কমিশন বাড়ানো, গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করা, প্রশাসনিক হয়রানি বন্ধসহ সাত দাবিতে আগামী ১৫ ও ১৬ অক্টোবর সারাদেশে এলপিজির দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড।
সোমবার দুপুরে ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে এ ঘোষণা দেন সংগঠনের সভাপতি মো. সেলিম খান।
তিনি বলেন, “আগামী ১৫ তারিখ বৃহস্পতিবার এবং ১৬ তারিখ শুক্রবার—এই দুই দিন আমাদের সারা বাংলাদেশে সকল গ্যাসের দোকানপাট বন্ধ ঘোষণা করা হইল।”
এ দুদিনের মধ্যে সমস্যার সমাধান না হলে পরে সারাদেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য এলপিজি দোকান বন্ধ রাখা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন সেলিম খান।
সংবাদ সম্মেলনে এলপিজি ব্যবসায়ীদের সাত দফা দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—পরিবেশকদের কমিশন বাড়ানো, কোম্পানিগুলোর সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান ও জরিমানার নামে হয়রানি বন্ধ করা।
সেলিম খান বলেন, পাঁচ বছর আগে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) পরিবেশকদের জন্য সিলিন্ডারপ্রতি ৫০ টাকা কমিশন নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু এর মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম, পরিবহন খরচ, সিলিন্ডার ওঠানো-নামানোর খরচ, গুদাম ভাড়া ও লাইসেন্স ফি বেড়েছে।
এসব কারণে কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা অথবা বিক্রয়মূল্যের ৭ শতাংশ নির্ধারণের দাবি এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির।
এর আগে বিইআরসিকে দেওয়া চিঠিতে সংগঠনটি বলেছিল, কোম্পানি থেকে পরিবেশকের গুদাম পর্যন্ত একটি সিলিন্ডার আনতে ৫০ টাকা করে খরচ হয়। সিলিন্ডার ওঠানো-নামানো ও খুচরা বিক্রেতার কাছে পৌঁছাতে আরও ৩৫ টাকা লাগে। কর্মচারীর বেতন, গুদাম ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য খরচ ২৫ টাকা।
এর সঙ্গে ৪০ টাকা মুনাফা ধরে সিলিন্ডারপ্রতি ১৫০ টাকা কমিশন দাবি করা হয় চিঠিতে।
সংবাদ সম্মেলনে সেলিম খান অভিযোগ করেন, বিইআরসি প্রতি মাসে এলপিজির দাম ঘোষণা করলেও কিছু কোম্পানি পাঁচ থেকে সাত দিন পর আবার দাম পরিবর্তন করে। এতে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।
কোম্পানিগুলো মাসে একাধিকবার দাম পরিবর্তন করতে চাইলে বিইআরসির মাধ্যমেই তা ঘোষণার দাবি জানান তিনি।
এলপিজির সরবরাহ সংকট নিয়েও কথা বলেন সমিতির সভাপতি সেলিম খান। তার দাবি, বর্তমানে ছয় থেকে সাতটি কোম্পানি ছাড়া বেশিরভাগ কোম্পানি গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। অনেক কোম্পানি ঋণপত্র খুলতে না পারায় সারাদেশে কয়েক লাখ সিলিন্ডার অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।
এসব সিলিন্ডার সরকারি উদ্যোগে অথবা অন্য কোম্পানির মাধ্যমে পুনরায় গ্যাস ভরে বাজারে সরবরাহের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।
সিলিন্ডার পরিবহনে পুলিশের হয়রানির অভিযোগও তোলেন সেলিম খান।
সেলিম খান বলেন, নিরাপত্তার জন্য পিকআপ ও ট্রাকে রেলিং রাখা প্রয়োজন। রেলিং না থাকলে কোম্পানিগুলো সিলিন্ডার সরবরাহ করে না।
কিন্তু গাড়িতে রেলিং থাকার কারণে ট্রাফিক পুলিশ মামলা দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ সমস্যা সমাধানে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়েও কোনো ফল পাওয়া যায়নি বলে ভাষ্য এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির।
কোম্পানিগুলোর চালানে প্রকৃত দাম উল্লেখ করা এবং যেসব কোম্পানি পরিবেশকের গুদামে সিলিন্ডার পৌঁছে দেয় না, তাদের ন্যায্য পরিবহন ভাড়া দেওয়ারও দাবি জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ব্যবসায়ীদের অন্যায়ভাবে জরিমানা করার অভিযোগও তোলেন সেলিম খান।
বাগেরহাটে এক পরিবেশকের গুদাম থেকে সিলিন্ডার নিয়ে যাওয়া ও জরিমানা করার ঘটনা তুলে ধরে তিনি এসব অভিযান বন্ধের দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলন চলাকালে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে বলে জানান সেলিম খান।
তার দাবি, বিইআরসি চেয়ারম্যান ব্যবসায়ীদের দাবিগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
তবে চেয়ারম্যানের এ বক্তব্যের বিষয়ে বিইআরসির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে গত ৮ জানুয়ারি প্রশাসনিক অভিযান ও জরিমানার প্রতিবাদে দেশজুড়ে এলপিজি সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ রেখেছিলেন ব্যবসায়ীরা। পরে বিইআরসির সঙ্গে বৈঠক এবং দাবি পূরণের আশ্বাসে ওই দিন বিকালে ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়।
এবারের কর্মসূচি এমন সময়ে ঘোষণা করা হল, যখন বাজারে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
গত ৪ অক্টোবর বিইআরসি ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। কিন্তু রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এখনো সরকার নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার মিলছে না।
অন্যদিকে এলপিজি আমদানিকারকদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) দাবি করেছে, দেশে এলপিজির আমদানি ও সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে। বিইআরসি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে যারা এলপিজি বিক্রি করছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষেও অবস্থান জানিয়েছে সংগঠনটি।
