বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্রমবর্ধমান ঋণের পাহাড়। ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বৈশ্বিক ঋণের পরিমাণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়ে জুন মাস শেষে ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। এই বিশাল ঋণের দায়ভার ভাগ করলে বিশ্বের প্রতিটি মানুষের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪৪ হাজার ডলার। এই ঋণ বৃদ্ধির পেছনে বড় অবদান উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর। চলমান অস্থিরতা ইউরোপের দেশগুলোর সরকারের আর্থিক সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে। বছরের পর বছর বিপুল ঋণ নেওয়ায় ইউরোপের অনেক দেশই এখন গভীর ঋণসংকটে পড়েছে। ফলে সরকারের জন্য নতুন ঋণ নেওয়া ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।
ঋণগ্রস্ত দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
দেশটির ঋণের পরিমাণ ৪১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা তাদের মোট জিডিপির ১২৭ শতাংশ। দেশটির ঋণের পরিমাণ ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন, যা দেশটির জিডিপির ১০২ শতাংশ। এই ঋণ দেশটির জিডিপির ১১৮ শতাংশ। দেশটির ঋণের পরিমাণ ৩ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন, যা দেশটির জিডিপির ৮৩ শতাংশ।
মার্কিন ডলার বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হওয়ায় দেশটি আন্তর্জাতিক বাজারে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা ভোগ করে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সীমাহীন ঋণ নেওয়ার সুযোগ নেই।
ঋণের পরিমাণের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চীনের দায় ২২ দশমিক ৫০ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির ১০৪ শতাংশ। এছাড়া তালিকার তৃতীয় স্থানে থাকা জাপানের ঋণের পরিমাণ ৮ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা তাদের জিডিপির ১৯৯ শতাংশ। তালিকার চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে রয়েছে যথাক্রমে যুক্তরাজ্য (৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার) এবং ফ্রান্স (৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার)। এই অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দু এখন ফ্রান্স।
বৈশ্বিক ঋণের এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট ঋণের পরিমাণ ২০৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের জিডিপির ৪০ শতাংশের সমান। গত দেড় দশকে বাংলাদেশে ঋণের পরিমাণ প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে, কারণ ২০১০ সালে এটি ছিল ৪০ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। তবে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের জিডিপি ও ঋণের এই অনুপাত এখনো তুলনামূলক সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। দেশটির অর্থনীতির তুলনায় ঋণের বোঝা অনেকটাই বেশি, যা জিডিপির ১৩৮ শতাংশ।
এদিকে ঋণের সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে বিশ্বের সরকারগুলোকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। গত এক বছরে উন্নত দেশগুলো সরকারি বন্ডের সুদ বাবদ ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এই ব্যয়ের পরিমাণ বিস্ময়কর, কারণ এটি সামরিক খাতের ৩ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতের ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়েও বেশি। বিশ্বে সরকারি ঋণের পরিমাণে ভারত সপ্তম। বন্ড কেনার বিনিময়ে সরকার ক্রেতাদের সুদ দেয় এবং নির্দিষ্ট তারিখে ঋণের পুরো অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। একটি দেশ তার ঋণ ব্যবস্থাপনা কতটা দক্ষতার সঙ্গে করতে পারবে, সে বিষয়ে আর্থিক বাজারের আস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক এটি।
সরকারি ঋণের ক্রমবর্ধমান সুদ পরিশোধের চাপে অনেক দেশেই জনসেবামূলক খাতে বরাদ্দ কমিয়ে আনা হচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাজেট ঘাটতি এবং আবাসনসংকটের প্রতিবাদে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ফ্রান্সের পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত। গত শনিবার দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভে ৫ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছে। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে ছড়িয়ে পড়া এসব বিক্ষোভে কোথাও কোথাও সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বিশ্বজুড়ে ডলারের ব্যাপক চাহিদা থাকায় দেশটির ঋণের প্রতিও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ থাকে।
ফ্রান্সে বর্তমান ঋণ নেওয়ার খরচ ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে ইউরোজোনে ১০ বছর মেয়াদি ঋণের জন্য ফ্রান্সকে প্রায় ৫ শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে, যা জার্মানির সুদের হার ৩ দশমিক ৪১ শতাংশের চেয়ে বেশি। এমনকি ইতালি বা গ্রিসের চেয়েও ফ্রান্সের ঋণের ব্যয় বর্তমানে বেশি। বিক্ষোভকারীদের দাবি, ঋণের সুদ মেটাতে গিয়ে স্কুল, হাসপাতাল ও পেনশনের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ ছাঁটাই করা হচ্ছে, যা জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। আর জার্মানির সরকারি ঋণ ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির ৬৫ শতাংশ। যেমন—১০ বছর মেয়াদি বন্ড হলো এমন একটি ঋণ, যা সরকারকে ১০ বছর পর পরিশোধ করতে হয়। উল্লেখ্য, ২০১০ থেকে ২০১২ সালের ইউরোজোনের ঋণসংকটের সময় শুধু গ্রিস, ইতালি ও স্পেনের মতো সংকটে থাকা দেশগুলোকে ৫ শতাংশ বা তার বেশি সুদ দিতে হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস বলছে, ২০৩০ সাল নাগাদ ফ্রান্সের সরকারি ঋণের পরিমাণ জিডিপির ১২১ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা দেশটির অর্থব্যবস্থাকে আরও সংকটের দিকে ঠেলে দেবে। শুধু ফ্রান্স নয়, বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ না নিয়ে বন্ড বিক্রির মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করছে। বন্ডের দাম কমলে বা সুদের হার বাড়লে সরকারের নতুন করে ঋণ নেওয়ার ব্যয় বেড়ে যায়, যার নেতিবাচক প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ক্রেডিট কার্ড, গৃহঋণ ও গাড়ি কেনার ঋণের সুদের হারের ওপর গিয়ে পড়ে। এতে দেশটির সরকারি অর্থব্যবস্থাকে টেকসই অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। সুদের হার ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ায় আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালকে আন্তর্জাতিক সহায়তা নিতে হয়েছিল। কোনো পরিবারের গৃহঋণের সুদ বাড়লে যেমন সংসার খরচে টান পড়ে, সরকারের ক্ষেত্রেও তা–ই হয়।
The post ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলারে বৈশ্বিক ঋণ, ৪৫তম অবস্থানে বাংলাদেশ appeared first on Daily Sangbad Chorcha.
