Published on
:
2 min read
অর্ঘ্য বিশ্বাস, লাটাগুড়ি
গত বছর দুর্গাপুজোর কথা মনে পড়লে আজও ভয়ে সিঁটিয়ে ওঠেন ধীরাজ। বাবাকে নিয়ে তখন হায়দরাবাদের হাসপাতালে যমে–মানুষে টানাটানি। দিনরাত এক করে লড়াই করছেন। কোন দিকে যাবেন!
মায়ের চোখের জল মোছাবেন, নাকি বাবার কষ্ট। কী করে যে ষষ্ঠী থেকে দশমী পার হয়েছে, বুঝতেই পারেননি। মাকে নিয়ে হায়দরাবাদের একটা ভাড়া বাড়িতে। বাজার করা, রান্নার কাজে মাকে সাহায্য, হাসপাতালে গিয়ে বাবাকে দেখভাল করা। পুজোর সময়ে ঘরবন্দি হয়েই সময় কেটেছে। মৃন্ময়ীকে দেখার ভাগ্য হয়নি কারও। তিন মাস থাকার পরে সকলে বাড়ি ফেরেন। এ বছর অবশ্য স্বস্তি। পুজোর আনন্দ ফিরে এসেছে পরিবারে।
৪৬ বছরের নরেশ রায়ের সিরোসিস অফ লিভার হওয়ায় তাঁকে নিজের যকৃতের (লিভার) অংশ দিয়ে সাক্ষাৎ মৃত্যুমুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন ধীরাজ। সাধারণত সন্তানকে বাঁচাতে নিজেদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিতে বিন্দুমাত্র সংকোচ বোধ করেন না মা–বাবা। উল্টো এক কাহিনির চিত্রনাট্যকার ধীরাজ রায়। জলপাইগুড়ির লাটাগুড়ির জঙ্গল লাগোয়া প্রত্যন্ত উত্তর ঝাড়মাটিয়ালি এলাকায় বাড়ি নরেশের। পেশায় গ্রামীণ চিকিৎসক। অগ্ন্যাশয়ের (প্যানক্রিয়াটাইটিস) অসুখে ভুগছিলেন তিনি। ২০২৫–এর মাঝামাঝি চিকিৎসার জন্য হায়দরাবাদে গিয়ে নরেশ জানতে পারেন, তিনি লিভারের জটিল অসুখে আক্রান্ত।
এরপরে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে, দ্রুত লিভার প্রতিস্থাপন না–করলে প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হয়। কিন্তু এত কম সময়ে কী ভাবে লিভার ডোনার খুঁজে পাওয়া যাবে? এই চিন্তায় যখন গোটা পরিবার নাজেহাল, ঠিক তখন বাবাকে লিভারের অংশ দান করার জন্য এগিয়ে আসেন ছেলে বিরাজ এবং মেয়ে পল্লবী। দু'জনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। বাবার সঙ্গে ছেলের রক্তের নমুনা মিলে যাওয়ায় ধীরাজ লিভারের অংশ দেবেন বলে ঠিক হয়। তবে সেই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে কিছুটা আইনি জটিলতা থাকলেও রোগীর শারীরিক অবস্থার বিষয়টি বিবেচনা করে গত বছর অক্টোবরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া শেষ করেন।
এই প্রক্রিয়ায় রায় পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন লাটাগুড়ির বাসিন্দা, তবলা বাদক সুজয় দেব। কয়েক বছর আগে তিনি নিজেও লিভার প্রতিস্থাপন করিয়েছিলেন। নরেশ বলেন, 'এক সময়ে হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। একে চিকিৎসার বিপুল খরচ, তার উপরে লিভার প্রতিস্থাপনের জন্য ডোনার খুঁজে বের করা— সবটাই এত কম সময়ের মধ্যে করতে হতো যে, আমরা খেই হারিয়ে ফেলেছিলাম।'
