শেষ দেখা তো দূরের কথা, কথা বলার সুযোগটুকুও পায়নি পরিবার। ঠিক কখন তাদের সন্তানের জীবনের প্রদীপ নিভিয়ে দেওয়া হলো, তার কিছুই জানতে দেওয়া হয়নি মা-বাবাকে। গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে অতি গোপনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তরুণ নজরুল ইসলামের (২২)। দূর প্রবাসের বন্দিশালায় যখন তার মৃতূদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছিল, তখনও হয়তো হতভাগা মা-বাবা পথ চেয়ে বসেছিলেন পরের রবিবার ছেলের ফোন আসবে। তবে কোনো পূর্ব নোটিশ বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ
না দিয়ে এভাবে আকস্মিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় পরিবারে এখন চলছে শুধুই আহাজারি। ক্ষোভে, দুঃখে ও তীব্র মানবিক সংকটে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে গোটা এলাকা।
পরিবারের অভাব দূর করে একটু স্বাচ্ছন্দ্যের আশায় ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের কৃষক পরিবারের বড় সন্তান নজরুল ইসলাম। সেখানে তিনি একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। কিন্তু যাওয়ার মাত্র ছয় মাসের মাথায় মক্কার একটি মসজিদ থেকে সুইটি আক্তার নামে এক তরুণীসহ নজরুলকে অনৈতিক কাজের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে দেশটির পুলিশ।
তিন বছর তিন মাস রিয়াদ ও মক্কার কারাগারে বন্দি ছিলেন নজরুল। নজরুলের মা রহিমা বেগম জানান, জেলে থাকার পরও প্রতি রবিবার নিয়ম করে পরিবারের সঙ্গে কথা বলতেন ছেলে। কিন্তু গত সপ্তাহে আর কোনো ফোন আসেনি। গণমাধ্যমের কল্যাণে পরিবার জানতে পারে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবর। একই সঙ্গে কার্যকর হয়েছে সুইটি আক্তারেরও মৃত্যুদণ্ডও।
ছেলের এমন করুণ মৃত্যুর খবর শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন বাবা আব্দুল বাছির। অসুস্থ শরীরে কেবলই বিলাপ করছেন, আমার ছেলে কী অপরাধ করেছে আমি জানি না, একমাত্র আল্লাহই জানেন। কিন্তু কেন আমাদেরকে একবার জানতেও দেওয়া হলো না?
নজরুলের মৃত্যুর এই তীব্র ধাক্কা সইতে পারেনি তার পরিবার। ভাতিজার মৃত্যুর খবর শোনার পর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন নজরুলের ফুফু আবেদা বেগম। চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় নজরুলকে হারিয়ে মায়ের কান্না আর ফুফুর আকস্মিক মৃত্যুতে বিরামপুর গ্রামে এখন চলছে শোকের মাতম।
নজরুলের পরিবারের এই চরম মানবিক বিপর্যয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন এলাকাবাসী। নিহতের পরিবার এবং গ্রামবাসীর এখন সরকারের কাছে আবেদন আইনি লড়াই বা শেষ দেখা যখন সম্ভব হয়নি, অন্তত নজরুলের মরদেহটি যেন রাষ্ট্রীয় খরচে দ্রুত দেশের মাটিতে ফিরিয়ে আনা হয়। শেষবারের মতো ছেলের মুখটি দেখে যেন হতভাগ্য বাবা-মা তাকে নিজ গ্রামের মাটিতে দাফন করতে পারেন।
