দুধ থেকে ছানা তৈরির পর যে পানি উপজাত হিসেবে ফেলে দেওয়া হয়, তা দিয়েই তৈরি হচ্ছে পুষ্টিকর পানীয়। চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) গবেষকেরা ছানার পানির সঙ্গে কিনো ফলের রস মিশিয়ে তৈরি করেছেন নতুন এ পানীয়।
গবেষকদের দাবি, পানীয়টি পুষ্টিগুণসম্পন্ন হওয়ার পাশাপাশি উপকারী ব্যাকটেরিয়াসমৃদ্ধ। এরই মধ্যে চট্টগ্রামের মীরসরাই ও সীতাকুণ্ডসহ কয়েকটি এলাকায় ক্ষুদ্র পরিসরে এ পানীয় উৎপাদন ও বিপণন শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এ উদ্যোগ একদিকে দুগ্ধশিল্পের উপজাতের ব্যবহার বাড়াতে পারে, অন্যদিকে তৈরি করতে পারে নতুন উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ।
আজ ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘আজকের উদ্ভাবন আগামী সমৃদ্ধি’। খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে অপচয় কমানো এবং বিদ্যমান সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরছে দিবসটি। সেই প্রেক্ষাপটে দুগ্ধশিল্পের উপজাত ছানার পানি কাজে লাগিয়ে পানীয় তৈরির এ উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
ছানার পানি থেকে পানীয়
সিভাসুর ডেইরি অ্যান্ড পোলট্রি সায়েন্স বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. এ কে এম হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এতে বিভাগের শিক্ষার্থীরাও অংশ নেন। গবেষণায় ছানার পানির সঙ্গে কিনো ফলের রস বিভিন্ন অনুপাতে মিশিয়ে পানীয় তৈরির চেষ্টা করা হয়।
অধ্যাপক হুমায়ুন কবির বলেন, দুগ্ধশিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উপজাত হিসেবে প্রচুর পরিমাণে ছানার পানি উৎপন্ন হয়। এই ছানার পানিকে প্রক্রিয়াজাত করে মানুষের পুষ্টির চাহিদা মেটানোর উদ্দেশে গবেষণাটি শুরু করা হয়।
গবেষকেরা ছানার পানি ও কিনো ফলের রসের ছয়টি মিশ্রণ তৈরি করেন। প্রতিটি মিশ্রণে ৮ শতাংশ চিনি যোগ করা হয়। এরপর ল্যাকটোব্যাসিলাস অ্যাসিডোফিলাস নামের উপকারী ব্যাকটেরিয়া যুক্ত করে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পাঁচ ঘণ্টা গাঁজন করা হয়। পরীক্ষায় ছানার পানি ৭০ শতাংশ ও কিনো ফলের রস ৩০ শতাংশ থাকা মিশ্রণটি সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পায়।
অধ্যাপক হুমায়ুন কবির বলেন, পানীয়টিতে ছানার পানির পাশাপাশি কিনো ফলের রস ব্যবহার করা হয়েছে। কিনো ফলের রসে পর্যাপ্ত পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন এ, বি ও সি এবং ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম ও কপারের মতো খনিজ পদার্থ রয়েছে। তাই উদ্ভাবিত পানীয়টি খুবই স্বাস্থ্যসম্মত ও পুষ্টিমানসম্পন্ন।
ইনোভেশন ফেয়ারে দর্শনার্থীদের আগ্রহ
ছানার পানি দিয়ে তৈরি এ পানীয় সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ারেও প্রদর্শন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক হুমায়ুন কবির। তার ভাষ্য, মেলার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে পানীয়টি দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অনেকে এর প্রশংসা করেন এবং পণ্যটি সম্পর্কে আগ্রহ দেখান।
গবেষকদের মতে, নতুন এ পানীয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়লে দুগ্ধশিল্পের উপজাত কাজে লাগিয়ে বিকল্প পণ্য তৈরির সুযোগ তৈরি হবে। তবে আগ্রহকে বাণিজ্যিক সম্ভাবনায় রূপ দিতে হলে পণ্যের মান, উৎপাদনব্যবস্থা, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রশিক্ষণ নিয়ে উদ্যোক্তা
গবেষণার পাশাপাশি ছানার পানি দিয়ে পানীয় তৈরির প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। অধ্যাপক হুমায়ুন কবিরের তথ্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে দুই শতাধিক খামারি ও উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের মীরসরাই ও সীতাকুণ্ডসহ কয়েকটি এলাকায় ক্ষুদ্র পরিসরে পানীয়টি উৎপাদন ও বিপণন করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম নগরীর আকবর শাহ এলাকার জঙ্গল লতিফপুরের ‘দই বাজার’-এর স্বত্বাধিকারী আকবর হোসেন জাহিদ তাদের একজন। তিনি জানান, অধ্যাপক হুমায়ুন কবিরের তত্ত্বাবধানে হোয়ে বেভারেজ উন্নয়নবিষয়ক প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে উৎপাদনের কৌশল শেখেন। পরে স্থানীয় বাজারে এ পানীয় উৎপাদন ও বিক্রি শুরু করেন।
আকবর হোসেন জাহিদ বলেন, অধ্যাপক ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির স্যারের তত্ত্বাবধানে হোয়ে বেভারেজ উন্নয়নবিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশ নিয়েছি। তার প্রশিক্ষণ আমার উদ্যোক্তা জীবনের অন্যতম ভিত্তি। স্যারের দিকনির্দেশনায় হোয়ে বেভারেজ উৎপাদনের আধুনিক কৌশল আয়ত্ত করি এবং সফলভাবে স্থানীয় বাজারে পণ্যটির উৎপাদন ও বিক্রি শুরু করি।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আমার প্রতিষ্ঠান ‘দই বাজার’ হোয়ে বেভারেজ উৎপাদন ও বিপণনের মাধ্যমে নিয়মিত মুনাফা অর্জন করছে। পাশাপাশি আশপাশের কয়েকজনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পেরেছি।
মীরসরাইয়ের মিঠাছড়া বাজারে ‘সাদা কালো মিষ্টি’ প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ শফিকুল ইসলামও একই ধরনের প্রশিক্ষণ নিয়ে এ পানীয় উৎপাদন ও বিপণন শুরু করেছেন। তার ভাষ্য, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদন সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার পর নিজ উদ্যোগে ব্যবসাটি শুরু করেন।
মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, সিভাসুর অধ্যাপক ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির স্যারের তত্ত্বাবধানে হোয়ে বেভারেজ উন্নয়নবিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছি। তার দিকনির্দেশনা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে হোয়ে বেভারেজ উৎপাদনে দক্ষতা অর্জন করি। পরে নিজ উদ্যোগে এ পণ্য উৎপাদন ও বিপণন শুরু করি। বর্তমানে সফলভাবে এ ব্যবসা পরিচালনা করছি এবং স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছি।
তিনি আরও বলেন, আমার এই অর্জনের পেছনে অধ্যাপক ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির স্যারের দিকনির্দেশনা ও সহযোগিতা অনন্য ভূমিকা রেখেছে। তার অনুপ্রেরণায় হোয়ে বেভারেজ উৎপাদনের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল হতে সক্ষম হয়েছি।
দুই উদ্যোক্তার অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন পণ্য উৎপাদনের ধারণা নিয়ে স্থানীয় বাজারে ব্যবসা শুরু করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে প্রশিক্ষণ নেওয়া দুই শতাধিক ব্যক্তির মধ্যে কতজন নিয়মিত উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি।
২১ দিন সংরক্ষণের পরীক্ষা
পানীয়টির সংরক্ষণযোগ্যতা যাচাই করতেও পরীক্ষা চালিয়েছেন গবেষকেরা। অধ্যাপক হুমায়ুন কবির জানান, পানীয়টি ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রেখে ২১ দিন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা হয়। প্রতি ১০ দিন পরপর এর পিএইচ, অম্লতা ও উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা পরীক্ষা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, উদ্ভাবিত পানীয়টি ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রেখে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত আমরা সংরক্ষণ করেছি এবং ১০ দিন পরপর পিএইচ, এসিডিটি ও উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা দেখেছি। শেষ দিন পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক ছিল। তাই এই সময়ের মধ্যে ভোক্তারা পানীয়টি গ্রহণের মাধ্যমে প্রোবায়োটিকের উপকার লাভ করতে পারবেন। এ ছাড়া কীভাবে আরও দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়, তা নিয়ে গবেষণা চলমান রয়েছে।
গবেষকেরা বলছেন, পরীক্ষায় পাওয়া ফল পানীয়টির সম্ভাবনা তুলে ধরে। তবে গবেষণাগারে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণের ফলাফল বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সব পরিস্থিতিতে একই রকম হবে, তা নিশ্চিত নয়। এ জন্য উৎপাদনের পরিবেশ, জীবাণুর নিরাপত্তা, প্যাকেজিং, পরিবহন এবং নিরবচ্ছিন্ন শীতল সংরক্ষণব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।
সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রয়োজন মান নিয়ন্ত্রণ
দুগ্ধশিল্পে ছানার পানি অনেক সময় বর্জ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। অথচ যথাযথ প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে এ উপাদানকে মূল্য সংযোজিত পণ্যে রূপ দেওয়া সম্ভব। ছানার পানি ও ফলের রস দিয়ে পানীয় তৈরির এ গবেষণা সেই সম্ভাবনাই সামনে এনেছে।
তবে সম্ভাবনাকে টেকসই ব্যবসায় রূপ দিতে হলে পণ্যটির পুষ্টিমান ও নিরাপত্তা যাচাই, উৎপাদনের মান নির্ধারণ, সংরক্ষণকাল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য, উৎপাদন ব্যয় এবং বাজারের চাহিদা নিয়ে আরও কাজ প্রয়োজন। পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজলভ্য প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও মান নিয়ন্ত্রণের সহায়তা নিশ্চিত করা দরকার।
বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্যের আলোকে ছানার পানির মতো অব্যবহৃত উপাদানকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ খাদ্যসম্পদের অপচয় কমানো এবং নতুন আয়ের সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণার ফলকে নিরাপদ ও মানসম্মত পণ্যে রূপ দেওয়া গেলে দুগ্ধশিল্পের উপজাতই হয়ে উঠতে পারে নতুন সম্ভাবনার উৎস।
