। এর মধ্যে রূপসী বাংলা প্রকাশিত হয় তার মৃত্যুর পর, ১৯৫৭ সালে।
তিনি প্রধানত কবি হলেও তার বেশ কিছু প্রবন্ধ ও নিবন্ধও প্রকাশ পেয়েছে। ১৯৫৪ সালে অকালমৃত্যুর আগে তিনি নিভৃতে ১৪টি উপন্যাস এবং ১০৮টি ছোটগল্প লিখেছেন। জীবনানন্দের বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থ নিখিলবঙ্গ রবীন্দ্র সাহিত্য সম্মেলনে পুরস্কৃত হয় ১৯৫৩ সালে। ১৯৫৫ সালে তার শ্রেষ্ঠ কবিতা গ্রন্থ মরণোত্তর সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হয়।
১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর কলকাতায় ট্রাম দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পরবর্তী জটিলতায় জীবনানন্দ দাশের মৃত্যু হয়।
আরও পড়ুন
শেষ হলো লালন স্মরণোৎসব
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৫ এএম
কুষ্টিয়ায় লালন স্মরণোৎসব সমাপনী দিনে গতকাল চেঁউরিয়ায় লালন শাহের আখড়াবাড়িতে ভক্তদের জমায়েত।ছবি: খবরের কাগজ
-->‘আর কি এমন মানবজনম বসব সাধুর মেলে, হেলায় হেলায় দিন বয়ে যায় ঘিরে নিল কালে’–এমন আকুলতা আর মরমি সুরের মূর্ছনায় শেষ হলো মরমি সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা। গতকাল রবিবার দুপুরে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়িতে ‘পূর্ণসেবা’ গ্রহণের মধ্য দিয়ে সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা সমাপ্ত হয়। এর পরই সাঁইজির ধাম ছাড়তে শুরু করেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সাধু-ফকির ও বাউলরা। তবে লালনকে ঘিরে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আখড়াবাড়িসংলগ্ন কালী নদীর তীরে বসা গ্রামীণ মেলা চলবে সোমবার গভীর রাত পর্যন্ত। এরপর দোল পূর্ণিমার উৎসবে আবারও সাঁইজির ধামে সমবেত হবেন সাধু-ফকির ও ভক্ত-অনুরাগীরা।
সাধন-ভজন, গুরুসেবা আর মরমি গানের মধ্য দিয়ে দুই দিন ধরে মুখর ছিল লালন আখড়াবাড়ি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সাধু-ফকির, বাউল ও ভক্ত-অনুরাগীদের মিলনমেলায় চলেছে ভাবের আদান-প্রদান ও লালনের মানবতাবাদী দর্শনচর্চা। পূর্ণসেবার মধ্য দিয়ে সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও আখড়াবাড়ির বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট বৈঠকি আসরে এখনো শোনা যাচ্ছে লালনের গান।
গত শনিবার অধিবাস সেবার মধ্য দিয়ে শুরু হয় সাধুসঙ্গ ও তিন দিনব্যাপী স্মরণোৎসব। লালন একাডেমির উদ্যোগে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় আয়োজিত এ উৎসবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসেন হাজারো লালনভক্ত, সাধু-ফকির, বাউল ও দর্শনার্থী। তাদের পদচারণে আখড়াবাড়ি ও কালী নদীর তীরজুড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
শনিবার বিকেলে উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে লালনের জীবনদর্শন শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তার সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার বাণী সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
গতকাল সন্ধ্যায় দ্বিতীয় দিনের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার আবদুল্লাহ হারুন। সভায় লেখক ও চিন্তক ফরহাদ মজহারসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা সভা শেষে রাতে বিভিন্ন শিল্পীর পরিবেশনায় বসে মরমি গানের আসর।
আখড়াবাড়ির বিভিন্ন স্থানে বৈঠকি আসরে একতারা-দোতারার সুরে মগ্ন ছিলেন সাধু-ফকিররা। গানের বাণী ও ভাবের আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে তারা তুলে ধরেছেন সাঁইজির মানবতা, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতার দর্শন। কেউ গানে, কেউ আলোচনায়, আবার কেউ গুরুসেবা ও সাধন-ভজনের মধ্য দিয়ে সময় কাটিয়েছেন। তাদের কাছে সাধুসঙ্গ কেবল উৎসব নয়, আত্মশুদ্ধি ও মানুষকে জানার সাধনাও।
সাধু আব্দুর রাজ্জাক সাঁই বলেন, ‘দুপুরে পূর্ণসেবার মধ্য দিয়ে এক দিনের সাধুসঙ্গ শেষ হয়েছে। এরপর আমরা সাধু-ফকিররা সাঁইজির ধাম ছাড়তে শুরু করেছি। আবার দোল উৎসবে সবাই একত্র হব। এটি একটি শিক্ষাকেন্দ্র। আমরা এখানে শিখতে আসি। বছরের দুটি আয়োজন আমাদের সাধু-ফকিরদের মিলনমেলায় পরিণত হয়।’
সাধু মনসুর সাঁই বলেন, লালন সাঁইয়ের বাণী গানের মাধ্যমে প্রচার করা হয় এখানে। সাধু-ফকিরদের মধ্যে আলোচনা ও ভাবের আদান-প্রদান চলে। সব মিলিয়ে সাধুসঙ্গ মানুষের মধ্যে লালনের দর্শন ছড়িয়ে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন।
এদিকে সাধু-বাউল ও দর্শনার্থীদের পদচারণে আখড়াবাড়িসংলগ্ন কালী নদীর তীরে বসেছে বিশাল গ্রামীণ মেলা। মেলায় বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। উৎসবের পাশাপাশি মেলাকে ঘিরেও দর্শনার্থীদের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের ভিড়ে মেলা প্রাঙ্গণ হয়ে উঠেছে প্রাণবন্ত। সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও সোমবার গভীর রাত পর্যন্ত মেলায় কেনাকাটা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন উপভোগ করতে পারবেন দর্শনার্থীরা।
উৎসবে আগত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। মেলাকে মাদকমুক্ত রাখতে জোরদার করা হয়েছে নজরদারি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মোতায়েন রয়েছেন ৮৭২ জন পুলিশ সদস্য। পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করছে আনসার ও এসআরবির বিশেষ দল।
১৩৬ বছর আগে কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ার এই আখড়াবাড়িতে দেহত্যাগ করেন ফকির লালন সাঁই। এরপর থেকে গুরু-পরম্পরায় তার মানবতাবাদী দর্শন ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করে আসছেন সাধু-ফকির ও অনুসারীরা। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও অধিবাস, বাল্যসেবা ও পূর্ণসেবার মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হচ্ছে মরমি এই সাধককে। সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও লালনের দর্শন, গান ও মানবতার বাণীকে ঘিরে আখড়াবাড়িতে উৎসবের আমেজ থাকছে সোমবার গভীর রাত পর্যন্ত। এরপর দোল পূর্ণিমার উৎসবে আবারও সাঁইজির ধামে মিলিত হবেন সাধু-ফকির ও ভক্ত-অনুরাগীরা।
আরও পড়ুন
তরুন কবি বাবুলের প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৫৬ পিএম
ছবি সংগৃহীত
-->কবিতা মানুষের মনের কথা বলার এক অনন্য মাধ্যম। কখনো প্রেম-ভালোবাসার কোমল অনুভূতি, কখনো বিরহের নীরব বেদনা, আবার কখনো দেশ ও প্রকৃতির প্রতি গভীর মমত্ববোধ কবিতার পঙ্ক্তিতে জীবন্ত হয়ে ওঠে। কবিতার সৌন্দর্য এখানেই, যেখানে অল্প কথায় প্রকাশ পায় জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি। এমনই ভাবনা ও অনুভূতির সমন্বয়ে প্রকাশিত হয়েছে তরুণ কবি শহিদুল ইসলাম বাবুলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কবিতার মাঝে জীবনের গল্প’।
সাহিত্য দেশ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বইটিতে স্থান পেয়েছে মোট ৬০টি চতুর্দশপদী কবিতা। কবিতাগুলোতে প্রেম-ভালোবাসা, বিরহ, আনন্দ, দেশ ও প্রকৃতির নানা অনুষঙ্গ উঠে এসেছে। জীবনের চেনা অনুভূতি ও চারপাশের নানা অভিজ্ঞতা কবির নিজস্ব কল্পনা ও উপলব্ধির মধ্য দিয়ে কবিতার রূপ পেয়েছে। এর পাশাপাশি বইটিতে রয়েছে কিছু ব্যতিক্রমধর্মী কবিতা, যেখানে বিনোদনের ভিন্নধর্মী প্রয়াস লক্ষ করা যায়। বিষয়বৈচিত্র্যের এই সমাহার পাঠককে জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে ভাবার পাশাপাশি কবিতার আনন্দ উপভোগের সুযোগ করে দেবে।
প্রথম কাব্যগ্রন্থের মধ্য দিয়ে কবি শহিদুল ইসলাম বাবুল বাংলা কবিতার জগতে নিজের ভাবনা ও অনুভূতি তুলে ধরার প্রয়াস নিয়েছেন। কবিতার প্রতি ভালোবাসা, কল্পনাশক্তি এবং ব্যক্তিগত অনুভূতিকে শব্দে প্রকাশ করার আগ্রহ তাঁর এই বইয়ের মূল প্রেরণা। একজন তরুণ কবির সাহিত্যযাত্রায় প্রথম বই নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ‘কবিতার মাঝে জীবনের গল্প’ পাঠকের হৃদয়ে জায়গা করে নেবে এবং কবির আগামী দিনের সৃষ্টিশীল পথচলাকে আরও সমৃদ্ধ করবে—এমন প্রত্যাশা করা যায়।
বইটি প্রকাশ করেছে সাহিত্যদেশ। মূল্য ২০০ টাকা। অনলাইনে বইটি পেতে ভিজিট করুন রকমারি ডট কম।
আরও পড়ুন
হারিয়ে যাচ্ছে মৃৎশিল্প: বরিশালে ১৮ মৃৎশিল্পীকে সম্মাননা
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩০ পিএম
আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩০ পিএম
বিভিন্ন অঞ্চলের ১৮ জন বিশিষ্ট মৃৎশিল্পীকে সম্মাননা দেওয়া হয়। ছবি: খবরের কাগজ।
-->মাটির হাঁড়ি-পাতিল, পুতুল কিংবা শখের হাঁড়ি তৈরি করেই একসময় সংসার চলত যাদের, আজ জীবিকার তাগিদে তাদের অনেকেই অটোরিকশা ও ইজিবাইক চালাচ্ছেন। অনেকে বদলেছেন পেশা, আবার অনেকে অন্য চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। এমনকি সন্তানদেরও এ শিল্পে আসার প্রতি অনীহা তৈরি হচ্ছে। ফলে বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই মৃৎশিল্পকে টিকিয়ে রাখা নিয়ে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) নগরের বরিশাল কলেজ সংলগ্ন একটি কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত ‘১৭তম মৃৎশিল্পী সম্মেলন ও সম্মাননা-২০২৬’-এ এমন সংকটের চিত্র তুলে ধরা হয়।
সম্মেলনের উদ্বোধন করেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কনিষ্ঠপুত্র প্রকৌশলী মঈনুল আবেদিন। তিনি বলেন, ‘সুশান্ত ঘোষের মতো কয়েকজন মানুষের আন্তরিক উদ্যোগেই মৃৎশিল্পটি আজও কোনোমতে টিকে আছে। তবে এ শিল্প আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন। তিনি বলেন, ‘মৃৎশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে কেবল সম্মেলন আয়োজন করলেই চলবে না; আমাদের দৈনন্দিন জীবনে মাটির তৈরি পণ্যের ব্যবহারও বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে শিল্পীদের যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পের প্রচারে সার্বিক উদ্যোগ প্রয়োজন। এ ধরনের আয়োজন মৃৎশিল্পের পরিচিতি বাড়াবে এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করবে।’
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, সামিট পাওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) ড. মনিরুল ইসলাম আখন্দ এবং জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের সভাপতি চন্দ্রশেখর সাহা। এ ছাড়া স্থানীয় কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও বিভিন্ন সংস্কৃতিকর্মীরা এতে অংশ নেন।
আয়োজক সাংবাদিক সুশান্ত ঘোষ জানান, দুর্গোৎসব ও দেশের বর্তমান সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে এবার সংক্ষিপ্ত পরিসরে সম্মেলন আয়োজন করে ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। গত ১৭ বছর ধরে তিনি ধারাবাহিকভাবে এই আয়োজন পরিচালনা করে আসছেন।
সম্মেলনে অংশ নেওয়া শিল্পীরা জানান, সম্মাননা পেয়ে তারা আনন্দিত, তবে এ ঐতিহ্যবাহী শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহযোগিতা ও সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা এখন সময়ের দাবি। মাটির পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় কাজের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে, ফলে বাধ্য হয়ে অনেকে বিকল্প পেশায় চলে যাচ্ছেন।
দিনব্যাপী এই সম্মেলনে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল ও ঢাকা থেকে আগত প্রায় ১৫০ জন মৃৎশিল্পী অংশ নেন। সম্মেলনে প্রদর্শিত হয় তাদের হাতে তৈরি টেপা পুতুল, মাটির হাঁড়ি, পূজার বিভিন্ন উপকরণ, ঢাকনা ও কয়েলদানি। এসব শিল্পকর্মে লোকজ ঐতিহ্য ফুটে উঠলেও পাশাপাশি সামনে এসেছে শিল্পীদের জীবন-জীবিকার কঠোর বাস্তবতা।
অনুষ্ঠানের সূচনায় শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ১৮ জন বিশিষ্ট মৃৎশিল্পীকে সম্মাননা দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী ‘শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার মনসুরাবাদ ইউনিয়নের প্রবীণ মৃৎশিল্পী নিরঞ্জন পাল।
এসএম মইনুল/এএফ
