বই, চলচ্চিত্র বা ভিডিও গেইমে হেয়ারপিন বা মাথার ক্লিপ দিয়ে দরজা খোলার দৃশ্য বহু প্রচলিত অনুষঙ্গ হলেও আমেরিকান টিভি সিরিজ বেটার কল সলের ভক্ত হয়ে থাকলে হয়ত আরও আধুনিক প্রযুক্তির নজরদারি এড়িয়ে পালানোর ভিন্ন কৌশল দেখে থাকবেন।
সিরিজটির চতুর্থ সিজনের নবম পর্ব ‘ভিডার্শেন’-এ দেখা যায়, চরিত্র ভার্নার জিগলার একটি সিকিউরিটি ক্যামেরা অন্ধ বা অকেজো করতে লেজার পয়েন্টার ব্যবহার করছেন।
নজরদারি মনিটরের ফুটেজে কিছু ডেড পিক্সেল বা অকেজো বিন্দু দেখে মাইক এরমানট্রট বিষয়টি বুঝতে পারেন এবং পয়েন্টারটি খুঁজে পান। তবে ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে, জিগলার সেখান থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
কৌশলটি দেখতে বেশ চতুর মনে হলেও প্রশ্ন ওঠে বাস্তব জীবনে কি এটা সত্যিই কাজ করে? এক কথায় উত্তর দিতে গেলে, কিছুটা করে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট।
লেজার পয়েন্টার দিয়ে সিকিউরিটি ক্যামেরা সাময়িকভাবে অন্ধ করে দেওয়া সম্ভব। কিছু ক্ষেত্রে এটা ক্যামেরার স্থায়ী ক্ষতিও করতে পারে।
এর জন্য তিনটি বিষয়ের সমন্বয় প্রয়োজন, যেমন শক্তিশালী লেজার, অপেক্ষাকৃত পুরনো প্রযুক্তির ক্যামেরা ও একদম স্থির হাত বা লেজার রশ্মির সঠিক লক্ষ্য। কাজটা সম্ভব হলেও বেশ কঠিন।
এ ছাড়া, বিশ্বের বেশিরভাগ স্থানেই এমনটা বেআইনি কাজ। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিয়ারওয়াটার এলাকার এক ব্যক্তি ‘চার্চ অফ সায়েন্টোলজি’র বেশ কয়েকটি নজরদারি ক্যামেরার দিকে লেজার তাক করার অপরাধে গ্রেপ্তার হন।
লেজারটি বিভিন্ন ক্যামেরাকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে না পারলেও সেগুলোর লেন্সে দাগ ফেলে দেয়, যার ফলে দুই হাজার ডলারের বেশি ক্ষতি হয়। তবে ক্ষতির পরও ক্যামেরাগুলো তাকে হাতেনাতে ধরেছিল।
সিকিউরিটি ক্যামেরার ওপর লেজারের প্রভাব
লেজার পয়েন্টার তীব্র ঘনত্বের আলো পাঠায়। অন্যদিকে, ক্যামেরা তৈরি করা হয় সেন্সরের মাধ্যমে আলোকে বৈদ্যুতিক চার্জে রূপান্তর করে তা দিয়ে ডিজিটাল ভিডিও ফ্রেম তৈরির জন্য।
এই গঠনের কারণে মানুষের চোখের চেয়েও শক্তিশালী আলোর প্রতি সিকিউরিটি ক্যামেরা বেশি স্পর্শকাতর হয়।
বেশিরভাগই তীব্র কোনো আলোর উৎস, যেমন গাড়ির হেডলাইট বা সূর্যের প্রতিফলিত আলো লেন্সে পড়লে তা অতিরিক্ত আলোতে ঢেকে যায়। এতে ভিডিও ফুটেজে এক ধরনের সাময়িক ঝলকানি বা পুরো সাদা হয়ে যাওয়ার মতো প্রভাব তৈরি হয়।
লেজার পয়েন্টার ঠিক একই ধরনের প্রভাব তৈরি করে তবে তা বেশি শক্তিশালী ও তীব্র হয়।
বেশিরভাগ সিসিটিভি ক্যামেরায় ‘সিএমওএস’ বা ‘সিসিডি’ সেন্সর ব্যবহৃত হয়। এসব সেন্সরের দিকে দীর্ঘক্ষণ লেজার পয়েন্টার তাক করে রাখলে ক্যামেরার সেন্সর অতিরিক্ত আলোতে ঢাকা পড়ে সাময়িকভাবে অকেজো বা অন্ধ হয়ে যায়।
উচ্চ সক্ষমতার লেজার রশ্মি তাপও উৎপন্ন করে। দীর্ঘ সময় ধরে এই তাপের সংস্পর্শে এলে ক্যামেরায় ধারণকৃত ছবিতে ডেড পিক্সেল ও কালো দাগের তৈরি হয়।
সবচেয়ে বাজে পরিস্থিতিতে ক্যামেরার সেন্সরে বড় ধরনের স্থায়ী ‘ডেড এরিয়া’ তৈরি হতে পারে, যা ক্যামেরাটিকে পুরোপুরি ব্যবহারের অনুপযোগী করে তোলে।
আধুনিক সিকিউরিটি ক্যামেরা লেজার প্রতিরোধে কতটা সক্ষম?
সব ধরনের লেজারই সিকিউরিটি ক্যামেরার ক্ষতি করতে পারে না। কেবল উচ্চ সক্ষমতাওয়ালা লেজার কোনো না নাড়িয়ে টানা অন্তত ১০ সেকেন্ড ধরে লেন্সে স্থির করে ধরে রাখলেই ক্ষয়ক্ষতি হওয়া সম্ভব।
লেজারের আউটপুট সক্ষমতা যদি ৫ মিলিওয়াটের নিচে হয় তবে তা ক্যামেরায় ক্ষণিকের আলোর ঝলকানি বা গ্লেয়ার তৈরি করা ছাড়া স্থায়ী কোনো ক্ষতি করতে পারে না।
আসল চ্যালেঞ্জ ভিন্ন জায়গায়। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ বা এফডিএ নিয়ম অনুসারে, ৫ মিলিওয়াটের বেশি সক্ষমতার হাতে বহনযোগ্য লেজার পয়েন্টার বাজারজাত, বিক্রি বা প্রচার করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
সিসিটিভি ক্যামেরা অকেজো করার মতো লেজার পয়েন্টার মানুষের হাতে থাকার সুযোগ নেই বললেই চলে।
কারও কাছে তেমন উচ্চ সক্ষমতার লেজার রয়েছে ও সে সেটা সরাসরি একটি সিকিউরিটি ক্যামেরার দিকে তাক করল। এরপরও ক্যামেরার দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করা বেশ দুঃসাধ্য। কারণ নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে ক্যামেরার ছোট লেন্সে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো ঝাঁকুনি ছাড়া হাত একদম স্থির রেখে লক্ষ্য ধরে রাখা সহজ কাজ নয়।
নিরাপত্তা প্রযুক্তি সংক্রান্ত গবেষণা কোম্পানি ‘আইপিভিএম’-এর গবেষকরা যখন লেজার দিয়ে একটি সিকিউরিটি ক্যামেরা অন্ধ করার পরীক্ষা চালান তখন তারা দেখতে পান কেবল ৫ ফুট দূরত্ব থেকেও হাত না কাঁপিয়ে নির্দিষ্ট বস্তুতে লেজার স্থির রাখা ‘কঠিন’।
এই অল্প দূরত্ব থেকেও গবেষক দলটি ব্যবহৃত লেজারের শক্তি বিবেচনা না করেই সিকিউরিটি ক্যামেরার স্থায়ী কোনো ক্ষতি করতে পারেন না।
উচ্চ সক্ষমতার লেজার ও নিখুঁত লক্ষ্য থাকার পরও আধুনিক প্রযুক্তির সেন্সর সুরক্ষার কারণে নতুন মডেলের ক্যামেরাগুলোর ক্ষতি করা বেশি কঠিন।
‘বেটার কল সল’ সিরিজের অন্যতম সহ-স্রষ্টা ভিন্স গিলিগান বলেছেন, সিরিজের চরিত্র জিগলারের ব্যবহৃত ওই কৌশলটি কেবল ১৯৬০-এর দশকের পুরনো মডেলের ক্যামেরার ক্ষেত্রে কাজ করতে পারে।
লেজারের ক্ষতি রোধে করণীয়
যে কোনো হোম সিকিউরিটি ক্যামেরাকে পুরোপুরি ‘লেজার-প্রুফ’ বা লেজার প্রতিরোধী করা প্রায় অসম্ভব। তবে কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিলে ক্যামেরার সুরক্ষা বাড়ানো ও এতে আঘাত হানা কঠিন করে তোলা সম্ভব।
এর মূল চাবিকাঠি ক্যামেরা বসানোর অবস্থান। ক্যামেরাকে লেজারের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখার সবচেয়ে সহজ উপায় সেটাকে উঁচু স্থানে বা নির্দিষ্ট কোণে বসানো।
এতে দীর্ঘ সময় ধরে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে লেজার তাক করে রাখা যে কোনো ব্যক্তির জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ে, যেমনটা আইপিভিএমের পরীক্ষার গবেষণায় দেখা গেছে।
একইভাবে, চলমান বা মুভিং সিকিউরিটি ক্যামেরায় লেজার তাক করাও বেশ কঠিন। একই এলাকা নজরদারির জন্য একাধিক ক্যামেরা ব্যবহার করলে সুরক্ষা আরও বাড়ে।
পাশাপাশি বেশ কয়েকটি ক্যামেরা এমনভাবে বসানো উচিত যাতে কোনো অন্ধ এলাকা বা ‘ব্লাইন্ড স্পট’ তৈরি না হয়। যার ফলে একটি ক্যামেরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্যটিতে নিরাপত্তা থাকে।
অনেক আধুনিক সিকিউরিটি ক্যামেরায় এমন নিরাপত্তা প্রযুক্তি যোগ করা যায়, যা আলোতে হঠাৎ পরিবর্তন বা অস্বাভাবিক তৎপরতা শনাক্ত করতে পারে। ক্যামেরার দৃশ্যপট কোনোভাবে ঢাকা পড়লে বা লেন্সে তীব্র আলোর রশ্মি আঘাত হানলে তাৎক্ষণিকভাবে মোবাইল ফোনে বার্তা বা সতর্কবার্তা চলে আসে।
