আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারে উঠেছে। মঙ্গলবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এ পর্যায়ে পৌঁছায়। টানা তিন থেকে চার দিন ধরে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এ মূল্যবৃদ্ধির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাজারের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহেও ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। পরে তা কমে ১০৬ থেকে ১০৭ ডলারের মধ্যে নেমে আসে। তবে সাম্প্রতিক উত্থানে আবারও গুরুত্বপূর্ণ এই মূল্যস্তরে পৌঁছেছে তেলটি। গত মে মাসের পর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এ পর্যায়ে ওঠেনি। গত ১৯ মে এর দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ১১১ দশমিক ২৮ ডলার।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দামও বেড়েছে। মঙ্গলবার প্রতি ব্যারেল ডব্লিউটিআইয়ের দাম দাঁড়ায় ৯৮ দশমিক ৮১ ডলারে। তেলের বাজারে লেনদেন চলমান থাকায় এসব দাম পরিবর্তিত হতে পারে। অয়েলপ্রাইসডটকমের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে দুই ধরনের অপরিশোধিত তেলের দামেই সাম্প্রতিক সময়ে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা চলছে। সংঘাতের প্রাথমিক পর্যায়ে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় দাম দ্রুত বেড়ে যায়। পরে যুদ্ধবিরতির খবরে বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। ফলে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশা এবং নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা—দুইয়ের প্রভাবেই দামের ওঠানামা অব্যাহত রয়েছে।
মে মাসে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১১ ডলারের ওপরে উঠেছিল। পরে জুনের শেষ দিকে তা কমে প্রায় ৭৩ ডলারে নেমে আসে। এপ্রিলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর বাজারে ধারণা তৈরি হয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে। সেই প্রত্যাশায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমতে শুরু করে।
তবে জুলাই থেকে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনা বাড়তে থাকায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং সংঘাতের বিস্তারের ঝুঁকি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে প্রকৃত সরবরাহ ও চাহিদার পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও বড় ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাজারে উদ্বেগ বাড়ায়। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি হওয়ায় এ প্রণালিতে চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে এবং দাম আরও বাড়তে পারে।
এ ছাড়া সৌদি আরবের তেল উৎপাদন ও পরিবহন অবকাঠামোতে হামলার ঝুঁকিও বাজারের জন্য উদ্বেগের বিষয়। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান উৎপাদক দেশগুলোর উৎপাদন বা সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এ ধরনের ঝুঁকি বাড়লে ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে সতর্ক অবস্থান নেন, যা দামের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চপর্যায়ে থাকলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জ্বালানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচেও চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সামলানোও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আবার ১১০ ডলারে ওঠায় জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
