Published on
:
2 min read
বুদ্ধদেব বেরা, সাঁকরাইল
পুজোকে কেন্দ্র করে মন্দিরের চারিদিকে বসে মেলা। কালের স্রোতে বেশ কিছু আচার-আচরণ হারিয়ে গেলেও আজও অটুট রয়েছে দেবীকে চাষের উৎকৃষ্ট মানের ফসল নিবেদন করা। সারা বছর লোধা-শবরদের হাতে মা জয়চণ্ডী তন্ত্র-মন্ত্র ছাড়ায় পূজিত হন। শুধু দুর্গাপুজোর পাঁচটি দিন তাঁদের হাতেই দুর্গা রূপে পুজো নেন জয়চণ্ডী। পুজোকে কেন্দ্র করে উৎসবে মুখরিত হয় ৩৬ মৌজার বাসিন্দা। দীর্ঘ কয়েকশো বছর ধরে এ ভাবে পূজিত হয়ে আসছেন ঝাড়গ্রামের সাঁকরাইল ব্লকের পাথরকাটির মা জয়চণ্ডী।
ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত জয়চণ্ডীকে দুর্গা রূপে পুজো করেন লোধা-শবররা। পুজো দেওয়ার জন্য ভিড় হয় প্রবল। অষ্টমীর পুজোতে দেবীকে আপেল, কলা, নারকেল–সহ নানা ফল নিবেদন করা হয়। তাই সেই দিন পুজো শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ ফল খায় না। অতীতে পুজোর সময়ে বাজার থেকে কেনা সিঁদুর ছাড়া কোনও নৈবেদ্য ছিল না। দেওয়া হতো এলাকাবাসীর ঘর থেকে আনা দুধ, আতব চাল, দুর্বা। মন্দিরের পুরোহিত লোধা-শবর জনজাতির শিশির প্রামাণিক বলেন, ‘মূর্তিহীন শিলাখণ্ডকেই পুজোর কয়েকটা দিন দেবী দুর্গা রূপে তন্ত্র-মন্ত্র ছাড়াই পুজো করা হয়। পূর্বপুরুষের আমল থেকে আমরা পুজো করে আসছি।’ অঙ্গারনালির বাসিন্দা সুশীল মাহাতো বলেন, ‘আগের মতো অনেক নিয়ম আর নেই। কিন্তু তাতেও পুজোয় ভিড় উপচে পড়ে মানুষের। দূর দূরান্ত থেকে পুজো দেখতে আসেন সবাই।’ লোধা-শবর, আদিবাসী জনজাতির মানুষ প্রকৃতিকেই ঈশ্বর মেনে পুজো করেন। মন্দিরে জয়চণ্ডীর কোনও মূর্তি নেই। একটি শিলাখণ্ড জয়চণ্ডী রূপে পূজিত হন। যা মাড়হ থান নামেও পরিচিত। কথিত আছে, কয়েকশো বছর আগে সাঁকরাইলের পাথরায় গভীর জঙ্গল ছিল। সেই জঙ্গলের মাঝে একটি শিলাখণ্ডকে দেবতা জ্ঞানে পুজো করতেন হেম-হাতিরাম-প্রেমচাঁদ নামে তিন লোধা-শবরের পূর্বপুরুষ এক দম্পতি। ওডিশার প্রহরাজ মহারাজ নামে এক জমিদারের একটি বিশাল মহিষের পাল হারিয়ে যায়। সব জায়গায় খুঁজেও প্রহরাজ মহারাজ তাঁর মহিষের পালের খোঁজ পাননি। শেষে মহারাজ দেবী জয়চণ্ডীর স্বপ্ন পান। পাথরার গভীর জঙ্গলে তাঁর হারিয়ে যাওয়া মহিষের পাল রয়েছে। সেই মতো পাথরার জঙ্গলে গিয়ে মহারাজ দেখেন এক শবর দম্পত্তি একটি শিলাখণ্ডকে ঈশ্বর রূপে পুজো করছেন। তাঁর চারিদিকে ছাড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে মহিষের পাল। তিনি খুঁজে পান তাঁর মহিষ। এরপরেই মহারাজ শিলাখণ্ডের চারপাশে মন্দির গড়ে তোলার আশ্বাস দেন ওই লোধা-শবর দম্পতিকে। সেই মতো মন্দিরও গড়ে দেন প্রহরাজ মহারাজ। তারপরেই জঙ্গলের মধ্যে থাকা বনদেবীর নাম হয়ে উঠে মা জয়চণ্ডী। বংশপরম্পরায় হেম-হাতিরাম-প্রেমচাঁদের বংশধররা জয়চণ্ডীর পুজো করে চলেছেন।
পাথরকাটি, বাঁকড়া, অঙ্গারনালি, পাথরা, মানিকঝাঁটিয়া, রাজাগ্রাম, কাটনিমাড়ো–সহ ৩৬টি মৌজার বাসিন্দা এখন দুর্গাপুজোয় মেতে ওঠে। কথিত রয়েছে, দুর্গা পুজোর এক মাস ধরে স্থানীয় জনগোষ্ঠী যেমন, লোধা-শবররা চাং নাচ, আদিবাসীরা ভুয়াং এবং কুড়মিরা তাঁদের কাঠি নাচে মেতে উঠতেন। তবে সেই নাচের জৌলুস এখন কমেছে। পুজোর জন্য ৩৬ মৌজা থেকে কলসি ভর্তি দুধ-ঘি আসত পুজোর সময়ে। তা–ও আর আসে না। তবে চাষের উৎকৃষ্ট মানের ফসল লাউ, কুমড়ো, পেঁপে, ঝিঙা নিবেদন করা হয় দেবীকে।
