নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে পারদ থেকে স্বর্ণ তৈরির দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক একটি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান। ম্যারাথন ফিউশন নামের প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ফিউশন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন নিউট্রন কাজে লাগিয়ে বিষাক্ত পারদকে স্থিতিশীল স্বর্ণে রূপান্তর করা সম্ভব হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির এ দাবি এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
গত ২১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটি এ সাফল্যের কথা জানায়। তাদের দাবি, এ পদ্ধতিতে স্বর্ণ তৈরির হার ইউরোপীয় পারমাণবিক গবেষণা সংস্থা সার্নের ২০২৫ সালে নথিবদ্ধ রেকর্ডের তুলনায় ১০ গুণ বেশি।
পারদ থেকে স্বর্ণ তৈরির ধারণা বহু শতাব্দী ধরে অ্যালকেমি বা ধাতু রূপান্তরের স্বপ্নের অংশ ছিল। তবে আধুনিক বিজ্ঞানে পারমাণবিক রূপান্তরের মাধ্যমে এক মৌলকে অন্য মৌলে পরিণত করা সম্ভব হলেও, তা বাস্তবে কতটা কার্যকর ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ম্যারাথন ফিউশনের বর্ণনা অনুযায়ী, তাদের পদ্ধতি পারমাণবিক রূপান্তরপ্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কোনো মৌলের মৌলিক পরিচয় বদলায় না। কিন্তু পরমাণুর নিউক্লিয়াসে পরিবর্তন ঘটালে এক মৌল থেকে অন্য মৌল তৈরি করা সম্ভব।
এ প্রক্রিয়ায় ফিউশন বিক্রিয়ায় উৎপন্ন উচ্চশক্তির নিউট্রনের সংস্পর্শে পারদের একটি নির্দিষ্ট আইসোটোপ মার্কারি-১৯৮ আনা হয়। এতে মার্কারি-১৯৭ তৈরি হয়, যা তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত স্থিতিশীল গোল্ড-১৯৭ বা স্বর্ণে পরিণত হয়।
এর আগে ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে পরিচালিত পরীক্ষার ভিত্তিতে সার্নের গবেষকেরা ২০২৫ সালে লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে স্বর্ণ তৈরির তথ্য প্রকাশ করেন। তাঁদের পরীক্ষায় উৎপন্ন স্বর্ণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২৯ পিকোগ্রাম, যা অত্যন্ত সামান্য।
ম্যারাথন ফিউশন আগের রেকর্ডের তুলনায় ১০ গুণ বেশি হারে স্বর্ণ উৎপাদনের দাবি করলেও মোট কতটুকু স্বর্ণ তৈরি হয়েছে, এর বিশুদ্ধতা কত, উৎপাদনপ্রক্রিয়ার কার্যকারিতা কেমন এবং ব্যয় কত- এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেনি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির দাবির যথার্থতা ও বাস্তব কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা কঠিন।
বাণিজ্যিকভাবে এ প্রযুক্তি কাজে লাগানো সম্ভব হলে ভবিষ্যতে স্বর্ণ উৎপাদনের ধারণায় পরিবর্তন আসতে পারে। ম্যারাথন ফিউশন আগে ধারণা দিয়েছিল, একটি বাণিজ্যিক ফিউশন বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বছরে প্রায় দুই টন স্বর্ণ উৎপাদন করা সম্ভব হতে পারে। তবে এটি এখনো তাত্ত্বিক হিসাব। এর বাস্তবায়ন নির্ভর করছে বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর ফিউশন চুল্লি নির্মাণ এবং প্রযুক্তিটির সফল প্রয়োগের ওপর।
প্রতিষ্ঠানটি ক্যানসার নির্ণয় ও চিকিৎসায় ব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ তৈরির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে।
বিজ্ঞানীরা পারমাণবিক রূপান্তরের মাধ্যমে স্বর্ণ তৈরির সম্ভাবনা সম্পর্কে অবগত থাকলেও, বিপুল প্রযুক্তিগত জটিলতা, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা এর বাণিজ্যিক প্রয়োগকে কঠিন করে তুলেছে। তাই ম্যারাথন ফিউশনের দাবি সত্য প্রমাণিত হলেও, বড় পরিসরে স্বর্ণ উৎপাদন অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে কি না, তা নিশ্চিত হতে আরো গবেষণা, কারিগরি তথ্য প্রকাশ এবং স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন। তথ্যসূত্র: এনডিটিভি
সানা/ডিসি/আপ্র/২৫/১০/২০২৬
