রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি ও বিকল্প অর্থায়নের উৎস খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। তবে জোরপূর্বক নয়; রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করেই প্রত্যাবাসন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষা ও মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রতিনিধিদল।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) কক্সবাজারের উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান কমিটির সভাপতি জাহরাত আদিব চৌধুরী।
তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তুলে ধরা পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কাজ করবে। এজন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিস্তারিত পরিকল্পনা জানতে চাওয়া হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংসদীয় কূটনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার উদ্যোগ নেয়া হবে।’
এর আগে সকালে কমিটির সভাপতি জাহরাত আদিব চৌধুরীর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদল উখিয়ার বিভিন্ন আশ্রয়শিবির পরিদর্শন করে। এ সময় রোহিঙ্গাদের জীবনযাপন, মানবিক সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা, নিবন্ধন, খাদ্য বিতরণ ও আবাসন পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন তারা। প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা হলেন- এস কে আজিজুল বারী, সৈয়দ সাঈদ আল নোমান, সানজিদা ইসলাম তুলি ও মীর আহমদ বিন কাসেম।
পরিদর্শনের অংশ হিসেবে প্রতিনিধিদলটি ছয় নম্বর আশ্রয়শিবিরের আরাকান ও মিয়ানমারের ঐতিহ্য কেন্দ্র, নয় নম্বর আশ্রয়শিবিরের তুর্কি ফিল্ড হাসপাতাল এবং চার নম্বর আশ্রয়শিবিরে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির খাদ্য বিতরণকেন্দ্র ঘুরে দেখে। পরে ক্যাম্প ইনচার্জের কার্যালয়ে রোহিঙ্গা যুবক, নারী ও কমিউনিটি নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তারা।
মতবিনিময়ে রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, তরুণদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ, নিরাপত্তা এবং প্রত্যাবাসন নিয়ে নিজেদের উদ্বেগ ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। তাদের দাবি, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কার্যকর আলোচনা জোরদার করতে হবে।
ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কামাল হোসেন বলেন, ‘সংসদীয় প্রতিনিধিদলটি বিভিন্ন আশ্রয়শিবির পরিদর্শন শেষে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে। এ সময় তাদের বিভিন্ন সমস্যা ও চাহিদার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গা শিশু, নারী ও তরুণদের শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানো জরুরি। এজন্য অনলাইনে শিক্ষাব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনা নিয়েও প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।’ রোহিঙ্গাদের এসব সমস্যা সমাধানে প্রতিনিধিদল প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গার সভাপতি সৈয়দ উল্লাহ বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও কার্যকর প্রত্যাবাসনের জন্য প্রতিনিধিদলের কাছে দাবি জানানো হয়েছে। প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গারা অনির্দিষ্টকাল শরণার্থীশিবিরে বসবাস করতে চান না। দীর্ঘদিন ক্যাম্পে অবস্থানের কারণে শিশুদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করে যত দ্রুত সম্ভব নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।’
রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে আসাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জাহরাত আদিব চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকার পরিবর্তনের কারণে মানবিক সহায়তায় অর্থায়নের আগ্রহ কমছে। এতে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার দায়িত্ব দীর্ঘদিন বহন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।’
এ পরিস্থিতিতে প্রচলিত অর্থায়নের পাশাপাশি বিকল্প উৎস অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জাকাত তহবিল রোহিঙ্গাদের সহায়তায় কাজে লাগানোর সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পক্ষ থেকে আগেও সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
জাহরাত আদিব চৌধুরী বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট কোনো একটি দেশের একক সমস্যা নয়। এর সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সক্রিয় হতে হবে। বিশেষ করে মুসলমান দেশগুলোর কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে সাম্প্রতিক আলোচনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি সংসদ সদস্যরা কীভাবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনার উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে পারেন, তা নিয়েও আলোচনা হবে।’
রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিনের অনিশ্চিত জীবন, বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন কমিটির সভাপতি। তিনি বলেন, ‘প্রায় ১০ বছর ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করলেও রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত। তাদের একটি বড় অংশ নারী ও শিশু। বিপুলসংখ্যক তরুণের শিক্ষার সুযোগ সীমিত এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।’
ক্যাম্প পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, রোহিঙ্গা কমিউনিটির তরুণ নেতাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তাদের বাস্তব সমস্যা ও প্রত্যাশা জানার চেষ্টা করা হয়েছে। মানবাধিকারের মৌলিক শর্ত অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘অতীতে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেক আলোচনা ও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগে প্রকৃত ভুক্তভোগীদের জীবনমান কতটা উন্নত হয়েছে এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।’
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন জাহরাত আদিব চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘শুধু রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠালেই সংকটের সমাধান হবে না। তাদের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত না হলে প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না। জোর করে পাঠানোর পর আবার ফিরে আসার পরিস্থিতি তৈরি হলে তা কোনো কার্যকর সমাধান হতে পারে না।’
তিনি জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্যোগ জোরদার করেছে। প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটিও এ বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করবে এবং সংকটের টেকসই সমাধান না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পাশে থাকার চেষ্টা করবে।
একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীও পানি, স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাপের মুখে পড়ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী- উভয়ের সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। পরিদর্শনে পাওয়া তথ্য ও সুপারিশ সংসদ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে তুলে ধরা হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে বিকেলে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ে সরকারি প্রতিনিধি, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, এনজিও এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে সংসদীয় প্রতিনিধিদল। প্রায় দেড় ঘণ্টার ওই বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান পরিস্থিতি, মানবিক সহায়তা, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন এবং প্রত্যাবাসনের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, রোহিঙ্গা সংকটের কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং মিয়ানমারে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি জরুরি। নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করে স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন কার্যকর করাই এখন বাংলাদেশের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
