পরীক্ষার দুই দিন আগে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয় সাবরিন সুলতানা। মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান বাবা-মা। এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দেয়। সেই শঙ্কা দূর করে জ্বর নিয়েই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে জিপিএ-৫ পেয়েছে সাবরিন। সে বলে, ‘এই ফলের পেছনে সবচেয়ে বড় প্রেরণা আমার বাবা। ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে পরীক্ষা দিতে পারব কি না, তা নিয়ে চিন্তা ছিল। বাবা-মা দুজনই আমাকে সাহস দিয়েছেন।’
সাবরিনের মতো সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসেছিল ভ্যানচালক বাবার ছেলে রিয়াজ (ছদ্মনাম)। বাবার ভ্যানে চড়ে অনুষ্ঠানে আসে সে। জানায় অসচ্ছলতার সঙ্গে লড়াই করেও জিপিএ-৫ পাওয়ার কথা।
রিয়াজের বাবা বলেন, ‘আমার ছেলে গোল্ডেন এ-প্লাস পাইছে। ছেলে বলল, বাবা, আজ আমাকে সংবর্ধনা দেবে। শুনে প্রথমে অবাক হইছি। পরে ছেলেকে ভ্যানে কইরা নিয়া আইছি।’

৯ অক্টোবর সকাল সাড়ে আটটা বাজার আগেই শিক্ষার্থীদের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে মাদারীপুর সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তন প্রাঙ্গণ। তাদের হইহুল্লোড়ে তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। ছোট ছোট দলে চলছিল আড্ডা। স্কুলজীবনের কাছের বন্ধু ও সহপাঠীদের দেখে কেউ কেউ জড়িয়ে ধরছিল। কেউ আবার মুঠোফোনে সেলফি তুলে ধরে রাখছিল স্মৃতি।
চতুর্থ শ্রেণি থেকে একসঙ্গে পড়াশোনা করে আসা দুই বান্ধবী উম্মে হানি ও মিমি রহমান সেলফি তুলছিল। এ সময় মিমি রহমান বলে, ‘আমরা দুই বান্ধবী ক্লাস ফোর থেকে একসঙ্গে আছি। এখনো কলেজে একসঙ্গেই। আবার একই সঙ্গে সংবর্ধনা নিতে পারছি। বিষয়টা খুব আনন্দের।’
প্রথম আলোর আয়োজনে এবং শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় জিপিএ-৫ পাওয়া কৃতী শিক্ষার্থীদের এই সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ‘স্বপ্ন দেখো জীবন গড়ো’ স্লোগানে সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই সংবর্ধনায় সহযোগিতা করে মাদারীপুর বন্ধুসভা। সকাল সোয়া ১০টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। বন্ধুসভার পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক কামরুল হাসানের সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর মাদারীপুর প্রতিনিধি অজয় কুন্ডু।

অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থকে ‘না’ বলার শপথ পড়ান মস্তফাপুর বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ নবাবজান। এ সময় তিনি বলেন, ‘তোমরা নিঃসন্দেহে অনেক মেধাবী। তবে একজন মেধাবী মানুষ হওয়ার চেয়ে সৎ মানুষ হওয়াটা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তোমাদের আগামী গড়ে উঠুক মেধা ও সততার মিশেলে।’
শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিয়ে বক্তব্য দেন কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের সহযোগী অধ্যাপক মজিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এটা তোমাদের জীবনের প্রথম বড় সাফল্য। তবে এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে তোমাদের আরও বেশি পরিশ্রম করতে হবে। আগামীর বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে তোমরাই। নিজেদের সেভাবে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলো।’
ডনোভান সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বিকাশ চন্দ্র রায় শিক্ষার্থীদের ডাক্তার, প্রকৌশলী বা কোনো বিশেষ পেশার প্রতি আলাদা নজর না দিয়ে গুণগত শিক্ষার দিকে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘যে পেশাতেই যাওয়া হোক না কেন, সেই পেশায় সফল হলে বাবা-মা ও দেশের মুখ উজ্জ্বল করা সম্ভব।’

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রথম আলোর খুলনার নিজস্ব প্রতিবেদক উত্তম মণ্ডল বলেন, ‘জীবনের নতুন একটি অধ্যায়ে পা রাখার এই সময়ে বন্ধু নির্বাচনে সচেতন থাকতে হবে। সত্যিকারের বন্ধু তাদের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলবে, এগিয়ে যাওয়ার সাহস দেবে এবং কঠিন সময়ে পাশে থাকবে। অন্যদিকে, ভুল সঙ্গ মনোবল দুর্বল করে দিতে পারে, লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারে এবং স্বপ্নকে ধূসর করে দিতে পারে।’
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন বন্ধুসভার উপদেষ্টা সোহেল রানা, মকবুল হোসেন, ডা. অখিল সরকার।
এরপর কুইজ বিজয়ী ১০ জন শিক্ষার্থীর হাতে পুরস্কার তুলে দেয় অতিথিরা। কৃতী শিক্ষার্থী উজ্জয়িনী মজুমদার ও নূর ফাতেমার গান অনুষ্ঠানে অন্য রকম আবহ তৈরি করে। এ ছাড়া কানিজ ফাতিমা, জানাত আশু, অর্পা ইসলাম, জয়িতা ও তুবা দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে। স্বাপ্নীক নৃত্য বিকাশের শিক্ষার্থীরাও দুটি নৃত্য পরিবেশন করে। সংগীত পরিবেশন করেন পৃথি মণ্ডল, সাইফ, কাজী মাহাবুব ও শান্ত কুমার।

মেয়েকে নিয়ে ৪০ কিলোমিটার দূরের শিবচর থেকে সংবর্ধনা নিতে আসেন রেজাউল করিম। তিনি বলেন, ‘প্রথম আলোর এই সংবর্ধনার আয়োজনের কথা আগেই জানতাম। ইচ্ছে ছিল মেয়েকে নিয়ে এমন একটি অনুষ্ঠানে আসতে পারি। সেই ইচ্ছে আজ পূরণ হয়েছে। খুব সকাল সকাল বাড়ি থেকে বের হয়েছি, যেন মিস না হয়।’
মঞ্চে অভিভাবকদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, ‘মা, মাটি, মানুষকে ভালোবাসতে হবে। সোনার দেশ গড়তে হবে। তোমাদের সেরা অভিভাবক তোমাদের শিক্ষক। তোমরা শিক্ষকদের শ্রদ্ধা ও সম্মান করবে।’
মাদারীপুর বন্ধুসভার সভাপতি আঞ্জুমান জুলিয়া ও সাধারণ সম্পাদক এইচ এম হাবিবুর রহমানের ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে এই মিলনমেলা শেষ হয়।
