মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে মূল্যবৃদ্ধিতে অর্থনীতি নিয়ে মার্কিন পরিবারগুলোর হতাশা বেড়েছে। আগামী ৩ নভেম্বরের কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা আস্থা সূচক নেমে এসেছে প্রায় রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে। শুক্রবার প্রকাশিত এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সার্ভেস অব কনজিউমারস’ জরিপ অনুযায়ী, অক্টোবরে ভোক্তা আস্থা সূচক কমে দাঁড়িয়েছে ৪৮ পয়েন্টে। সেপ্টেম্বরে চূড়ান্ত সূচক ছিল ৪৮ দশমিক ১ পয়েন্ট। রয়টার্সের জরিপে অর্থনীতিবিদেরা সূচকটি ৪৬ দশমিক ৩ পয়েন্টে নামবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। অক্টোবরে প্রাথমিক হিসাবেও সূচকটি ৪৬ দশমিক ৩ পয়েন্ট ছিল।
অক্টোবরের এই চূড়ান্ত সূচক ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। এর আগে ইরান যুদ্ধ শুরুর কিছুদিন পর গত মে মাসে সূচকটি সর্বকালের সর্বনিম্ন ৪৪ দশমিক ৮ পয়েন্টে নেমেছিল।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সার্ভেস অব কনজিউমারস’-এর পরিচালক জোয়ান হু বলেন, “অর্থনীতি সম্পর্কে ভোক্তাদের মনোভাবের ক্ষেত্রে ক্রয়ক্ষমতাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।”
তিনি আরও বলেন, “এক বছর আগের তুলনায় ভোক্তা আস্থা এখন ১০ শতাংশ কম। ইরান সংঘাত শুরুর ঠিক আগের ফেব্রুয়ারির তুলনায় কমেছে ১৫ শতাংশ।”
জরিপের ফলাফল বিভিন্ন রাজনৈতিক জরিপের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এসব জরিপে দেখা যাচ্ছে, অর্থনীতি এবং তা পরিচালনায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টির ভূমিকা নিয়ে ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে।
আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইতিমধ্যে লাখো মার্কিন ভোটার আগাম ভোট দিয়েছেন। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছরে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হবে।
জরিপগুলো বলছে, প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে রিপাবলিকানরা। সিনেটের নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে ট্রাম্পের জনসমর্থন রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে হামলা চালানোর সিদ্ধান্তের পর জ্বালানির দাম ব্যাপক বেড়ে যাওয়ায় তাঁর জনপ্রিয়তায় চাপ তৈরি হয়েছে।
স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে হতাশা বেশি
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপে রাজনৈতিক পরিচয় অনুযায়ী ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভোক্তা আস্থা কমার পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন নিজেদের স্বতন্ত্র ভোটার হিসেবে পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিরা। নির্বাচনে এ ভোটারগোষ্ঠী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সেপ্টেম্বরে স্বতন্ত্র ভোটারদের ভোক্তা আস্থা সূচক ছিল ৪৭ দশমিক ৭ পয়েন্ট। অক্টোবরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪২ দশমিক ৪ পয়েন্টে। গত মে মাসের রেকর্ড সর্বনিম্ন ৪০ দশমিক ৬ পয়েন্টের চেয়ে অবশ্য এটি কিছুটা বেশি। এদিকে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যে ভোক্তা আস্থা কিছুটা বেড়েছে।
চলতি বছর ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য উচ্চমূল্যকে দায়ী করা স্বতন্ত্র ও রিপাবলিকান ভোটারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জানুয়ারি থেকে স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে মূল্যস্ফীতির চাপে আর্থিক পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার কথা উল্লেখ করার হার বেড়েছে ২৭ শতাংশ। রিপাবলিকানদের ক্ষেত্রে এ হার বেড়েছে ৫২ শতাংশ। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে বেড়েছে ১৫ শতাংশ।
শেয়ারবাজারে যাঁদের বিনিয়োগ নেই বা সীমিত, তাঁরাও ব্যক্তিগত অর্থনীতিতে উচ্চমূল্যের নেতিবাচক প্রভাবের কথা আগের চেয়ে বেশি বলছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিনিয়োগের উত্থানে সম্প্রতি শেয়ারবাজার দ্রুত বাড়লেও এসব পরিবারের আর্থিক উদ্বেগ কমেনি।
মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বাড়ছে
জরিপে আগামী এক বছরে মূল্যস্ফীতি নিয়ে ভোক্তাদের প্রত্যাশার সূচক সেপ্টেম্বরে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে অক্টোবরে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগে ফেব্রুয়ারিতে এ প্রত্যাশা ছিল ৩ দশমিক ৪ শতাংশ।
আগামী পাঁচ বছরে মূল্যস্ফীতি নিয়ে ভোক্তাদের প্রত্যাশাও বেড়েছে। সেপ্টেম্বরে এ হার ছিল ৩ দশমিক ৪ শতাংশ, অক্টোবরে তা বেড়ে হয়েছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। যুদ্ধ শুরুর পরপর মার্চে এ হার ছিল ৩ দশমিক ২ শতাংশ।
অক্টোবরে ভোক্তা আস্থা জরিপের সঙ্গে প্রকাশিত মূল্যস্ফীতি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে জোয়ান হু সতর্ক করে বলেন, করোনাভাইরাস মহামারির পর থেকে মূল্যস্ফীতি নিয়ে উচ্চ প্রত্যাশা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় তা নিয়ন্ত্রণে ফেডারেল রিজার্ভের প্রচেষ্টা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকটির লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশে নামিয়ে আনা। পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে এ লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।
হু লিখেছেন, “ভোক্তারা ব্যাপকভাবে মনে করছেন, মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। এ বছর মূল্যস্ফীতি নিয়ে প্রত্যাশা বৃদ্ধির প্রবণতা কোনো একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।”
তিনি আরও বলেন, অর্থনীতি নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব থাকা সত্ত্বেও সামগ্রিক ভোক্তা ব্যয় তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। এ বিষয়টিও সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে দাম আরও বাড়তে পারে—এ আশঙ্কায় যদি মানুষ আগেভাগে কেনাকাটা করে থাকে, তাহলে মূল্যস্ফীতি কমানো আরও কঠিন হতে পারে।
সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সম্ভাবনা
আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে বৈঠকে বসবেন ফেডারেল রিজার্ভের কর্মকর্তারা। গত দুই সপ্তাহে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশিত হলেও নীতিনির্ধারণী সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সম্ভাবনাই বেশি।
সেপ্টেম্বরে সুদের হার দশমিক ২৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়ানোর পর বর্তমানে তা ৩ দশমিক ৭৫ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। অধিকাংশ ফেড কর্মকর্তা সুদের হার আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নীতিনির্ধারক পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার আগে আরও তথ্য-উপাত্তের জন্য অপেক্ষা করার পক্ষেও মত দিয়েছেন।
সূত্র: রয়টার্স
এমএস/
