উচ্চশিক্ষায় পিএইচডিধারী শিক্ষকের ঘাটতি কমানো, গবেষণার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় উন্নয়নে গবেষণালব্ধ জ্ঞান কাজে লাগানোর লক্ষ্যে আগামী পাঁচ বছরে দেশে-বিদেশে অন্তত ৩ হাজার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। একই সময়ে হায়ার এডুকেশন অ্যাক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পের আওতায় গবেষণায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা অনুদান দেওয়া হবে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) সন্ধ্যায় সাভারের ব্র্যাক সিডিএমে হিট প্রকল্পের আওতায় এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহযোগিতায় আয়োজিত ‘জুনিয়র ফ্যাকাল্টি প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের’ প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সমাপনী অনুষ্ঠানে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ এসব পরিকল্পনার কথা জানান।
অনুষ্ঠানে অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চাহিদার তুলনায় পিএইচডিধারী শিক্ষক ও দক্ষ গবেষকের সংখ্যা এখনো পর্যাপ্ত নয়। এ ঘাটতি দূর করতে চলতি বছর ইউজিসির পিএইচডি ফেলোশিপের সংখ্যা ৪০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। আগামী বছর এ ফেলোশিপের সংখ্যা ৫০০-তে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে উচ্চশিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন এবং গবেষণায় আন্তর্জাতিক মান অর্জনের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা জরুরি।
হিট প্রকল্পের আওতায় গবেষণায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা অনুদান দেওয়ার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, গবেষণায় অর্থায়নের ক্ষেত্রে প্রস্তাবের গুণগত মান, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং দেশের বাস্তব সমস্যার সমাধানে গবেষণার সম্ভাব্য অবদানকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা গবেষণা প্রস্তাব জমা দিতে পারবেন। নিরপেক্ষ মূল্যায়নের ভিত্তিতে যোগ্য গবেষণা উপপ্রকল্প নির্বাচন করে অর্থায়ন করা হবে। এর মাধ্যমে গবেষণার মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের প্রয়োজনভিত্তিক গবেষণাকে উৎসাহিত করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ তুলে ধরে অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, হিট প্রকল্পের আওতায় প্রভাষক থেকে অধ্যাপক পর্যন্ত বিভিন্ন পদমর্যাদার পাঁচ হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, ডিন ও কোষাধ্যক্ষসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নেতৃত্ব, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক পরিচালনা বিষয়ে দক্ষতা বাড়াতে কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালনকারীদের সিদ্ধান্ত উচ্চশিক্ষার মান, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেকেরই দায়িত্ব গ্রহণের আগে উচ্চশিক্ষা প্রশাসন পরিচালনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ হয় না। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় একাডেমিক পরিকল্পনা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহি ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা অপরিহার্য। তাই শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জন্য এ ধরনের প্রশিক্ষণ আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন।
হিট প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে গাজীপুরে একটি উচ্চশিক্ষা প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা জানান ইউজিসি চেয়ারম্যান। এ একাডেমিতে নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের তিন থেকে ছয় মাসের আবাসিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ঢাকার বাইরে আরও একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রস্তাবিত প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোকে বহুমাত্রিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের পাশাপাশি সরকারের নীতিনির্ধারক এবং শিল্প খাতের নেতাদেরও এসব প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা হবে। এতে বিভিন্ন খাতের মধ্যে সহযোগিতা বাড়বে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান, দক্ষতা ও গবেষণাকে জাতীয় উন্নয়নের কাজে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষাদান, গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের শিখনপ্রক্রিয়ার আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও দক্ষতা এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদাও পূরণ করতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকেরা যেন শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নিজেদের সীমাবদ্ধ না রাখেন, বরং উদ্যোক্তা হওয়া, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রে নিজেদের জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগানোর সক্ষমতা অর্জন করেন, সে লক্ষ্যেও উচ্চশিক্ষাব্যবস্থাকে প্রস্তুত করতে হবে।
তিনি জানান, দেশের উচ্চশিক্ষার গুণগত পরিবর্তন, প্রাসঙ্গিকতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে একটি কৌশলগত পরিকল্পনা (স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান) তৈরি করা হয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মিলিত সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে হিট প্রকল্পের পরিচালক অধ্যাপক ড. আসাদুজ্জামান বলেন, এ প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে। এর মাধ্যমে উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় কৌশলগত পরিবর্তন আনা এবং ভবিষ্যতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।
গত ৯ থেকে ১৪ অক্টোবর ছয় দিনব্যাপী এ প্রশিক্ষণে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২ জন শিক্ষক অংশ নেন। সমাপনী অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ কাউন্সিল বাংলাদেশের ডেপুটি ডিরেক্টর মারিয়া রেহমান, অ্যাডভান্স এইচইর জ্যেষ্ঠ পরামর্শক মার্ক ফিলিপ ও’হারা, হিট প্রকল্পের চিফ প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর অধ্যাপক সেলিনা জামান, ফ্যাকাল্টি প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট স্পেশালিস্ট অধ্যাপক ড. মো. আবদুস সালাম এবং সিনিয়র কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট মো. জিল্লুর রহমানসহ ইউজিসি, হিট প্রকল্প ও ব্রিটিশ কাউন্সিলের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।