ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনায় নতুন করে হামলার বিষয় বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এ জন্য দেশটির সামরিক বাহিনী বিশ্বের বৃহত্তম অপারমাণবিক বোমা হিসেবে পরিচিত ‘সব বোমার মা’ ব্যবহারের পরিকল্পনাও পর্যালোচনা করছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন সামরিক অভিযানের নির্দেশ দিলে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে পারে। তবে ইরানের গভীরে অবস্থিত সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করতে এই বোমা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যেই সংশয় রয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে সামরিক পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত একাধিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানে সম্ভাব্য নতুন হামলার জন্য বিভিন্ন ধরনের সামরিক বিকল্প তৈরি করছে পেন্টাগন। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কিংবা পরে ট্রাম্প অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত নিলে এসব পরিকল্পনা কাজে লাগানো হতে পারে।
জ্বালানি ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার ছক : ‘সব বোমার মা’ নামে পরিচিত বোমাটির আনুষ্ঠানিক নাম জিবিইউ-৪৩/বি। এটি একটি বিশাল আকারের, জিপিএসনিয়ন্ত্রিত বায়ুবিস্ফোরণ অস্ত্র। সামরিক পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানের বিপুলসংখ্যক জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার বিকল্প তৈরি করতে ট্রাম্প সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন। এসব পরিকল্পনায় বোমাটি ব্যবহারের সম্ভাবনাও রয়েছে।
ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে তৈরি বিকল্প পরিকল্পনায়ও এর ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় আছে। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারণা, ইরান সেখানে পারমাণবিক কর্মসূচির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সংরক্ষণ করেছে। গত কয়েক মাসে এই স্থাপনায় হামলার হুমকি বারবার দিয়েছেন ট্রাম্প। বড় ধরনের সামরিক অভিযান স্থগিত রাখার পরও তিনি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার কথা বলে আসছেন। তবে নতুন হামলার বিষয়ে তিনি সামরিক বাহিনীকে চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংসে কতটা কার্যকর? বোমাটির ব্যবহার নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এর ধ্বংসক্ষমতা ঘিরে। আকার ও বিস্ফোরণের শক্তিতে এটি ভয়াবহ হলেও গভীর ভূগর্ভে থাকা সুরক্ষিত স্থাপনা ধ্বংস করার জন্য এটি বিশেষভাবে তৈরি নয়।
সামরিক পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলোর ধারণা, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের গভীরের স্থাপনায় আঘাত হানার জন্য বোমাটি যথেষ্ট কার্যকর না-ও হতে পারে। ধারণা করা হয়, ওই স্থাপনা গ্রানাইটের একাধিক স্তরের নিচে সুরক্ষিত। ফলে বিস্ফোরণের ব্যাপকতা সত্ত্বেও লক্ষ্যবস্তু পর্যন্ত ধ্বংসাত্মক প্রভাব পৌঁছাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। বোমাটি মাটিতে আঘাত করার আগেই বিস্ফোরিত হয়। এতে চারদিকে শক্তিশালী বিস্ফোরণতরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে এবং ভূপৃষ্ঠের বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংসের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা সীমিত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। একটি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, অস্ত্রটি গভীর ভূগর্ভে প্রবেশ করে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার চেয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংস বা পরিষ্কার করার ক্ষেত্রে বেশি উপযোগী। তাই ইরানের সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংসের বদলে এর ব্যবহার সামরিক চাপ সৃষ্টি কিংবা মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে হতে পারে।
তবে জনবসতিপূর্ণ এলাকার কাছাকাছি জ্বালানি অবকাঠামো বা অন্য স্থাপনায় এই বোমা ব্যবহার করা হলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও বেসামরিক প্রাণহানির আশঙ্কা থাকবে।
যুদ্ধ শেষ করতে চাপে ট্রাম্প : নতুন সামরিক পরিকল্পনার খবর এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন ইরান যুদ্ধ শেষ করার জন্য ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে রিপাবলিকান নেতাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। ছয় মাসের বেশি সময় ধরে মার্কিন বোমা হামলা চলার পরও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সমঝোতার স্পষ্ট অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা যুদ্ধকে কার্যত বিজয় হিসেবে বর্ণনা করলেও প্রেসিডেন্ট এখনো চূড়ান্ত বিজয় ঘোষণা করেননি; বরং ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কাজ এখনো বাকি রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। ট্রাম্প ও তার উপদেষ্টারা কয়েক মাস ধরে এমন একটি উপায় খুঁজছেন, যাতে যুদ্ধের ফলাফলকে বিজয় হিসেবে তুলে ধরে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসা যায়। একই সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনাও খোলা রাখতে চান তারা। মিত্রদের কেউ কেউ মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করে সংঘাত থেকে সরে আসার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু ট্রাম্পের আশঙ্কা, এভাবে সেনা প্রত্যাহার করলে তা পরাজয় হিসেবে দেখা হতে পারে। তিনি প্রকাশ্যে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে আর সামরিক পদক্ষেপ না নেওয়ার কথা বললেও, তার কয়েকজন উপদেষ্টা ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছেন, এই অবস্থান চূড়ান্ত কি না, তা নিয়ে তারা নিশ্চিত নন। সামরিক পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত একটি সূত্রের মতে, ট্রাম্প এমন পরিস্থিতিতে কোনো পদক্ষেপ নিতে বাধ্য বোধ করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ‘সব বোমার মা’ ব্যবহারের মাধ্যমে ইরানের ওপর চাপ বাড়ানো এবং পরিস্থিতি বদলানোর চেষ্টা হতে পারে।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে কূটনৈতিক সম্ভাবনা : যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাব্য পথ হিসেবেও কূটনৈতিক সমঝোতার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। সিএনএনের আগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি হলে তা আলোচনার সূচনা তৈরি করতে পারে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ ঘিরে সমঝোতা সংঘাত নিরসনে ভূমিকা রাখতে পারে।
পেন্টাগনের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত আরেকটি সূত্র কয়েকটি সামরিক বিকল্পকে কার্যত ‘আতশবাজির প্রদর্শনী’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। সূত্রটির মতে, এসব হামলা যুদ্ধের মূল লক্ষ্য অর্জন না করলেও ট্রাম্পকে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার রাজনৈতিক সুযোগ করে দিতে পারে। এদিকে সম্ভাব্য পাল্টা হামলার আশঙ্কায় মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সামরিক কমান্ডের আওতাধীন অঞ্চলে নতুন করে সেনা মোতায়েনের কথা রয়েছে। তবে ফিরে যাওয়া কিছু সেনার জায়গায় নতুন সেনা পাঠানো না-ও হতে পারে বলে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা সম্ভাব্য সামরিক পরিকল্পনা সম্পর্কে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেছেন, স্পর্শকাতর সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে প্রশাসন প্রকাশ্যে আলোচনা করে না। তবে ইরান যাতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে ট্রাম্প সব বিকল্প খোলা রাখছেন। পেন্টাগনও জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে সামরিক বাহিনী বিভিন্ন পরিস্থিতির জন্য অভিযান পরিকল্পনা তৈরি করে।
মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও বড় লক্ষ্য : ইরাক যুদ্ধের সময় তৈরি করা হয়েছিল ‘সব বোমার মা’। ২০০৩ সালে অস্ত্রটির পরীক্ষা চলাকালে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, এটি তৈরির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব সৃষ্টি করা। বিশাল বিস্ফোরণের মাধ্যমে শত্রুপক্ষের সেনাদের আতঙ্কিত করা, আত্মসমর্পণে বাধ্য করা কিংবা যুদ্ধ থেকে বিরত রাখার পরিকল্পনা ছিল। প্রাথমিকভাবে বিপুলসংখ্যক সেনা, সামরিক সরঞ্জাম ও মাটির ওপরের শক্তিশালী বাংকারকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। পরে গুহা ও সুড়ঙ্গের মতো অপেক্ষাকৃত নরম ভূস্তরের নিচে থাকা স্থাপনাও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় যুক্ত হয়। ২০১৭ সালের এপ্রিলে আফগানিস্তানে ইসলামিক স্টেটের অবস্থানে এই বোমা ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্দেশে সেটিই ছিল প্রথম ব্যবহার। আফগান কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় জঙ্গিগোষ্ঠীটির ৩৬ যোদ্ধা নিহত হন এবং কয়েকটি সুড়ঙ্গ, অস্ত্র ও গোলাবারুদ ধ্বংস হয়। সে সময় বেসামরিক প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। ইরানে এই বোমা ব্যবহারের পরিকল্পনা এখনো সম্ভাব্য সামরিক বিকল্পের পর্যায়েই রয়েছে। এর মাধ্যমে গভীর ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও ইরানের ওপর সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ বাড়ানোর উপায় হিসেবে ওয়াশিংটন এটি বিবেচনা করছে। শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প নতুন অভিযান অনুমোদন করবেন, নাকি কূটনৈতিক সমাধানের পথ বেছে নেবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
