দেবী লক্ষ্মী মানেই সৌম্য, স্নিগ্ধ রূপ নয়। অধর্মের বিনাশে তিনিই ধারণ করেছিলেন অষ্টাদশভুজা যোদ্ধাদেবীর রূপ। মহারাষ্ট্রের কোলাপুরের মহালক্ষ্মী বা অম্বাবাইকে ঘিরে প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনিতে রয়েছে সেই ভয়ংকরী দেবীসত্তার পরিচয়।
দেবী লক্ষ্মী বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে শান্ত, স্নিগ্ধ, সৌম্য এক দেবীমূর্তি। যাঁর কৃপায় সংসারে আসে শ্রী, সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্য। কিন্তু দেবীর সত্তা কি কেবল এই কোমল রূপেই সীমাবদ্ধ? পৌরাণিক আখ্যান বলছে, প্রয়োজনে তিনিই ধারণ করেন ভয়ংকরী যোদ্ধার রূপ। অধর্মের বিনাশ এবং বিশ্বসংসারের ভারসাম্য রক্ষায় তাঁর সেই উগ্র, পরাক্রমশালিনী সত্তার পরিচয় মেলে মহারাষ্ট্রের কোলাপুরের মহালক্ষ্মী বা অম্বাবাইকে ঘিরে প্রচলিত কাহিনিতে।
০২ / ১০
কোলাসুরের তপস্যা ও ব্রহ্মার বরদান: পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, ব্রহ্মার তিন অসুরপুত্র ছিলেন গয়াসুর, লবণাসুর ও কোলাসুর। তাঁদের মধ্যে গয়াসুর ও লবণাসুর ছিলেন অত্যন্ত অত্যাচারী। শ্রীবিষ্ণু গয়াক্ষেত্রে গয়াসুরকে এবং লবণালয়ে লবণাসুরকে দমন করেন। দুই ভাইয়ের পরিণতিতে শোকাহত কোলাসুর প্রতিহিংসার আগুনে দগ্ধ হয়ে শতবর্ষ ধরে কঠোর তপস্যায় নিমগ্ন হন। কোলাসুরের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে ব্রহ্মা তাঁকে তিনটি বর দেন—অখণ্ড রাজ্য, বজ্রকঠিন দেহ এবং পুরুষের হাতে অবধ্যতা। বরলাভের পর কোলাসুর দক্ষিণ দেশের অধিবাসী রাক্ষসদের পরাজিত করে তাদের রাজ্য অধিকার করেন। সেই রাজ্যের নাম হয় রাক্ষসপুর।
০৩ / ১০
দীর্ঘ তপস্যার ফলে একসময় কোলাসুরের মধ্যে পরিবর্তন আসে। দেবতাদের প্রতি বিদ্বেষ ত্যাগ করে তিনি দেবী মহালক্ষ্মীর আরাধনায় মনোনিবেশ করেন। কিন্তু তাঁর চার পুত্রের চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। কোলাসুর বৃদ্ধ হয়ে পড়তেই প্রজাদের উপর অত্যাচার শুরু করে তারা।
০৪ / ১০
করবীরাসুরের উত্থান, দেবতাদের প্রতিরোধ: কোলাসুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র করবীরাসুর পিতার রাজ্যের নাম বদলে নিজের নামানুসারে রাখেন করবীরপুর। এরপর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলিও দখল করতে উদ্যত হন তিনি। তাঁর অত্যাচার ক্রমশ অসহনীয় হয়ে উঠলে হস্তক্ষেপ করেন মহাদেব। অসুরদের বধ করেন তিনি। পুত্রদের মৃত্যুতে কোলাসুরের মনে ফের জেগে ওঠে প্রতিশোধের আগুন। তিনি আবার তপস্যা শুরু করেন। তবে এবার তাঁর ক্ষোভের লক্ষ্য স্বয়ং আরাধ্যা দেবী মহালক্ষ্মী। দেবীর কৃপায় তাঁর চার পুত্রের জন্ম হয়েছে, অথচ অন্য দেবতারা তাঁদের বধ করতে সক্ষম হলেন—এই অভিযোগেই দেবীর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠেন তিনি।
০৫ / ১০
কোলাসুরের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবী তাঁকে বর দেন। সেই বর পেয়ে ফের অপরাজেয় হয়ে ওঠেন অসুররাজ। পুত্রদের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন তিনি। পাশাপাশি শর্ত দেন, আগামী একশো বছর দেবী যেন তাঁকে বাধা না দেন। এই সময়সীমার মধ্যেই নিজের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে চেয়েছিলেন কোলাসুর।
০৬ / ১০
অষ্টাদশভুজা মহালক্ষ্মীর আবির্ভাব: একশো বছর অতিবাহিত হলে সিংহের পৃষ্ঠে আরোহণ করে ফের আবির্ভূতা হন দেবী মহালক্ষ্মী। তবে এ বার তাঁর রূপ আর সৌম্য গৃহলক্ষ্মীর নয়। এ বার তিনি দুর্জয় শক্তির প্রতীক, অষ্টাদশভুজা এক যোদ্ধাদেবী। দেবীর আঠারো হাতে শোভা পাচ্ছিল বিভিন্ন অস্ত্র ও সামগ্রী—কমণ্ডলু, পানপাত্র, ধনু, খেটক, পট্টিশ, শক্তি, পাশ, ঘণ্টা, শঙ্খ, পরশু, ত্রিশূল, চক্র, গদা, বজ্র, খড়্গ, শূল, পদ্ম ও অক্ষমালা। তাঁর এই বহুভুজা রূপ যেন একই সঙ্গে সৃষ্টি, সংহার, রক্ষা ও ন্যায়প্রতিষ্ঠার বহুমাত্রিক শক্তির প্রতীক।
০৭ / ১০
ভয়ংকর যুদ্ধের পর দেবী কোলাসুরকে পরাজিত করেন। কথিত আছে, মৃত্যুর আগে কোলাসুর দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন, তাঁর নাম যেন এই ক্ষেত্রের সঙ্গে চিরকাল যুক্ত থাকে। দেবী সেই প্রার্থনা মঞ্জুর করেন। কোলাসুরের নামানুসারেই স্থানটির নাম হয় কোলাপুর।
০৮ / ১০
কোলাপুরের অম্বাবাই, শক্তির আর এক পরিচয়: মহারাষ্ট্রের কোলাপুরে অধিষ্ঠিত দেবী মহালক্ষ্মী স্থানীয় মানুষের কাছে বিশেষ ভাবে পরিচিত অম্বাবাই নামে। শক্তি-উপাসনার পরম্পরায় এই মন্দিরের গুরুত্ব অপরিসীম। পীঠনির্ণয়তন্ত্র-এ বর্ণিত একান্ন শক্তিপীঠের তালিকার সঙ্গেও কোলাপুরের নাম যুক্ত বলে প্রচলিত। সংশ্লিষ্ট পীঠবর্ণনা অনুসারে, এখানে সতীর নয়ন পতিত হয়েছিল। দেবীর ভৈরবের নাম ক্রোধীশ।
০৯ / ১০
পীঠমাহাত্ম্যের বর্ণনায় দেবী এখানে উদীয়মান সূর্যের মতো উজ্জ্বল, ত্রিনয়না, চতুর্ভুজা এবং বিবিধ অলংকারে ভূষিতা। তাঁর মস্তকে শোভা পায় নাগ। চার হাতে রয়েছে রক্তপাত্র, গদা, শ্রীফল ও খেটক।
১০ / ১০
কোলাপুরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মহালক্ষ্মী তাই কেবল ধনসম্পদ ও সৌভাগ্যের পরিচিত দেবী নন। তিনি শক্তি, সাহস এবং অশুভের বিরুদ্ধে প্রতিরোধেরও প্রতীক। তাঁর এই রূপ মনে করিয়ে দেয়, দেবীর সৌম্য সত্তা যেমন আশ্রয় ও কল্যাণের প্রতিশ্রুতি বহন করে, তেমনই তাঁর ভয়ংকরী রূপ অন্যায় ও অধর্মের বিনাশে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। (এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।)
