বিচিত্র পৃথিবীর জলে-স্থলে লুকিয়ে রয়েছে নানা বিস্ময়। অনেক কিছু আলোর সামনে এলেও এখনো আড়ালে অসংখ্য অধ্যায়। প্যাসিফিক লিংকড—অদ্ভুত প্রজাতির একটি মাছের নাম। এ মাছের চোয়ালে ৫৫৫টি দাঁত রয়েছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাছটি যত দ্রুত নতুন দাঁত তৈরি করে, তত দ্রুতই পুরোনো দাঁত হারায়। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০টি দাঁত হারায় এই মাছ।
উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বসবাস করে প্যাসিফিক লিংকড মাছ। পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় শিকারি স্বভাবের এই মাছের দৈর্ঘ্য প্রায় ২০ ইঞ্চি (৫০ সেন্টিমিটার)। তবে কিছু কিছু লিংকড মাছের দৈর্ঘ্য ৫ ফুট (১.৫ মিটার) পর্যন্তও দেখা গেছে।
মাছটির মুখের গঠন ও কার্যকারিতা বুঝতে হলে মানুষের মুখ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা অনেকটাই ভুলে যেতে হবে। মানুষের মতো কর্তনদাঁত, পেষণদাঁত কিংবা শ্বদন্তের পরিবর্তে লিংকড মাছের চোয়ালে রয়েছে শত শত ধারালো ও অণুবীক্ষণিক আকারের দাঁত। মুখের ওপরের শক্ত তালুও শত শত ক্ষুদ্র দাঁতে ঢাকা, যেগুলো দেখতে অনেকটা ছোট ছোট ঝুলন্ত স্ট্যালাকটাইটের মতো। এ ছাড়া, এক জোড়া চোয়ালের পেছনে রয়েছে আরেক জোড়া অতিরিক্ত চোয়াল। এগুলোকে বলা হয় ‘ফ্যারিঞ্জিয়াল জ’। মানুষের পেষণদাঁত যেভাবে খাবার চিবিয়ে ভাঙতে সাহায্য করে, মাছটি অনেকটা একইভাবে খাবার চিবোতে এই চোয়াল ব্যবহার করে।
স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মুখের সঙ্গে তুলনা করলে এই ব্যবস্থা অদ্ভুত মনে হতে পারে। তবে জীববিজ্ঞানী কোহেনের মতে, অস্থিময় মাছের ক্ষেত্রে লিংকড মাছের মুখের গঠন খুব একটা ব্যতিক্রম নয়। আর সে কারণেই প্রজাতিটি গবেষণার জন্য বেশ উপযোগী। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো প্রাণীর দাঁত থেকে তার খাদ্যাভ্যাস ও কী ধরনের খাবার সে খায়, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
দাঁত সহজে জীবাশ্মে পরিণত হয় বলেও গবেষণায় এগুলোর গুরুত্ব অনেক। লাইভ সায়েন্সকে কোহেন বলেন, “অনেক প্রজাতির ক্ষেত্রে জীবাশ্মের নথিতে দাঁতই সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। আবার কোনো কোনো প্রজাতির অস্তিত্বের একমাত্র প্রমাণও হতে পারে তাদের দাঁত।”
মাছের ফেলে যাওয়া দাঁত প্রায়ই পাওয়া যায় বলে দাবি বিজ্ঞানীদের। এ মাছের দাঁত প্রচুর পরিমাণে ঝরে পড়ে। কিন্তু কোহেনের ভাষায়—“প্রচুর বলতে ঠিক কতটা, সে সম্পর্কে আমাদের সঠিক কোনো ধারণাই নেই।”
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কোহেন ও গবেষণাটির প্রধান লেখক এমিলি কার ২০টি প্রশান্ত মহাসাগরীয় লিংকড মাছকে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের ফ্রাইডে হারবার গবেষণাগারের ট্যাংকে রাখেন। কার ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার জীববিজ্ঞানের স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী। লিংকড মাছের দাঁত এতটাই ছোট যে অ্যাকুয়ারিয়ামের তলদেশ থেকে সেগুলো সংগ্রহ করে দাঁত ঝরে পড়ার হার নির্ধারণ করা সহজ ছিল না। তাই গবেষকরা ভিন্ন একটি পদ্ধতি গ্রহণ করেন।
প্রথমে মাছগুলোকে হালকা লাল রঙের রঞ্জক মেশানো পানির ট্যাংকে রাখা হয়। এতে মাছের দাঁত লাল হয়ে যায়। পরে মাছগুলোকে ফ্লুরোসেন্ট সবুজ রঙের রঞ্জক মেশানো পানির আরেকটি ট্যাংকে স্থানান্তর করা হয়। এতে দাঁতগুলো আবার সবুজ রঙে রঞ্জিত হয়। এরপর এমিলি কার মাছগুলোর দাঁতযুক্ত হাড়গুলো অন্ধকার গবেষণাগারে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে রেখে পরীক্ষা করেন। লিংকড মাছের মুখের বিভিন্ন দাঁতযুক্ত অংশে ক্ষুদ্র লাল ও সবুজ দাঁতের অনুপাত হিসাব করেন তিনি। সব মিলিয়ে ২০টি মাছ থেকে ১০ হাজারের বেশি দাঁত গণনা করেন।
মজার ছলে এমিলি কার বলেন, “কোহেন আমাকে ছোট একটি ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে রেখেছিল। আর আমি সেখান থেকে একটা গবেষণাপত্র নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলাম।”
গবেষণায় দেখা গেছে, লিংকড মাছ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০টি দাঁত হারায়। মাছটির মুখের বিভিন্ন অংশের দাঁত ঝরে পড়ার হারও এক নয়। উদাহরণ হিসেবে, ফ্যারিঞ্জিয়াল চোয়ালের দাঁত মুখের অন্যান্য অংশের দাঁতের তুলনায় অনেক দ্রুত ঝরে পড়ে। প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে কোহেন বলেন, “আমাদের পরীক্ষায় মাছকে খাবার খাওয়ানোর ফলে নতুন দাঁত প্রতিস্থাপনের হার বাড়েনি। তাহলে অন্য কী কারণে এই হার বাড়তে পারে বা আদৌ কী বাড়ে?” *লাইভ সায়েন্স অবলম্বনে
