Published on
:
6 min read
মূল গল্প: দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য জার্মান স্টুডেন্ট | লেখক: ওয়াশিংটন আরভিং
ভাষান্তর: কুমার সেনগুপ্ত
ফরাসি বিপ্লবের রক্তক্ষয়ী ও অস্থির দিনগুলোর এক ঝড়-বৃষ্টিভেজা রাতে এক তরুণ জার্মান ছাত্র গভীর রাতে প্যারিসের পুরোনো শহরাঞ্চলের সরু গলি ধরে নিজের বাসস্থানের দিকে ফিরছিল। বিদ্যুতের তীব্র ঝলকানি বারবার আকাশ চিরে ফেলছিল, আর বজ্রধ্বনির প্রচণ্ড গর্জন প্রতিধ্বনিত হয়ে কাঁপিয়ে দিচ্ছিল উঁচু উঁচু বাড়িতে ঘেরা সেই সঙ্কীর্ণ রাস্তাগুলো। তরুণটির নাম গটফ্রিড ভল্ফগাং। সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। কিছুদিন তিনি গটিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর স্বভাব ছিল স্বপ্নবিলাসী, কল্পনাপ্রবণ এবং প্রবল আবেগপ্রবণ। নিভৃত জীবন, একাগ্র অধ্যবসায় এবং তাঁর অধ্যয়নের অদ্ভুত বিষয়বস্তু— সব মিলিয়ে তাঁর শরীর ও মন, উভয়ের ওপরই গভীর প্রভাব ফেলেছিল। স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছিল। কল্পনাশক্তি এক রকম বিকারগ্রস্ত হয়ে উঠেছিল। কবে, কী ভাবে এই ধারণা তাঁর মনে জন্মেছিল, তা বলা কঠিন, কিন্তু তিনি দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে, কোনও অশুভ শক্তি তাঁকে অনুসরণ করছে। কোনও দুষ্ট আত্মা যেন তাঁকে ফাঁদে ফেলে সর্বনাশের দিকে ঠেলে দিতে বদ্ধপরিকর। তাঁকে পাঠানো হলো প্যারিসে— পড়াশোনা শেষ করার জন্য, আর সেই সঙ্গে জীবনের জৌলুস ও আনন্দময় পরিবেশে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাওয়ার আশায়।
কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, ভল্ফগাং প্যারিসে পৌঁছলেন ঠিক সেই সময়ে, যখন ফরাসি বিপ্লবের আগুন জ্বলে উঠেছে। আগের চেয়েও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লেন। প্যারিসের ছাত্রপল্লি ‘পে লাতাঁ’-এর একটি নির্জন বাড়িতে নিজেকে একেবারে গুটিয়ে নিলেন। সোরবোনের প্রাচীন মঠের ধূসর প্রাচীরের কাছাকাছি এক বিষণ্ণ গলিতে তাঁর বাসা। সেখানেই আবার ডুবে গেলেন তাঁর প্রিয় সব অলীক চিন্তায়। কখনও ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতেন প্যারিসের বিশাল গ্রন্থাগারগুলিতে— সেই সব গ্রন্থাগার যেন মৃত লেখকদের সমাধিক্ষেত্র। ঠিক এমনই এক সময়ে, যখন তাঁর মন কল্পনার চরম উত্তেজনায় আচ্ছন্ন, তিনি এক আশ্চর্য স্বপ্ন দেখলেন। স্বপ্নে তিনি এক অপরূপ সুন্দরীর মুখ দেখলেন। সেই মুখের ছাপ তাঁর মনে এত গভীর ভাবে গেঁথে গেল যে, একই স্বপ্ন তিনি বারবার দেখতে লাগলেন। দিনের বেলায় সেই মুখ তাঁর চিন্তাকে তাড়া করে ফিরত, রাতের ঘুমে আবার সে ফিরে আসত।
এক ঝোড়ো রাতে তিনি প্যারিসের প্রাচীন অঞ্চল মারেই-র অন্ধকার, জনশূন্য গলিপথ ধরে নিজের বাসায় ফিরছিলেন। আকাশে অবিরাম বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল, আর বজ্রধ্বনির প্রতিধ্বনি উঁচু বাড়িগুলোর মাঝখানে বন্দি হয়ে আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছিল। হাঁটতে হাঁটতে তিনি এসে পৌঁছলেন প্লাস দ্য গ্রেভে—সেই অভিশপ্ত চত্বরে, যেখানে জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হতো। বিদ্যুতের ক্ষণিক ঝলক প্রাচীন হোটেল দ্য ভিলের চূড়াগুলোকে মুহূর্তের জন্য আলোকিত করে আবার অন্ধকারে ডুবিয়ে দিচ্ছিল। সেই বিচ্ছিন্ন আলোয় সামনে বিস্তৃত শূন্য চত্বরটি কখনও স্পষ্ট, কখনও অস্পষ্ট হয়ে উঠছিল। ঠিক তখনই ভল্ফগাং আতঙ্কে সরে দাঁড়ালেন। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি এসে দাঁড়িয়েছেন গিলোটিনের একেবারে সামনে।
ঠিক সেই সময়ে তাঁর চোখ পড়ল ফাঁসির মঞ্চে ওঠার সিঁড়ির নীচে কুঁকড়ে বসে থাকা একটি ছায়ামূর্তির ওপর। বিদ্যুতের একের পর এক ঝলক সেই অবয়বটিকে ক্রমশ স্পষ্ট করে তুলল। একজন নারী। কালো পোশাক পরা। তিনি সিঁড়ির নীচের ধাপে বসে আছেন, শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে, মুখ লুকোনো দুই হাঁটুর মধ্যে। তাঁর দীর্ঘ, এলোমেলো কালো চুল মুষলধারে বৃষ্টিতে ভিজে মাটিতে নেমে এসেছে। গভীর সহানুভূতিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে ভল্ফগাং তাঁর কাছে এগিয়ে গেলেন এবং নরম কণ্ঠে কথা বললেন। নারীটি ধীরে ধীরে মুখ তুললেন। বিদ্যুতের এক প্রচণ্ড ঝলক তাঁর মুখ আলোকিত করে দিলো। আর সেই মুখ দেখেই ভল্ফগাং যেন স্তব্ধ হয়ে গেলেন। বিস্ময়ে তাঁর সমস্ত শরীর কেঁপে উঠল। এ তো সেই মুখ! ঠিক সেই মুখ, যা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত তাঁর স্বপ্নে ফিরে এসেছে। এমন ঝড়-বৃষ্টির রাতে, এমন নির্জন স্থানে একা বসে থাকা কতখানি বিপজ্জনক, তা বোঝাতে চাইলেন। তিনি বিনীত ভাবে জিজ্ঞেস করলেন, তাঁকে কি তাঁর আত্মীয়স্বজনের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়? নারীটি কোনও উত্তর দিলেন না। শুধু ধীরে ধীরে হাত তুলে গিলোটিনটির দিকে ইঙ্গিত করলেন। সেই একটি ইঙ্গিতের মধ্যেই এমন এক ভয়ঙ্কর অর্থ লুকিয়ে ছিল যে, ভল্ফগাংয়ের শরীর হিম হয়ে গেল। তারপর শান্ত, নিঃস্ব কণ্ঠে তিনি বললেন, এই পৃথিবীতে আমার আর কেউ নেই। ভল্ফগাং মৃদুস্বরে বললেন, তবু নিশ্চয়ই আপনার কোনও বাড়ি আছে?
নারীটির ঠোঁটে এক অদ্ভুত, বেদনাময় হাসি ফুটে উঠল।
— আছে... কবরের মধ্যে।
ভল্ফগাং কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তার পর গভীর আন্তরিকতায় বললেন, একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ যদি আপনার কাছে এমন প্রস্তাব দেওয়ার দুঃসাহস করে, তবে আপনি যেন ভুল না বোঝেন। আমার বাসা খুবই সামান্য, কিন্তু অন্তত এই ভয়াবহ রাতটা সেখানে নিরাপদে কাটাতে পারবেন। আমি নিজেও এই শহরে একা, এ দেশেও আমি একজন বিদেশি।
তরুণটির কণ্ঠে এমন এক অকৃত্রিম সততা ছিল, যা অভিনয় করে প্রকাশ করা যায় না। তার বিদেশি উচ্চারণও নারীটির মনে বিশ্বাস জাগিয়েছিল। গৃহহীন সেই রহস্যময়ী নারী শেষ পর্যন্ত নিঃশর্ত ভাবে নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব ভল্ফগাংয়ের হাতে সমর্পণ করলেন।
ভল্ফগাং তাঁর টলোমলো পদক্ষেপে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে তাঁকে নিয়ে পঁ ন্যফ সেতু পার হলেন। পথে সেই জায়গাটিও অতিক্রম করলেন, যেখানে এক সময়ে রাজা চতুর্থ অঁরির মূর্তি দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু বিপ্লবী জনতা তা ভেঙে ফেলেছে। ততক্ষণে ঝড় অনেকটাই থেমে এসেছে। সমগ্র প্যারিস যেন অস্বাভাবিক নীরব। মনে হচ্ছিল, মানুষের উন্মত্ত আবেগের সেই আগ্নেয়গিরি আপাতত ঘুমিয়ে আছে, পরদিন আবার আরও ভয়াবহ বিস্ফোরণের শক্তি সঞ্চয়ের জন্য। ছাত্রটি তাঁর সঙ্গিনীকে নিয়ে পে লাতাঁর প্রাচীন গলি পেরিয়ে সোরবোনের অন্ধকার প্রাচীরের পাশ দিয়ে সেই পুরোনো, মলিন হোটেলে পৌঁছলেন, যেখানে তিনি থাকতেন। বৃদ্ধা দ্বাররক্ষিণী দরজা খুলে তাঁদের দেখে বিস্ময়ে চোখ বড় করে তাকিয়ে রইল। চিরবিষণ্ণ, নিঃসঙ্গ ভল্ফগাংয়ের পাশে এক অচেনা নারী— এ দৃশ্য সে আগে কখনও দেখেনি।
নিজের ঘরে ঢুকেই ভল্ফগাং প্রথমবারের মতো অস্বস্তি অনুভব করলেন। এতদিন এই ঘর তাঁর কাছে যথেষ্টই ছিল, কিন্তু আজ হঠাৎ মনে হলো, এর দারিদ্র্য আর অনাড়ম্বরতা যেন চোখে পড়ার মতো। তাঁর ছিল মাত্র একটি ঘর— একটি পুরোনো বৈঠকখানা। এক সময়ে নিশ্চয়ই তা ছিল কোনও অভিজাত পরিবারের ঐশ্বর্যের নিদর্শন। লুক্সেমবুর্গ প্রাসাদের আশপাশের যেসব প্রাসাদ একদিন অভিজাতদের ছিল, এ হোটেলও ছিল তাদেরই একটি। এখন ঘরের চারদিকে বই, কাগজপত্র আর একজন ছাত্রের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছড়িয়ে রয়েছে। এক কোণের গহ্বরের মতো অংশে তাঁর ছোট্ট শয্যাটি পাতা।
আলো জ্বালানো হলে ভল্ফগাং প্রথমবার শান্ত ভাবে নারীটির মুখের দিকে তাকানোর সুযোগ পেলেন। আর সেই মুহূর্তেই তাঁর মুগ্ধতা আরও গভীর হয়ে উঠল। এমন সৌন্দর্য তিনি আগে কখনও দেখেননি। কেবল একটি অলঙ্কারই তাঁর শরীরে দেখা গেল— গলার চারপাশে বাঁধা চওড়া কালো ফিতা, যার মাঝখানে বসানো রয়েছে কয়েকটি উজ্জ্বল হিরে। সেই একটিমাত্র অলঙ্কার তাঁর সমগ্র রূপকে আরও অদ্ভুত, আরও রহস্যময় করে তুলেছিল।
এ বার ভল্ফগাংয়ের সামনে এক নতুন সমস্যা দেখা দিলো। এই অসহায় নারীকে কোথায় রাখা যায়? তিনি ভাবলেন, নিজের ঘরটিই তাঁর জন্য ছেড়ে দেবেন, আর নিজে অন্য কোথাও রাত কাটাবেন। কিন্তু আশ্চর্য, নারীটির কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার শক্তি তাঁর আর রইল না। যেন তাঁর রূপের মধ্যে এক অদৃশ্য সম্মোহন লুকিয়ে আছে। নারীটির আচরণও ছিল বিস্ময়কর। গিলোটিনের কথা তিনি আর একবারও উল্লেখ করলেন না। কিছুক্ষণ আগের সেই অসহায় শোকও যেন অনেকটা মিলিয়ে গেছে।
সেই আবেগময় মুহূর্তে ভল্ফগাং আর নিজের অনুভূতিকে সংযত রাখতে পারলেন না। তিনি অকপটে জানিয়ে দিলেন, তিনি নারীটিকে ভালোবেসে ফেলেছেন। নিজের সেই অদ্ভুত স্বপ্নের কথাও খুলে বললেন— কী ভাবে বহুদিন আগে থেকেই তিনি এই মুখটি স্বপ্নে দেখে আসছেন, কী ভাবে বাস্তবে দেখার আগেই সেই অচেনা নারীর কাছে তাঁর হৃদয় আত্মসমর্পণ করেছে। তাঁর কথা শুনে নারীটিও গভীর ভাবে আলোড়িত হলেন। কিছুক্ষণ নীরব থেকে স্বীকার করলেন, তিনিও প্রথম দেখাতেই এই তরুণের প্রতি এমন এক অজ্ঞাত আকর্ষণ অনুভব করেছেন, যার কোনও যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারেন না। মনে হচ্ছিল, অদৃশ্য কোনও শক্তি যেন তাঁদের দু’জনকে বহু আগেই এক অমোঘ বন্ধনে বেঁধে রেখেছিল।
তিনি নারীটির দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, আমরা কেন আলাদা থাকব? আমাদের হৃদয় তো ইতিমধ্যেই এক হয়ে গেছে। যুক্তি আর সম্মানের বিচারে আমরা এখন আর দু’জন নই, একজন। আপনার আর কোনও ঘর নেই, কোনও পরিবারও নেই। আমাকে আপনার সব কিছু হতে দিন। বরং আমরা দু’জনই পরস্পরের সমস্ত হয়ে উঠি। এই নিন, আমার হাত। আজীবনের জন্য আমি নিজেকে আপনার হাতে সমর্পণ করছি।
নারীটি ধীরে ধীরে তাঁর প্রসারিত হাতের দিকে তাকালেন। তার পর গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, ‘চিরদিনের জন্য’?
— হ্যাঁ, চিরদিনের জন্য।
নারীটি তাঁর হাত নিজের হাতে তুলে নিলেন। তাঁর ঠোঁট কেঁপে উঠল।
— তা হলে আমি আপনারই।
কথাগুলো প্রায় ফিসফিস করে উচ্চারণ করেই তিনি ধীরে ধীরে ভল্ফগাংয়ের বুকে মাথা রেখে ঢলে পড়লেন।
পরদিন খুব ভোরে ভল্ফগাং ঘুমন্ত নববধূকে শয্যায় রেখে বেরিয়ে পড়লেন। তাঁর মনে এক নতুন জীবনের স্বপ্ন। এখন আর এই ছোট্ট ঘরে থাকা সম্ভব নয়। বেশ কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে ঘরে ঢুকতেই তাঁর চোখে পড়ল এক অদ্ভুত দৃশ্য। নারীটি এখনও শুয়ে আছেন, কিন্তু তাঁর মাথা খাটের এক পাশ থেকে নীচের দিকে ঝুলে পড়েছে। একটি হাতও ঝুলে রয়েছে বাইরে। ভল্ফগাং প্রথমে মৃদু স্বরে তাঁকে ডাকলেন। কোনও উত্তর এল না। তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তাই কাছে গিয়ে তাঁর হাতটি আলতো করে ধরলেন। কিন্তু হাতটি ছিল বরফের মতো ঠান্ডা। কোনও স্পন্দন নেই। মুখটিও ভয়ঙ্কর রকমের ফ্যাকাশে— মৃত মানুষের মতো। পরমুহূর্তেই তিনি বুঝতে পারলেন, নারীটি আর বেঁচে নেই। তাঁর সামনে শুয়ে আছে একটি মৃতদেহ।
ভল্ফগাংয়ের আর্তচিৎকারে মুহূর্তের মধ্যে গোটা বাড়ি উত্তাল হয়ে উঠল। বৃদ্ধা দ্বাররক্ষিণী, অন্য ভাড়াটেরা সবাই ছুটে এল। ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হলো। কেউ কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না। শেষ পর্যন্ত খবর দেওয়া হলো পুলিশের কাছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন পুলিশ অফিসার এসে ঘরে প্রবেশ করলেন। কিন্তু মৃতদেহটির দিকে একবার তাকিয়েই তিনি যেন আতঙ্কে পিছিয়ে গেলেন। তাঁর মুখ মুহূর্তে বিবর্ণ হয়ে উঠল। বিস্ফারিত চোখে তিনি মৃতদেহটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
ভল্ফগাং ছুটে গিয়ে তাঁর হাত চেপে ধরলেন।
— আপনি কি এই মহিলাকে চেনেন?
পুলিশ অফিসার বিস্ময়ে প্রায় চিৎকার করে উঠলেন, চিনি? এ-ই তো সেই মহিলা, যাঁর গতকাল গিলোটিনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে!
কথাগুলো শুনে ভল্ফগাং যেন পাথর হয়ে গেলেন। তিনি অবিশ্বাসের চোখে কখনও পুলিশ-অফিসারের দিকে, কখনও মৃতদেহটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। যেন তাঁর সমস্ত বোধশক্তি এক মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
পুলিশ অফিসার ধীরে ধীরে মৃতদেহটির কাছে এগিয়ে গেলেন। তিনি নারীটির গলার চারপাশে বাঁধা চওড়া কালো ফিতেটি খুলতে শুরু করলেন। ভল্ফগাং বিস্ময়ে দেখছিলেন। পরের মুহূর্তেই এমন এক দৃশ্য ঘটল, যা মানুষের কল্পনারও অতীত। কালো ফিতেটি খুলে যেতেই নারীটির মাথাটি দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ধপ করে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল।
ভল্ফগাং যেন উন্মাদের মতো আর্তনাদ করে উঠলেন।
— শয়তান! শয়তান আমাকে গ্রাস করেছে! সে শেষ পর্যন্ত আমাকে নিজের ফাঁদে ফেলেছে! আমার আর মুক্তি নেই! আমি চিরকালের জন্য ধ্বংস হয়ে গেছি!
তিনি নিজের চুল ছিঁড়তে লাগলেন, অসংলগ্ন কথা বলতে লাগলেন। তাঁকে শান্ত করার জন্য সবাই প্রাণপণ চেষ্টা করল, কিন্তু কিছুতেই লাভ হলো না।
সেই আঘাত তিনি আর কখনও সামলে উঠতে পারেননি। তাঁর বুদ্ধি সম্পূর্ণ বিকারগ্রস্ত হয়ে গেল। অল্পদিনের মধ্যেই তাঁকে উন্মাদাগারে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানেই এক সময়ে তাঁর জীবনের করুণ সমাপ্তি ঘটে।
এ পর্যন্ত বলে ভূতুড়ে কাহিনির সেই বৃদ্ধ কথক তাঁর বর্ণনা শেষ করলেন।
কিছুক্ষণ নীরবতা। তার পর শ্রোতাদের মধ্যে একজন, যিনি এতক্ষণ গভীর মনোযোগ দিয়ে সব শুনছিলেন, কৌতূহলভরে প্রশ্ন করলেন, আপনি বলতে চাইছেন, ঘটনাটি সম্পূর্ণ সত্য?
বৃদ্ধটি শান্ত, দৃঢ় স্বরে উত্তর দিলেন, সত্য বলেই জানি। এতে সন্দেহের কোনও কারণ নেই। আমি এই কাহিনি এমন একজনের কাছ থেকেই শুনেছি, যার চেয়ে নির্ভরযোগ্য সাক্ষী আর হতে পারে না।
লোকটি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কে তিনি?
বৃদ্ধের ঠোঁটে রহস্যময় এক হাসি
ফুটে উঠল।
— সেই জার্মান ছাত্র নিজেই। প্যারিসের উন্মাদাগারে আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলাম। তাঁর নিজের মুখ থেকেই এই কাহিনি শুনেছি।
