ভিসিসহ ১১ জনকে উদ্ধার, পানি-বিদ্যুৎ বন্ধ থাকায় অসুস্থ হয়ে পড়েন কয়েকজন
প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সহায়তায় ক্যাম্পাস ছেড়েছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম।
প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সহায়তায় ক্যাম্পাস ছেড়েছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তাঁকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে বের করে নিয়ে যান। এ সময় উপাচার্যের সঙ্গে ভবনে অবরুদ্ধ থাকা আরও ১০ জনও ক্যাম্পাস ছাড়েন।
সাবেক ভিসি অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা গত সোমবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে উপাচার্য ভবনের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন। এরপর থেকে উপাচার্যসহ শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা ও অ্যালামনাইদের কয়েকজন সেখানে আটকা পড়েন। দীর্ঘ সময় ভবনটির পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ থাকায় অবরুদ্ধ ব্যক্তিদের অনেকে অসুস্থ ও ক্লান্ত বোধ করেন। সোমবার দিবাগত রাতে অসুস্থ হয়ে পড়া একজনকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
মঙ্গলবার সকালেও ভিসি ভবনের ফটকে তালা ঝুলছিল। অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হতে ভিসি প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন। পরে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের হস্তক্ষেপে তাঁর ক্যাম্পাস ত্যাগের মধ্য দিয়ে প্রায় ৩০ ঘণ্টার অবরুদ্ধ অবস্থার অবসান ঘটে। তবে উপাচার্যকে ঘিরে তৈরি হওয়া সংকটের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমাধান হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পরদিন থেকেই সাবেক ভিসিকে পুনর্বহালের দাবিতে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। একই দাবিতে শিক্ষক সমিতিও কর্মবিরতি পালন করে আসছে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে নতুন ভিসি এত দিন ক্যাম্পাসে যেতে পারেননি। সোমবার দায়িত্ব গ্রহণের ১৭ দিন পর সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন নেতাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি নিজের কার্যালয়ে যান। এ সময় ভিসি ভবনের ফটকের আগের তালা ভেঙে প্রবেশের অভিযোগ ওঠে।
খবর পেয়ে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ভিসি ভবনের সামনে অবস্থান নেন। তাঁরা ভিসিকে দুপুর ১২টার মধ্যে কার্যালয় ছেড়ে যাওয়ার সময় বেঁধে দেন। কিন্তু তিনি কার্যালয় না ছাড়ায় বেলা সাড়ে ১২টার দিকে ভবনের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন আন্দোলনকারীরা।
এরপর ভিসি ভবনের ভেতরে আটকা পড়েন অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমসহ ১০ থেকে ১২ জন। তাঁদের মধ্যে চুয়েট শাখা ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও অ্যালামনাই ছিলেন। রাতে একজন অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁকে হাসপাতালে পাঠানো হলে অবরুদ্ধ ব্যক্তির সংখ্যা কমে আসে।
অবরুদ্ধ অবস্থায় ভিসি ভবনের পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। সন্ধ্যার পর ভবনটি অন্ধকারে ঢেকে যায়। দীর্ঘ সময় একই ভবনে আটকে থাকায় অনেকে শারীরিক অস্বস্তি, ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যার কথা জানান।
মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে ভিসি অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম বলেন, “সোমবার থেকে ভবনের পানি-বিদ্যুৎসহ সব ইউটিলিটি সার্ভিস বন্ধ। এখানে যারা আছেন, তাঁদের বেশিরভাগই অসুস্থ বোধ করছেন। অনেকের মোবাইল বন্ধ হয়ে গেছে। বাকিদের মোবাইলও কিছুক্ষণ পর বন্ধ হয়ে যাবে।”
তিনি বলেন, “যদি পাওয়ার ব্যাংক দিয়ে না যায়, তাহলে তাঁরা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন না। আমারও একটি মোবাইল বন্ধ হয়ে গেছে। এটি চালু আছে। এটাও বেশিক্ষণ চালু থাকবে না।”
অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য মঙ্গলবার সকাল থেকেই প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন বলে জানান তিনি।
সোমবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে উপাচার্য ভবনের ভেতরে একজন অসুস্থ হয়ে পড়েন। খবর পেয়ে চুয়েটের চিকিৎসাকেন্দ্রের চিকিৎসক মো. আবদুল্লাহ সেখানে যান। এ সময় সাংবাদিকেরাও ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেন।
সেখানে চুয়েটের অ্যালামনাই প্রকৌশলী শাহরিয়ারের রক্তচাপ পরীক্ষা করে উচ্চ রক্তচাপ পাওয়া যায়। পরে তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
তখন উপাচার্য বলেছিলেন, “আমি সুস্থ আছি। আমাদের দুইজন অ্যালামনাই উচ্চ রক্তচাপের জটিলতায় ভুগছেন। তাই অ্যাম্বুলেন্স ও চিকিৎসক ডেকেছি।”
তিনি আরও বলেন, “এখানে যেহেতু আমরা দীর্ঘ সময় ধরে অবরুদ্ধ আছি, তাই সবাই অসুস্থ ও ক্লান্ত অনুভব করছেন। কেউ কেউ সাফোকেশনে ভুগছেন।”
মঙ্গলবার সকালে উপাচার্য জানান, রাতে চিকিৎসক ও অ্যাম্বুলেন্স এলেও অসুস্থ ব্যক্তিকে ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আন্দোলনকারীরা বাধা দেন বলে তাঁর অভিযোগ। পরে রাত ৪টার দিকে তাঁকে শহরে নেওয়া সম্ভব হয়।
অবরোধের মধ্যে সোমবার সন্ধ্যায় ভিসি ভবনের ভেতরে অবস্থানরত ব্যক্তিদের জন্য কলা, পাউরুটি, বিস্কুট ও পানির বোতল পাঠান আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। বন্ধ ফটকের ভেতরে খাবার পৌঁছে দিয়ে হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা করা হয়, অবরুদ্ধ ব্যক্তিদের জন্য খাবার রাখা হয়েছে।
ভবনের ভেতরে অবস্থানরত চুয়েট শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ বলেন, উপাচার্য কার্যালয়ের ভেতরেই ছিলেন। সেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও অ্যালামনাইসহ ১০ থেকে ১২ জন আটকা পড়েছিলেন।
তাঁর ভাষ্য, উপাচার্য বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করছিলেন এবং আলোচনার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। তবে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে তখন পরিস্থিতির সমাধান করা সম্ভব হয়নি।
সোমবার রাতে ক্যাম্পাসে সংবাদ সম্মেলন করে নতুন ভিসি অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের পদত্যাগ দাবি করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তাঁদের ঘোষণা ছিল, ভিসি পদত্যাগ করে চলে গেলে ভবনের তালা খুলে দেওয়া হবে। অন্যথায় সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত অবরোধ চলবে।
এক আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী বলেন, তাঁদের দাবি উপেক্ষা করে উপাচার্য কার্যালয়ে প্রবেশ করেছেন। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বড় অংশ তাঁকে মেনে নিচ্ছেন না বলেও দাবি করেন তিনি।
শিক্ষার্থীরা আরও অভিযোগ করেন, চুয়েটের শিক্ষার্থীদের বহনকারী বাসে হামলার ঘটনা ঘটেছে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, মদুনাঘাট ও চান্দগাঁও এলাকায় দুই দফায় হামলা হয়। তবে এসব ঘটনায় কারা জড়িত, তা নিশ্চিত করা যায়নি।
ভিসি ক্যাম্পাস ছাড়লেও সাবেক ভিসিকে পুনর্বহালের দাবিতে চলমান আন্দোলন ও ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির বিষয়ে শিক্ষার্থীদের অবস্থান পরিবর্তনের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ভিসিকে অবরুদ্ধ করার ঘটনার মধ্যেই অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের সঙ্গে সব কাজে ‘সর্বাত্মক অসহযোগিতা’র ঘোষণা দেয় চুয়েট শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও স্টাফ অ্যাসোসিয়েশন।
