ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ভয়াবহ হামলার জেরে সোমবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আকাশ কার্যত বিমানশূন্য। পরিস্থিতি বিবেচনা করে শহরের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান পরিষেবা স্থগিত রাখার মেয়াদ বাড়িয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সৌদি অসামরিক বিমান পরিবহণ কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “বিমানবন্দরের পরিকাঠামোগত নিরাপত্তা এবং পরিচালনার প্রস্তুতি নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াগুলি সম্পন্ন করার জন্য জেদ্দার পর সৌদি আরবের দ্বিতীয় ব্যস্ততম কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিষেবা স্থগিত রাখা হয়েছে।”
গত শনিবার কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় ১৩ জনের মৃত্যু হয় এবং ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হন। গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদিতে এটিই ছিল সবচেয়ে মারাত্মক হামলা। শনিবারের ওই হামলার পর থেকেই বিমানবন্দরটি বন্ধ রয়েছে। এর পর রবিবার আরও একটি হামলায় এক জনের মৃত্যু হয় এবং প্রায় এক ডজন মানুষ আহত হন।
সোমবার সমাজমাধ্যম এক্সে ভারতীয় দূতাবাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গত ১০ অক্টোবরের ওই হামলায় মহম্মদ ইউসুফ আলি নামে এক ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর পরিবার রিয়াদেই শেষকৃত্য সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই কঠিন সময়ে শোকস্তব্ধ পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে শেষকৃত্যের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে সাহায্য করছে দূতাবাস।
পাশাপাশি, আহত ভারতীয়দের দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন দূতাবাসের আধিকারিকেরা। দূতাবাস জানিয়েছে, “আহতদের মধ্যে তিন জন আগে থেকেই আইসিইউ-তে ছিলেন, আরও দু’জনকে নতুন করে আইসিইউ-তে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। দু’জন সাধারণ ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছেন এবং বাকিদের হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।” আহতদের পরিবারের সঙ্গে দূতাবাস প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখছে এবং সবরকম সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছে।
এই হামলা সৌদি আরবের বিমান পরিবহণে গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিঘ্ন ঘটিয়েছে। এমনিতেই পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত এবং জেট জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে বিমানসংস্থাগুলির লাভের অঙ্কে কোপ পড়ছিল। এই হামলা সেই চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিমান চলাচল সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণকারী সংস্থা‘ সিরিয়াম’-এর তথ্য অনুযায়ী, রবিবার রিয়াদের ৯৯.৭ শতাংশ নির্ধারিত উড়ান বাতিল করা হয়েছে। ‘ফ্লাইটরাডার২৪’-এর এয়ার ট্রাফিক ট্র্যাকারে দেখা গিয়েছে, সোমবার রিয়াদ শহর পুরোপুরি এড়িয়ে চলেছে বিমানগুলি। যদিও বিমানগুলি সৌদি আকাশপথ অতিক্রম করে দেশের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত জেদ্দায় অবতরণ করছিল।
এই পরিস্থিতির জেরে ইউরোপ ও এশিয়ার বিমানসংস্থাগুলি তাদের পরিষেবা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। রবিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ মার্কিন বিমানসংস্থাগুলিকে সৌদি আরবে বা তার ওপর দিয়ে ওড়ার সময় সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলার কথা উল্লেখ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিমান সংস্থা ‘ইএএসএ’ শুক্রবারই সৌদি আকাশপথের জন্য একটি সতর্কতা জারি করেছিল।
‘লুফট্হানসা গ্রুপ’ ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদগামী সমস্ত উড়ান বাতিল করেছে। অন্য দিকে, ‘এয়ার ফ্রান্স-কেএলএম’ সৌদি রাজধানীতে তাদের উড়ান বাতিলের আগের সিদ্ধান্তটির মেয়াদ বাড়িয়ে চলতি মাসের শেষ পর্যন্ত করেছে। আবু ধাবির ‘ইতিহাদ এয়ারওয়েজ়’ও তাদের উড়ান বাতিলের মেয়াদ বাড়িয়েছে, যার ফলে সোমবার ও মঙ্গলবার রিয়াদ, জেদ্দা এবং দাম্মামগামী প্রায় ২০টি উড়ান প্রভাবিত হয়েছে।
হুথিদের সঙ্গে এই সংঘাতের জেরে বৃহত্তর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তেলের ব্যবসায় মন্দা-সহ একাধিক কারণে এ বছর সৌদি আরবের জিডিপি ৩.৬ শতাংশ কমতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
চলতি মাসে রিয়াদে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান হওয়ার কথা। এই জোড়া হামলা সেই সব অনুষ্ঠানকেও চরম অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সৌদির প্রধান বিনিয়োগ সম্মেলন এবং ‘ডব্লিউপিসি এনার্জি কংগ্রেস’, যেখান থেকে ইতিমধ্যে কয়েক জন শীর্ষ তেলকর্তার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
