অপরাধের ইতিহাসে এমন কিছু ছবি থাকে, যা দেখার পর কেবল মেরুদণ্ড দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে যায় না, বরং মানবজাতির অন্ধকার দিকটি নিয়ে স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়। তেমনই একটি ছবি ১৪ বছর বয়সী মার্কিন তরুণী রেজিনা কে ওয়াল্টার্সের। ছবিতে দেখা যায়, এলোমেলো চুল, কালো পোশাক ও হাই হিল পরা একটি মেয়ে পরিত্যক্ত এক শস্যগোলায় হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছে আর তার চোখেমুখে জমে রয়েছে মৃত্যুর অমোঘ আতঙ্ক। সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, ক্যামেরাটির ওপারে দাঁড়িয়ে যে মানুষটি এই মুহূর্তটি ফ্রেমবন্দি করছিল, সে আর কেউ নয় এক নৃশংস সিরিয়াল কিলার, যে ছবি তোলার ঠিক কিছুক্ষণ পরই মেয়েটির প্রাণপ্রদীপ নিভিয়ে দেয়।
এক নর-পিশাচের খাঁচায় থাকা দিনগুলি
১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের প্যাসাডেনা শহরের বাসিন্দা ১৪ বছর বয়সী কিশোরী রেজিনা ওয়াল্টার্স তার ১৮ বছর বয়সী প্রেমিক রিকি লি জোন্সের সঙ্গে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের লক্ষ্য ছিল মেক্সিকো গিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করা। জীবনের নতুন অধ্যায়ের খোঁজে তারা হাইওয়েতে গাড়ি থামিয়ে লিফট (Hitchhiking) নেওয়ার চেষ্টা করছিল।
কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, তাদের লিফট দেওয়ার জন্য যে ট্রাকটি এসে থামে, তার চালক ছিল রবার্ট বেন রোডস। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ এই দূরপাল্লার ট্রাকচালকটি প্রকৃতপক্ষে ছিল এক ভয়ংকর মনস্তাত্ত্বিক ঘাতক ও সিরিয়াল কিলার।
রোডস তার বিশাল ১৮ চাকার ট্রাকটির ভেতরের পেছনের ঘুমানোর জায়গাটিকে (Sleeper Berth) একটি আস্ত গোপন নির্যাতন কক্ষে রূপান্তর করেছিল। শব্দ নিরোধক দেয়াল, শিকল, হাতকড়া, চাবুক এবং নানা ধরনের বিপজ্জনক সরঞ্জাম দিয়ে তৈরি এই চলন্ত বন্দিশালাই ছিল তার অপরাধের রাজত্ব।
চলন্ত ট্রাকের নরকযন্ত্রণার সেই দিনগুলি
গোয়েন্দাদের ধারণা অনুযায়ী, রেজিনা ও রিকিকে ট্রাকে তোলার পরপরই রিকি লি জোন্সকে হত্যা করে রোডস এবং তার মরদেহ দূরে কোথাও ফেলে দেয়। এরপর সে কিশোরী রেজিনাকে নিজের ট্রাকে বন্দি করে ফেলে।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ জুড়ে রেজিনার জন্য শুরু হয় এক অবর্ণনীয় নরকযন্ত্রণা। রোডস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে দূরপাল্লার ট্রাক চালিয়ে ঘুরে বেড়াত, আর পেছনের গোপন প্রকোষ্ঠে চাবুক ও শিকলে বন্দি করে চলত কিশোরী রেজিনার ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। তার লম্বা চুলগুলো এলোমেলো ও বিশ্রীভাবে কেটে দেয় রোডস, যাতে তাকে চেনা না যায়।
ইলিনয়ের শস্যগোলা এবং সেই শেষ মুহূর্ত
১৯৯০ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকে রোডস তার ট্রাক নিয়ে ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের আই-সেভেন্টি (I-70) মহাসড়কের পাশে এক নির্জন জায়গায় থামে। সেখানে থাকা একটি পরিত্যক্ত শস্যগোলায় (Barn) সে রেজিনাকে নিয়ে যায়।
সেখানে রেজিনাকে জোর করে একটি কালো ড্রেস এবং হাই হিল জুতো পরানো হয়। রোডস ক্যামেরা হাতে নিয়ে রেজিনাকে ছবি তোলার জন্য পোজ দিতে বাধ্য করে। রেজিনা যখন বুঝতে পারে যে তার জীবনের আর কয়েক মুহূর্ত বাকি, তখন সে আতঙ্কে হাত দুটো ওপরের দিকে তুলে বাধা দেওয়ার আকুতি জানায়। ক্যামেরার ফ্লাশের সেই আলোতেই স্থায়ী হয়ে যায় রেজিনার জীবনের শেষ মূহূর্তটি। ছবি তোলার পরই তার ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় এবং শস্যগোলার ভেতরেই তার দেহ ফেলে রেখে চলে যায় রোডস।
সেই ঘাতকের পতন যেভাবে
রেজিনার নিথর দেহ উদ্ধারের আগেই রোডসের বিকৃত মানসিকতার চাকা থমকে দাঁড়ায়। ১৯৯০ সালের ১ এপ্রিল, অ্যারিজোনার এক স্টেট ট্রুপার (হাইওয়ে পুলিশ অফিসার) মহাসড়কের পাশে একটি ট্রাকের বিপদসংকেত আলো (Hazard Lights) জ্বলতে দেখে কৌতূহলবশত তদারকি করতে যান।
ট্রাকের ভেতরে প্রবেশ করতেই অফিসার হতবাক হয়ে যান। তিনি দেখতে পান, এক নারী উলঙ্গ অবস্থায় দেয়ালে শিকল দিয়ে বাঁধা এবং তিনি প্রাণপণে বাঁচার জন্য আকুতি জানাচ্ছেন। পুলিশ তৎক্ষণাৎ রবার্ট বেন রোডসকে গ্রেপ্তার করে এবং বন্দী নারীকে উদ্ধার করে।
পরবর্তীতে রোডসের বাড়ি এবং ট্রাকে তল্লাশি চালিয়ে গোয়েন্দারা একটি গোপন আলবাম খুঁজে পান। সেখানে রেজিনা ওয়াল্টার্সসহ আরও একাধিক নিখোঁজ নারীর নির্যাতন ও মৃত্যুর আগের ছবি থরে থরে সাজানো ছিল।
অপরাধের পেছনের কারণ ও মনস্তত্ত্ব
রবার্ট বেন রোডসের অপরাধের মূল চালিকাশক্তি ছিল এক চরম এবং হিংস্র যৌন বিকৃতি। সে বিডিএসএম (BDSM) এবং বিভিন্ন উগ্র যৌন সহিংসতার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছিল। সে তার ট্রাকের স্লিপার ক্যাব বা ঘুমানোর জায়গাটিকে এমনভাবে মডিফাই করেছিল যাতে সেখানে মানুষ বন্দि করে রাখার জন্য হাতকড়া, শিকল, চাবুক, বৈদ্যুতিক ক্লিপ এবং নির্যাতনের নানা সরঞ্জাম রাখা যায়।
দূরপাল্লার ট্রাকচালক হওয়ার কারণে সে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে অবাধে যাতায়াত করতে পারত। এই পেশাকে সে তার অপরাধ ঢাকার ও শিকার খোঁজার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করত। হাইওয়েতে যেসব মানুষ (বিশেষ করে রানাওয়ে বা হিচকাইকাররা) একা যাতায়াত করত, তাদেরকে সে খুব সহজেই নিজের ট্রাকে তুলে টার্গেট বানাত।
অপরাধবিজ্ঞানী ও তদন্তকারীদের মতে, রোডসের অপরাধের পেছনে কাজ করত অসহায় মানুষের ওপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার মানসিকতা। সে দীর্ঘ সময় ধরে বন্দিদের ট্রাকে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে নিজের স্যাটিসফ্যাকশন বা তৃপ্তি মোতায়েন করত এবং একপর্যায়ে তাদের হত্যা করত।
মৃত্যুর পরও চিরন্তন এক বার্তা
১৯৯২ সালে আদালতে রেজিনা ওয়াল্টার্সকে হত্যার কথা স্বীকার করে রোডস। তাকে প্যারোলবিহীন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।গোয়েন্দাদের অনুমান, দীর্ঘ ১৫ থেকে ২০ বছর ট্রাক চালক হিসেবে কাজ করার সুযোগে রোডস অন্তত ৫০ জনেরও বেশি নারীকে অপহরণ ও হত্যা করে থাকতে পারে, যদিও সরকারিভাবে তিনটির বেশি হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ সত্যতা প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি। ২০২১ সালে ৮৩ বছর বয়সে জেলখানাতেই মারা যায় এই কুখ্যাত ঘাতক।
আজ রেজিনা ওয়াল্টার্স বেঁচে নেই, কিন্তু তার সেই শেষ ছবিটি ক্রাইম ইতিহাসের পাতায় এক অমলিন ও করুণ সতর্কবার্তা হয়ে রয়ে গেছে। হাইওয়ের নির্জনতা আর অচেনা মানুষের ছদ্মবেশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অন্ধকারের যে চিত্র রেজিনার ভয়াকুল চোখ দুটি প্রকাশ করেছিল, তা আজও মানবজাতিকে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে।
