স্বাতী চট্টোপাধ্যায় ভৌমিক: বাংলা ছবিতে এ যুগের সবচেয়ে জনপ্রিয় জুটি বলতে যাদের বোঝায় তাঁরা যখন সপ্তমবারের জন্য একসঙ্গে পর্দায় আসেন তখন ধুমধাম তো একটু হবেই। তেমনই ভরপুর ধুমধাম নিয়ে দেব ও শুভশ্রীর নতুন ছবি ‘দেশু সেভেন’। জুটির শেষ ছবি ছিল ‘ধূমকেতু’, মুক্তি পেয়েছিল গত বছর। সেই ছবি নিয়ে উন্মাদনার জেরেই এই ছবিতে ফিরলেন মাঝপথে ভেঙে যাওয়া জুটি। একসময়ে দু’জনের একাধিক ছবি এসেছে, দর্শকের মন জয়ও করেছে। কিন্তু যে ধরনের ছবি দিয়ে এই জুটির পরিচয় সেই মাস এন্টারটেইনমেন্ট ফিরল ‘দেশু সেভেন’-এর হাত ধরেই।
ভারত বাংলাদেশ বর্ডারে অবস্থিত সীমান্তপুর কুখ্যাত এলাকা। নানারকম চোরাচালান, মেয়ে পাচার, ড্রাগসের ব্যবসা সবই চলে অবাধে। সেই সীমান্তপুরের সীমায় রাতের অন্ধকারে বাংলাদেশি সন্ত্রাসবাদী হানায় প্রাণ যায় ভারতীয় জওয়ানদের। খুনিদের খুঁজে বার করে শাস্তি দিতে জেল থেকে বার করে আনতে হয় খুনের অপরাধী, একদা আইপিএস অফিসার দেবাদিত্য অধিকারী ওরফে দেবকে। দেশের সুরক্ষায় যে কোনও সময় খুন করতে পিছপা হয় না যে। তেমনই এক প্রজেক্টে তাকে যুক্ত করা হয়। প্রজেক্ট ‘দেশের সুরক্ষা’, ওরফে ‘দেসু’। সীমান্তপুর পৌঁছে তিনজন সাহায্যকারী পায় দেব। খালাসি কাকা, হেলিকপ্টার ও মাসি। তিনজনের সাহায্যে পৌঁছে যায় বড়দা অনুজয় চৌধুরী ও ছোড়দা রনজয় চৌধুরীর খাসমহলে। বড়দার স্ত্রী ডাঃ শুভস্মিতা দেবের একসময়ের ভালোবাসার মানুষ। শুভকে খুঁজে পেয়ে আবারও নতুন করে বাঁচতে ইচ্ছে করে দেবের। কিন্তু একদিকে তার মিশন অন্যদিকে শুভর বিবাহিত জীবন। কীভাবে দেব সবটা সামলাবে, আর আদৌ শুভকে সে পাশে পাবে কিনা? সেসব জানতে হলে ছবিটা দেখতে হবে।
মশলাদার ছবিতে যা যা দরকার সেই সব উপকরণ এই ছবিতে ভরপুর। একশো শতাংশ খাঁটি এবং বিশুদ্ধ বিনোদনে ঠাসা জমজমাট পটবয়লার বলতে যা বোঝায় একেবারেই তাই।
একটা লম্বা সময় গিয়েছে যখন বাংলা ছবির দর্শক অ্যাকশন ছবির থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। সেই শূন্যস্থান পূর্ণ করেছিল তথাকথিত শিক্ষিত ও ভদ্র সম্প্রদায়ের জন্য নির্মিত ড্রয়িংরুম ড্রামা। সেসব ছবি ব্যবসা করেনি তেমন নয়। তবে একইসঙ্গে রোম্যান্স, অ্যাকশন, ড্রামা, ইমোশন সবকিছু দিতে পারে এমন ছবির অভাবটা থেকেই গেছিল। একসময় এই ধরনের ছবি দিয়ে দর্শকের মন জয় করা দেব নিজেও তাঁর ইমেজ ভেঙে পাশের বাড়ির ছেলেরূপে অবতীর্ণ হয়েছেন একাধিক ছবিতে। তাই খিদেটা ছিল উভয় তরফেই। একদিকে পুরোনো অবতারে দেবকে ফিরে চাওয়া তাঁর ভক্তকুল, অন্যদিকে তিনি নিজে। অবশেষে ‘দেশু সেভেন’ সেই অভাব পূরণ করবে আশা করাই যায়। মশলাদার ছবিতে যা যা দরকার সেই সব উপকরণ এই ছবিতে ভরপুর। একশো শতাংশ খাঁটি এবং বিশুদ্ধ বিনোদনে ঠাসা জমজমাট পটবয়লার বলতে যা বোঝায় একেবারেই তাই।
২ ঘণ্টা ৪৬ মিনিট সময় টান টান উত্তেজনা, জমাটি সংলাপ আর তরতরিয়ে এগিয়ে যাওয়া স্ক্রিপ্ট কখন পার করে দেবে, বোঝা মুশকিল। দেবের পরিচালনায় প্রথম ছবি? বিশ্বাস করা কঠিন। চিত্রনাট্য ও সংলাপে রোহিত-সৌম্য, সম্রাট শর্মা ও দেব, তিন ঘণ্টার (বিরতি নিয়ে) কোথাও ধৈর্যচ্যুতি ঘটতে দেননি। দেব, শুভশ্রী, অনির্বাণ যদি এই ছবির তিন স্তম্ভ হন, চতুর্থ অবশ্যই রথিজিৎ ভট্টাচার্যের ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর। মারকাটারি অ্যাকশন দৃশ্যে ‘ও দয়াল ও দয়াল’ কিংবা ‘বাবা তোমার দরবারে সব পাগলের মেলা’, ভাঙচুর রক্তারক্তির দৃশ্যকেও মধুর মতো উপভোগ্য করে তুলেছে। স্যাভি ও নীলায়ন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে গানগুলি দর্শকদের আনন্দ দেবে, বিশেষ করে ‘নাচে রে বাংলা’ ও ‘ইলিশ চন্দনা’। শুভঙ্কর ভড়ের চিত্রগ্রহণ, মোঃ কালামের সম্পাদনা ক্লান্ত করে না কোথাও। ইধিকা পাল আইটেম নম্বরে দুরন্ত, পারফরম্যান্সে খামতি রাখেননি তিনি। গানের শেষে দেবের সঙ্গে তাঁর জুটির বিখ্যাত সেই গান কিশোরীকেও মনে করিয়ে দিলেন দেব। সংলাপে সর্বত্রই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হয়েছে দেব কিংবা অনির্বাণের সিগনেচার স্টাইলের নানান ইস্টার এগ। এখানেই ‘দেশু সেভেন’ অন্য অ্যাকশন ছবির চেয়ে আলাদা। ছবির সিরিয়াস প্লট এবং দর্শকদের জন্য উপরি মজা দুই চলেছে সমান্তরালভাবে।
প্রথমবার অনির্বনকে দুই যমজ ভাইয়ের চরিত্রে দেখা গেল। দুই আলাদা অবতারে দর্শককে মাতালেন তিনি। অভিনয়ে বরাবরই বাঙালি দর্শকের চোখের মণি হয়েও দুই আলাদা খল চরিত্রে তাদের ঘেন্না উদ্রেক করতে বোধহয় তিনিই পারেন।
শাহরুখ খানের ছবি ‘পাঠান’ হিট করার পর রিল হিসেবে অনির্বাণ ভট্টাচার্যের পুরোনো একটি ছবির সংলাপ নতুন করে জনপ্রিয় হয়েছিল, যার মূল অর্থ ছিল শাহরুখ যখন ফিরবে তখন আশেপাশে কেউ থাকবে না। সেই ছবির সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই বটে, তবে সেই একই সংলাপ এই ছবিতে অনির্বাণের নিজের জন্যই চমৎকারভাবে প্রযোজ্য। নেগেটিভ চরিত্রে তিনি এলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন বলা চলে। তবে একা নন, দুই রূপে। সম্ভবত প্রথমবার অনির্বনকে দুই যমজ ভাইয়ের চরিত্রে দেখা গেল। দুই আলাদা অবতারে দর্শককে মাতালেন তিনি। অভিনয়ে বরাবরই বাঙালি দর্শকের চোখের মণি হয়েও দুই আলাদা খল চরিত্রে তাদের ঘেন্না উদ্রেক করতে বোধহয় তিনিই পারেন।

শুভশ্রী বহুদিন বাদে দেবের নায়িকা হলেন। কিন্তু ছবিতে দুজনের রসায়ন চোখে পড়ার মতো। কোথাও এতটুকু ত্রুটি চোখে পড়বে না দুজনের বোঝাপড়ায়। আলাদাভাবেও দুজনেই সমান উজ্জ্বল। শুভশ্রীকে আগাগোড়া ছবিতে দেখতেও মোহময়ী লেগেছে। দেবের তিন সহকারীর ভূমিকায় প্রদীপ ভট্টাচার্য, অপরাজিতা আঢ্য ও কাঞ্চন মল্লিক তিনজনেই অনবদ্য। কৌতুক চরিত্রে দুর্দান্ত পার্থসারথি চক্রবর্তী। ভালো লেগেছে রজতাভ দত্ত, লোকনাথ দে, সৌম্য সেনগুপ্তকে। স্বল্প পরিসরে চরিত্রের চাহিদা পূরণ করেছেন প্রিয়াঙ্কা সরকার।
শম্পার চরিত্রটি বড় কম পাওয়া গেল। প্রিয়াঙ্কাকে আর একটু ব্যবহার করা যেতে পারত।
এত প্রাপ্তির মধ্যে অপ্রাপ্তি কি একেবারেই নেই? আছে। শম্পার চরিত্রটি বড় কম পাওয়া গেল। প্রিয়াঙ্কাকে আর একটু ব্যবহার করা যেতে পারত। লোকনাথ দে অভিনীত হীরাকে আরও কিছুটা স্ক্রিন স্পেস দেওয়া যেতে পারত। ভালো অভিনেতাদের এত অল্প দেখে সাধ মেটে না যেন। এছাড়া দেবের জেল হওয়ার কারণ হিসাবে যে ঘটনা দেখানো তা আর একটু বিশ্বাসযোগ্য হতে পারত। আইপিএস অফিসারের রিভলভারে সেফটি ক্যাচ লাগানো থাকবে না কেন? এটা কিছুটা খটকার উদ্রেক করে বইকি! তবে মশলা ছবিতে এইসব প্রশ্ন খোঁজার তেমন কোনও যুক্তি নেই। তাই নিঃসন্দেহে এই উৎসবের আমেজে ‘দেশু সেভেন’ ব্লকবাস্টার ছবির সবরকম উপাদান দর্শকদের উপহার দিতে চলেছে নতুন মোড়কে।
