বিশ্বজুড়ে শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যাওয়ার সংবাদে আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
পুরুষরা মূলত দুটি সময়ে নিজেদের স্বাস্থ্য নিয়ে অতিরিক্ত সচেতন হয়ে ওঠেন, যখন তাদের যৌনাঙ্গে শিথিলতা বা লিঙ্গোত্থানে সমস্যা দেখা দেয়। এ ছাড়া যখন সন্তান ধারণে জটিলতা তৈরি হয়।
প্রজনন সংক্রান্ত সমস্যা বা সেমেন অ্যানালাইসিসের অস্বাভাবিক রিপোর্ট নিয়ে যখন কোনো পুরুষ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন, তখন তাদের মনে থাকা নানা ভুল ধারণা ভাঙতে বেশ কিছুটা সময় লাগে। রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় যে ভয়টি দেখা যায়, তা হলো বিশ্বজুড়ে পুরুষের শুক্রাণুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার সংবাদ।
আরও পড়ুন
এটি কেন ঘটছে, তার চেয়েও পুরুষ ও তাদের সঙ্গীরা বেশি চিন্তিত থাকেন এটি নিয়ে যে, এই পরিস্থিতিতে তাদের আসলে করণীয় কী।
যে ঘটনা থেকে উদ্বেগের সূচনা
বিশ্বজুড়ে শুক্রাণুর সংখ্যা হ্রাস পাওয়া নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত ২২ বছরের পুরোনো কিছু গবেষণা থেকে নয়, বরং ২০২২ সালের একটি বৃহৎ বৈশ্বিক বিশ্লেষণের পর থেকে।
৫৩টি দেশের ৫৭ হাজারেরও বেশি পুরুষের ওপর পরিচালিত ২২৩টি গবেষণার ওই ফলাফলে দেখা যায়, ১৯৭৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে প্রজনন সমস্যা নেই এমন পুরুষদের গড় শুক্রাণুর ঘনত্ব প্রায় অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে।
এই গবেষণায় দেখা যায়, শুক্রাণুর ঘনত্ব ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং মোট শুক্রাণুর সংখ্যা ৬২ দশমিক ৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
তবে পরবর্তীতে ২০২৫ সালের একটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, পরিবেশ ও ভৌগোলিক অঞ্চলভেদে এই সংখ্যাগত পরিবর্তন ভিন্ন হতে পারে। সার্বিকভাবে এই তথ্যগুলো উদ্বেগের সৃষ্টি করলেও চিকিৎসকদের মতে, এটি সন্তান হওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কোনো চূড়ান্ত বার্তা নয়। আপাতত সাধারণ পুরুষদের জন্য বার্তা একটাই এখনই আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি।
সেমেন অ্যানালাইসিস পরীক্ষা যা প্রকাশ করে
সন্তান ধারণের চিকিৎসা বা ভ্যাসেকটমির পর শুক্রাণুর উপস্থিতির হার জানতে সাধারণত সিমেন অ্যানালাইসিস পরীক্ষা করা হয়। এটি শুক্রাণুর সংখ্যা, গতিশীলতা এবং স্বাভাবিক আকৃতির হার পরিমাপ করে।
তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এই পরীক্ষার বেঞ্চমার্ক বা নির্দিষ্ট মানদণ্ডই একজন পুরুষের প্রজনন ক্ষমতা বা অক্ষমতার চূড়ান্ত সীমা নির্দেশ করে না। এ ছাড়া মাত্র এক দিনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া অনুচিত। একটানা শারীরিক অসুস্থতা, মানসিক চাপ, বীর্য সংগ্রহের সঠিক নিয়ম এবং ল্যাবরেটরির পার্থক্যের কারণে এক সপ্তাহের ভিন্ন ভিন্ন দিনে একজন পুরুষের শুক্রাণুর সংখ্যায় পার্থক্য হতে পারে। এ কারণেই আমেরিকান ইউরোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন অন্তত এক মাসের ব্যবধানে দুবার এই পরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়ে থাকে।
সন্তান ধারণের বাইরেও শুক্রাণুর স্বাস্থ্যের গুরুত্ব
সাধারণ মানুষ কেবল সন্তান জন্মদানের কথা ভেবেই শুক্রাণুর সংখ্যা নিয়ে চিন্তিত হন, কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানে একজন পুরুষের সামগ্রিক শারীরিক সুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক বা দর্পণ হিসেবে এটিকে দেখা হয়। অস্বাভাবিক সিমেন রিপোর্ট কোনো হৃদরোগ বা ডায়াবেটিসের সরাসরি ডায়াগনোসিস নয়, তবে এটি শরীরের ভেতরের সার্বিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার একটি বড় সুযোগ। প্রজনন সমস্যা বা শুক্রাণুর মান খারাপ থাকা পুরুষদের ক্ষেত্রে অন্যান্য শারীরিক জটিলতা থাকার হার তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়।
শুক্রাণুর মান ও প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে যেসব উপাদান
সাধারণ শারীরিক পরীক্ষার সময় যেসব বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়, সেগুলোই শুক্রাণুর মান নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা পালন করে:
স্থূলতা ও মেদ:
অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিস এবং মেটাবলিক সিন্ড্রোম শুক্রাণুর মান খারাপ করার পাশাপাশি শুক্রাণুর ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ঘুমের অভাব:
২০১৮ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাতে ৬ ঘণ্টার কম ঘুমানো পুরুষদের ক্ষেত্রে সঙ্গীকে গর্ভবতী করার সম্ভাবনা ৮ ঘণ্টা ঘুমানো পুরুষদের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যায়।
ধূমপান ও মাদক:
ধূমপান সরাসরি শুক্রাণুর ঘনত্ব ও মোট সংখ্যা কমিয়ে দেয়। তবে ধূমপান ত্যাগের তিন মাসের মধ্যে এই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে।
অতিরিক্ত তাপ:
অণ্ডকোষ শরীরের বাইরে থাকার কারণই হলো শুক্রাণু উৎপাদনের জন্য স্বাভাবিক শরীরের তাপমাত্রার চেয়ে কিছুটা কম তাপমাত্রা প্রয়োজন। অতিরিক্ত তাপে বা তৈরি হওয়া হিটওয়েভে বেশি সময় থাকলে শুক্রাণু উৎপাদন ব্যাহত হয়।
হরমোন থেরাপির অপব্যবহার:
অনেক পুরুষ সন্তান নেওয়ার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পেশী গঠন বা শক্তি বাড়াতে কৃত্রিম টেস্টোস্টেরন থেরাপি বা স্টেরয়েড নেন। এতে প্রজনন হরমোন নিঃসরণ ব্যাহত হয়ে অণ্ডকোষে শুক্রাণু উৎপাদন সাময়িক বা স্থায়ীভাবে শূন্যে নেমে যেতে পারে।
প্রজনন স্বাস্থ্যে জিএলপি-১ জাতীয় ওষুধের প্রভাব
২০২৬ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ওজন কমানোর আধুনিক জিএলপি-১ ওষুধ গ্রহণকারী স্থূলতায় ভোগা পুরুষদের রক্তে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা এবং শুক্রাণুর মানের কিছুটা উন্নতি ঘটে। তবে চিকিৎসকদের মতে, এটিকে সরাসরি উর্বরতা বৃদ্ধির ওষুধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মূল বিষয় হলো, এই ওষুধগুলো ওজন কমানো ও দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক জটিলতা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, যার ইতিবাচক প্রভাব হরমোন ও শুক্রাণুর ওপর পড়ে।
পুরুষ ও তাদের সঙ্গীদের প্রতি বিশেষজ্ঞ পরামর্শ
একটি মাত্র পরীক্ষার ফলাফলে মন খারাপ বা আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। রিপোর্ট খারাপ এলে কিছুদিন পর পুনরায় পরীক্ষা করা এবং চিকিৎসকের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা জরুরি। প্রজনন ক্ষমতা ও শুক্রাণুর মান বাড়াতে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:
জীবনযাত্রার পরিবর্তন:
ধুমপান পুরোপুরি বর্জন করতে হবে, অতিরিক্ত মদ্যপান এড়াতে হবে, নিয়মিত শরীরচর্চা ও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে এবং পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে।
খাদ্যভ্যাস:
ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যরীতি অর্থাৎ প্রচুর শাকসবজি, ফলমূল, বাদাম ও ফাইবারযুক্ত খাবার গ্রহণ শুক্রাণুর স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
পর্যাপ্ত সময় দেওয়া:
যেকোনো নতুন খাদ্যভ্যাস বা জীবনযাত্রার পরিবর্তনের প্রভাব শুক্রাণুর ওপর পড়তে অন্তত ৩ মাস সময় লাগে। তাই ধৈর্য ধরে নিয়ম মেনে চলা এবং প্রজনন সংক্রান্ত বিষয়ে ভুল তথ্যে কান না দিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে বড় সমাধান।সূত্র: সিএনএন
[ডা. জামিন ব্রহ্মভট্ট অরল্যান্ডো হেলথের একজন ইউরোলজিস্ট ও রোবোটিক সার্জন এবং ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল ফ্লোরিডার কলেজ অব মেডিসিনের সহকারী অধ্যাপক। অনুবাদ: খাদিজা রুমি]
