একটি সিনেমা ১০০ কোটি রুপি আয় করেও ফ্লপ হতে পারে, আবার ৫০ কোটি রুপি আয় করেও হিট হতে পারে। কারণ, সিনেমার সাফল্য শুধু বক্স অফিসে মোট আয়ের ওপর নির্ভর করে না। এর নির্মাণ খরচ, প্রচার ব্যয় এবং বিনিয়োগের বিপরীতে কত টাকা ফেরত এল, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি ভারতীয় সিনেমার ব্যবসা নিয়ে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কীভাবে হিসাব করা হয় সিনেমার আয়, আর কোন বিষয়গুলো একটি সিনেমাকে হিট বা ফ্লপ করে।
২০২৫ সালে ভারতের সিনেমার বক্স অফিস আয় ১৩ হাজার ৩৯৫ কোটি রুপি ছাড়িয়েছে। ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ তা ১৫ হাজার কোটি রুপি ছাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। করোনা মহামারির পর ঘুরে দাঁড়ালেও হিন্দি সিনেমার ব্যবসায় এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো দর্শকদের পছন্দ বোঝা এবং নির্মাণ খরচের সঙ্গে আয়ের সামঞ্জস্য রাখা।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’ বিশ্বব্যাপী ১ হাজার ৮৪৮ কোটি রুপি, ‘ধুরন্ধর’ ১ হাজার ৩৫০ কোটি রুপি এবং ‘ছাওয়া’ ৮০৯ কোটি রুপি আয় করেছে। অন্যদিকে, ‘ওয়ার ২’ ও ‘সিকান্দার’-এর মতো সিনেমা প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যবসা করতে পারেনি।
কীভাবে নির্ধারিত হয় হিট বা ফ্লপ?
সিনেমা প্রদর্শক অক্ষয় রাঠির মতে, একটি সিনেমা হিট না ফ্লপ, তা নির্ভর করে বিনিয়োগের বিপরীতে কতটা লাভ হলো তার ওপর। শুধু মোট আয় দিয়ে সিনেমার সাফল্য বিচার করা যায় না।
ধরা যাক, একটি সিনেমা নির্মাণ ও প্রচারে মোট ২০ কোটি রুপি খরচ হলো। সিনেমাটি থেকে প্রযোজক ও স্বত্বাধিকারীরা সব উৎস মিলিয়ে খরচের চেয়ে বেশি অর্থ ফেরত পেলে সেটি লাভজনক হতে পারে। অন্যদিকে, ১০০ কোটি রুপি খরচ করে সিনেমাটি ৮০ কোটি রুপি ফেরত পেলে, অন্যান্য আয়ও খরচ পুষিয়ে না দিলে লোকসান হবে। তবে প্রযোজকের প্রকৃত লাভ নির্ভর করে চুক্তি ও আয়ের বিভিন্ন উৎসের ওপর।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫০ কোটি রুপি আয় করা ‘টুয়েলভথ ফেইল’-এর মতো সিনেমাও হিট হতে পারে। আবার বড় বাজেটের সিনেমা ১০০ কোটি রুপি আয় করেও ফ্লপ হতে পারে। কম বাজেটে তৈরি ‘হনুমান অংশ’-এর সাফল্যও দেখিয়েছে, ব্যবসা করতে সব সময় বিপুল অর্থ খরচের প্রয়োজন হয় না।
বক্স অফিসের আয়ের হিসাব কীভাবে হয়?
বক্স অফিসে টিকিট বিক্রি থেকে যে মোট অর্থ আসে, তার পুরোটাই প্রযোজকের হাতে যায় না। প্রথমে করের হিসাব হয়। এরপর চুক্তি অনুযায়ী প্রেক্ষাগৃহের অংশ এবং পরিবেশনার খরচ বা কমিশন বাদ যায়। বাকি অর্থের কতটা প্রযোজক পাবেন, তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট চুক্তির ওপর।
বাণিজ্য বিশ্লেষক তারান আদর্শের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পরিবেশক কোনো সিনেমা কেনার পর নিজের খরচ তুলে কমিশন বা লাভ করতে পারেন। চুক্তি অনুযায়ী সেই লাভের অংশ প্রযোজক ও পরিবেশকের মধ্যে ভাগও হতে পারে।
এ ছাড়া বিদেশে সিনেমা প্রদর্শনের স্বত্ব, ডিজিটাল মাধ্যম, স্যাটেলাইট ও সংগীতের স্বত্ব বিক্রি থেকেও আয় হয়। ফলে শুধু বক্স অফিসের মোট অঙ্ক দেখে প্রযোজকের প্রকৃত আয় বা লাভ নির্ধারণ করা যায় না।
বড় তারকা থাকলেই কি সিনেমা হিট হয়?
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বড় তারকা বা বড় বাজেট সিনেমার সাফল্য নিশ্চিত করে না। প্রযোজক কুমার মঙ্গত পাঠকের মতে, গল্পের সম্ভাবনা বুঝে বাজেট নির্ধারণ করা জরুরি। অভিনেতাদের পারিশ্রমিক, শুটিং, সম্পাদনা, কারিগরি কাজ এবং প্রচারের খরচ মিলিয়ে সিনেমার মোট বিনিয়োগ হিসাব করতে হয়।
দর্শক এখন সিনেমা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে বেশি সতর্ক। তাঁরা শুধু তারকা কিংবা প্রচারণা নয়, গল্প, অভিনয় ও বিনোদনের মানও বিবেচনা করেন। তাই সিনেমা মুক্তির প্রথম তিন দিনের আয় ভালো হলেও সেটি শেষ পর্যন্ত লাভজনক হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার শুরুতে আয় কম হলেও দর্শকদের মুখে মুখে প্রশংসা ছড়িয়ে পড়লে পরবর্তী সময়ে ব্যবসা বাড়তে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার কতটা কাজে আসে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার সিনেমার খবর দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। ট্রেলার, গান, সাক্ষাৎকার ও বিজ্ঞাপন নতুন দর্শকের আগ্রহ তৈরি করতে পারে। তবে অর্থের বিনিময়ে রিভিউ বা কৃত্রিম প্রশংসা দর্শকের আস্থার ক্ষতি করতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
প্রযোজক অনুপ্রিয়া নাগরের মতে, অর্থ খরচ করে সিনেমার প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সম্ভব, কিন্তু দর্শকের ভালোবাসা কেনা যায় না। তাঁর অভিজ্ঞতায়, দর্শকদের আন্তরিক সুপারিশও সিনেমার ব্যবসা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে, একটি সিনেমা হিট না ফ্লপ, তা বুঝতে শুধু বক্স অফিসের আয় দেখলেই হবে না। নির্মাণ ও প্রচারের মোট খরচ, প্রযোজকের হাতে ফিরে আসা অর্থ এবং অন্যান্য স্বত্ব থেকে আয়, সবকিছু হিসাব করতে হবে। শেষ পর্যন্ত সিনেমার ব্যবসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দর্শকের পছন্দের সঙ্গে বাজেট ও আয়ের হিসাব মেলাতে পারা।
